ওই অঞ্চলের গুন্ডাদের কাছে স্লটার হল মূর্তিমান চ্যালেঞ্জ!
অবশেষে একদিন গোলমাল বাধল। গ্যালাঘার নামে এক ভয়ংকর দুবৃত্ত ঘোষণা করল স্লটারকে সে হত্যা করবে। কথাটা যথাসময়ে স্লটারের কানে এল। সে কোনো মন্তব্য করল না, কিন্তু সাবধান হল।
একদিন ঘোড়ার পিঠে চলতে চলতে স্লটার লক্ষ করল, গন্তব্যপথের মাঝখানে এমন একটা জায়গা আছে, যেখানে একটা মানুষ অনায়াসে লুকিয়ে থাকতে পারে। সে সন্দেহজনক জায়গাটা পরিহার করে অন্য পথে ঘোড়া চালিয়ে দিল। একটু পরেই বোঝা গেল তার আশঙ্কা অমূলক নয়। পূর্বোক্ত স্থান থেকে খোলা পথের ওপর আত্মপ্রকাশ করল এক অশ্বারোহী।
গ্যালাঘার!
গ্যালাঘারের হাতে ছিল একটা শটগান এবং কোমরের দুই দিকে ঝুলছিল দুটি রিভলভার। শটগান উঁচিয়ে ধরে গ্যালাঘার সবেগে ঘোড়া ছুটিয়ে দিল স্লটারের দিকে। স্লটার রাইফেল ছুড়ল। গ্যালাঘারের ঘোড়া আহত হয়ে মাটিতে লুটিয়ে পড়ল, গ্যালাঘার নিজেও ছিটকে পড়ে গড়াগড়ি খেতে লাগল মাটির ওপর। কয়েক মুহূর্ত পরেই গ্যালাঘার উঠে পড়ে শটগান তুলে গুলি চালাল। আবার গর্জে উঠল স্লটারের রাইফেল, পেটে গুলি খেয়ে ধরাশায়ী হল গ্যালাঘার। মাত্র কয়েটি মুহূর্ত–আহত বাঘের মতোই লাফিয়ে উঠল গ্যালাঘার এবং দু-হাতে দুটি রিভলভার তুলে ঘনঘন অগ্নিবৃষ্টি করতে লাগল শত্রুর দিকে। স্লটার রাইফেল তুলল, অব্যর্থ লক্ষ্যে রাইফেলের বুলেট গ্যালাঘারের বক্ষ ভেদ করে তাকে মৃত্যুশয্যায় শুইয়ে দিল। রাইফেল নামিয়ে জন স্লটার তার নির্দিষ্ট পথের দিকে অশ্বকে চালনা করল।
এইসবই হল পথের ঘটনা। যথাসময়ে জন স্লটার এবং তার স্ত্রী গন্তব্যস্থান টম্বস্টোন শহরে এসে উপস্থিত হল। স্লটারের আর্থিক অবস্থা বেশ ভালো ছিল, অতএব শহরের অনেক গুন্ডা বদমাইশের দৃষ্টি আকৃষ্ট হল তার দিকে।
একদিন স্লটার স্ত্রীর সঙ্গে ঘোড়ার গাড়িতে চড়ে এক জায়গায় গোরু কিনতে গিয়েছিল। হঠাৎ স্লটারের চোখে পড়ল দুটি লোক ঘোড়া ছুটিয়ে পথের মাঝখানে একটা উচ্চভূমির অন্তরালে আত্মগোপন করল। স্লটার তৎক্ষণাৎ অন্যদিকের একটা ঢালু জমির ওপর দিয়ে ঘোড়ার গাড়ি ছুটিয়ে দিল এবং একটু পরেই এসে পড়ল খোলা রাস্তার মাঝখানে। অশ্বারোহী দুজন অন্তরালেই থেকে গেল, সামনে এসে আত্মপ্রকাশ করার সুযোগ তাদের হল না।
কিছুদিন পরেই স্লটার আবার নিজের আস্তানায় ফিরে এল। ফিরে আসার সঙ্গেসঙ্গে একটা গুজব শুনে তার মেজাজ গরম হয়ে উঠল–এডলিল আর ক্যাপ স্টিলওয়েল নামে দুই গুন্ডা নাকি প্রতিজ্ঞা করেছে স্লটারের টাকাপয়সা তারা লুঠ করবে।
কোমরে গুলিভরা রিভলভার ঝুলিয়ে জন স্লটার পূর্বোক্ত দুই গুন্ডার সঙ্গে সাক্ষাৎ করে জানিয়ে দিল, চব্বিশ ঘণ্টার মধ্যে তারা যদি শহর ত্যাগ না-করে তাহলে স্লটার তাদের হত্যা করবে। এডলিল বিনা প্রতিবাদে স্লটারের বক্তব্য শুনল, কিন্তু স্টিলওয়েল হাত বাড়াল কোমরের রিভলভারটার দিকে।
স্টিলওয়েলের হাত রিভলভারের বাঁট স্পর্শ করার আগেই স্লটারের কোমরের রিভলভার বিদ্যুদবেগে খাপের আশ্রয় ছেড়ে শত্রুর ললাট লক্ষ করে উদ্যত হল! স্টিলওয়েল ভাবতেই পারেনি, এত দ্রুতবেগে কোনো মানুষ খাপ থেকে রিভলভার টানতে পারে।
নিজের কোমর থেকে চটপট হাত সরিয়ে এনে স্তম্ভিত বিস্ময়ে সে হাঁ করে তাকিয়ে রইল স্লটারের মুখের দিকে!
