কিন্তু গুন্ডাদের সঙ্গে সংঘর্ষ না হলেও দীর্ঘদিন নিরুপদ্রব শান্তি উপভোগ করার সৌভাগ্য নিয়ে জন্মায়নি জন স্লটার। জেরোনিমো নামে এক দুঃসাহসী নায়কের নেতৃত্বে অ্যাপাচি জাতীয় রেডইন্ডিয়ানরা শ্বেতাঙ্গদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘোষণা করল। মেক্সিকো থেকে অ্যাপাচিরা টম্বস্টোন শহরের উপর হানা দিতে লাগল, বহু মানুষের সম্পত্তি ও গোরু-ভেড়া লুণ্ঠিত হল–শান্তিপ্রিয় নাগরিক তো দূরের কথা, পিস্তলবাজ দুর্ধর্ষ গুন্ডারাও ক্ষিপ্ত অ্যাপাচিদের হাত থেকে নিষ্কৃতি পেল না। আগেই বলেছি কিশোর বয়সে জন স্লটার টেক্সাস রেঞ্জার্স নামক বাহিনীতে শিক্ষা গ্রহণ করেছিল, ওই সময়ে রেড ইন্ডিয়ানদের কম্যানচো জাতির বিরুদ্ধে অস্ত্রধারণ করে সে রেড ইন্ডিয়ানদের যুদ্ধ পদ্ধতি শিখে গিয়েছিল। এইবার জেরোনিমোর বাহিনীর বিরুদ্ধে তার পূর্ব অভিজ্ঞতা কাজে লাগল।
কয়েকবার সংঘর্ষে লিপ্ত হয়ে জেরোনিমো বুঝল, জন স্লটার অতিশয় বিপজ্জনক ব্যক্তি। স্লটারের নেতৃত্বে তার দলবল অ্যাপাচিদের মেক্সিকো পর্যন্ত তাড়িয়ে নিয়ে গিয়েছিল একাধিকবার। ওই লড়াই চলেছিল প্রায় এক বৎসরেরও বেশি। অবশেষে জেরোনিমোর আদেশে অ্যাপাচিরা স্লটারের এলাকা থেকে হাত গুটিয়ে নিল। বার বার মার খেয়ে জেরোনিমো বুঝেছিল, এ বড়ো কঠিন ঠাই!
জেরোনিমোর বিরুদ্ধে এমন সাফল্যের সঙ্গে যুদ্ধ পরিচালনা করেছিল স্লটার যে, তার দিকে সেনাবাহিনীর অধিনায়কদের দৃষ্টি আকৃষ্ট হয়েছিল। ১৮৮৬ খ্রিস্টাব্দে জেরোনিমো যখন আত্মসমর্পণ করে, সেই সময় জন স্লটার ছিল জেনারেল মাইলের সঙ্গী।
স্লটারের কৃতিত্ব এইবার বহু মানুষের ঈর্ষার উদ্রেক করল। অব্যর্থ নিশানার জন্য যারা খ্যাতিলাভ করেছিল, সেই বন্ধুকবাজ মানুষগুলি এইবার স্লটারের উপর খঙ্গহস্ত হয়ে উঠল। ডা. হলিডে নামে এক দন্ত চিকিৎসক সদম্ভে ঘোষণা করল, স্লটারকে সে শীঘ্রই হত্যা করবে। টম্বস্টোন শহরের মানুষ ওই ডাক্তারকে যমের মতোই ভয় করত–রিভলভার চালাতে সে ছিল অতিশয় দক্ষ এবং তার মতো ভয়ংকর খুনি সেই অরাজক যুগেও ছিল দুর্লভ।
স্লটার ও তার পত্নীর কানে এল ডা. হলিডের ভয়াবহ ঘোষণা। তা সত্ত্বেও একরাত্রে স্ত্রী ভায়োলোকে নিয়ে ঘোড়ার গাড়ি চালিয়ে স্লটার রওনা হল একটি নৃত্যঅনুষ্ঠানে যোগ দিতে। টম্বস্টোন শহরের খুব কাছেই ছিল ভায়োলার পিতার র্যাঞ্চ। অনুষ্ঠানের শেষে স্লটার তার শ্বশুরবাড়ির দিকে গাড়ি চালাল।
মেঘমুক্ত রাতের আকাশে ভাসছে পূর্ণচন্দ্র। পৃথিবীর বুকে উজ্জ্বল প্রতিফলনে জ্বলছে চাঁদের হাসি, তরল রজতধারার মতো। একটু আগেই শেষ-হয়ে-যাওয়া নাচের স্মৃতি, চাঁদনি রাত, স্বামীর সান্নিধ্য এবং পিতৃগৃহে সাদর অভ্যর্থনার সম্ভাবনা–সব কিছু মিলে ভায়োলার মনটা আজ ভারি খুশি, আর স্লটারের প্রাণেও লেগেছে সেই খুশির ছোঁয়া।
কিন্তু যতই আনন্দ হোক, সদা সতর্ক স্লটার এক মুহূর্তের জন্যও অসাবধান হয় না।
বিদ্যুৎপৃষ্ঠের মতো সে কোমরের রিভলভার হস্তগত করল, কারণ, তার কানে এসেছে ধাবমান অশ্বের খুরধ্বনি!
তিরবেগে ঘোড়া ছুটিয়ে একটা ঝোপের ভিতর থেকে মুক্ত প্রান্তরের উপর আত্মপ্রকাশ করল ডা. হলিডে! ভায়োলা সভয়ে দেখল, ডাক্তারের ডান হাতের মুঠোয় চকচক করছে একটা রিভলভার!
ডাক্তারের ঘোড়া কয়েক মুহূর্তের মধ্যেই স্লটারের অশ্বচালিত শকটের পাশে এসে পড়ল। মনে হল, ডাক্তার বুঝি এখনই গুলি ছুড়বে কিন্তু না, ঘোড়া আরোহীকে বহন করে সামনে এগিয়ে গেল, আরোহীর হাতের রিভলভার তবু অগ্নিবর্ষণ করল না।
ভায়োলা চেঁচিয়ে উঠল, জন! ওর হাতে রিভলভার!
শান্তস্বরে স্লটার বলল, জানি। আমার হাতেও একটা আছে।
ভায়োলা দেখল, তার স্বামীর হাতেও একটা রিভলভার রয়েছে বটে!
ডা. হলিডেও স্লটারের হাতের রিভলভার দেখেছে, আর দেখামাত্রই তার সংকল্পের পরিবর্তন ঘটেছে দ্রুতবেগে ঘোড়া ছুটিয়ে সে স্থানত্যাগ করে অদৃশ্য হয়ে গেল।
টম্বস্টোন শহরের মানুষ অতিষ্ঠ হয়ে উঠল। চারদিকে গুন্ডাদের অবাধ রাজত্ব। খুন, রাহাজানি, ডাকাতি লেগেই আছে। রাত্রিবেলা তো দূরের কথা, প্রকাশ্য দিবালোকেও ভদ্রলোকের ধনপ্রাণ নিরাপদ নয়। শেরিফ বেনহাম প্রাণপণ চেষ্টা করেও শহরের শান্তিরক্ষার কার্যে সফল হয়নি।
শহরের মানুষ তখন স্লটারকে শেরিফের পদে নির্বাচিত করল। নূতন শেরিফের কার্যকলাপে নাগরিকরা প্রথম প্রথম বিশেষ উৎসাহ বোধ করেনি। সত্যি কথা বলতে কী, তারা একটু হতাশ হয়েই পড়েছিল। কারণ, স্লটার অন্যান্য শেরিফের মতো চিৎকার করে শপথবাক্য উচ্চারণ করত না, অথবা বিরাট রক্ষীবাহিনী নিয়ে খুনির পিছনে তাড়া করার চেষ্টাও তার ছিল না। কিন্তু কিছুদিনের মধ্যেই টম্বস্টোমের মানুষ বুঝল, এই অরাজক শহরের শান্তিরক্ষা করতে হলে যে ধরনের মানুষ দরকার, ঠিক সেই ধরনের মানুষ হচ্ছে জন স্লটার। তাদের নির্বাচনে ভুল হয়নি কিছুমাত্র!
ঘোড়াচুরি বা ডাকাতির খবর পেলেই নিঃশব্দে ঘোড়ার পিঠে চেপে উধাও হয়ে যেত শেরিফ স্লটার। শহরের আশেপাশে পর্বতসংকুল অরণ্য ছিল সমাজবিরোধীদের প্রিয় বাসভূমি। কখনো কখনো সেই পর্বতবেষ্টিত বনভূমির ভিতর অদৃশ্য হয়ে যেত স্লটার… কয়েকদিন পরেই আবার শহরের রাজপথের ওপর শহরবাসীর চোখের সামনে ভেসে উঠত অশ্বারোহী স্লটারের ক্ষীণদেহ, তার সঙ্গে থাকত একটি বা দুটি জিন-লাগানো ঘোড়া, কিন্তু ওই ঘোড়াগুলির পিঠে কখনোই আরোহীর অস্তিত্ব থাকত না! শহরবাসী বুঝত, ঘোড়ার মালিকরা আর কোনোদিনই শহরের রাজপথ কলঙ্কিত করবে না–এক বা একাধিক দুবৃত্ত গুলি খেয়ে অরণ্যের ভিতরই মৃত্যুশয্যায় শুয়ে আছে, তাদের ঘোড়াগুলিকে নিয়ে এসেছে শেরিফ জন স্লটার!