পরের দিনই দুই স্যাঙাত শহর ছেড়ে সরে পড়ল। টম্বস্টোন শহরে আর কোনোদিনই কেউ তাদের দেখতে পায়নি।
এইবার আমরা জন স্লটারের পূর্ব ইতিহাস নিয়ে একটু আলোচনা করব। ছোটোবেলায় স্লটার ছিল অত্যন্ত রুণ। শক্তির অভাব পূরণ করার জন্য সে রিভলভার ও রাইফেল প্রভৃতি আগ্নেয়াস্ত্র অভ্যাস করতে শুরু করল এবং খুব অল্প বয়সেই সে এমন নির্ভুলভাবে লক্ষ্যভেদ করতে অভ্যস্ত হয়ে উঠল যে, পাকা পিস্তলবাজ মানুষও তাকে ঘাঁটাতে সাহস করত না।
পরিণত বয়সে জন স্লটার যখন কনফেডারেট আর্মিতে যোগ দিল, তখন আমেরিকার গৃহযুদ্ধ শুরু হয়েছে। এক বছর পরেই সৈন্যবাহিনী থেকে স্নটারকে ছাড়িয়ে দেওয়া হল, কারণ সে হয়েছিল যক্ষ্মারোগে আক্রান্ত। ওই অবস্থায় সে ফিরে এসে যোগ দিল টেক্সাস রেঞ্জার্স নামক বেসরকারি বাহিনীতে। ওই দুর্ধর্ষ বাহিনী এক মাসের মধ্যে যতগুলি লড়াইয়ের সম্মুখীন হত, সরকারি সৈন্যদল সারাবছরের মধ্যেও ততগুলি যুদ্ধে অভিজ্ঞতা অর্জন করতে পারত না।
এমন ভয়ানক দলের মধ্যে ছয় বৎসর কাটিয়ে জন স্লটারের স্নায়ু হয়ে উঠল ইস্পাতের মতো কঠিন। তারপরই সে টেক্সাস ত্যাগ করে আরিজোনার টম্বস্টোন শহরের দিকে সস্ত্রীক যাত্রা করেছিল এবং পরবর্তীকালে যেসব ঘটনা ঘটেছিল, পূর্বেই আমরা তা সবিস্তারে আলোচনা করেছি।
জন স্লটারের র্যাঞ্চ বা গোশালা বেশ সমৃদ্ধ হয়ে উঠল। তার টাকাপয়সা দেখে গুন্ডারা লুব্ধ হয়ে উঠত বটে, কিন্তু স্লটারের রিভলভার ও আঙুলের যোগাযোগে যে অত্যন্ত অশুভ ঘটনার উৎপত্তি হয়, বারংবার তার প্রত্যক্ষ প্রমাণ পেয়ে ওই অঞ্চলের দুবৃত্তেরা বুঝতে শিখেছিল, জন স্লটার নামক মানুষটির সঙ্গে যথাসম্ভব দূরত্ব বজাই রাখাই বুদ্ধিমানের কাজ। গুন্ডাদের মধ্যে অধিকাংশই ছিল স্লটারের পরিচিত, তবে স্লটার তাদের সঙ্গে কথা বলত না, বা কোনো দলীয় কলহের মধ্যে নিজেকে জড়াতে চাইত না। সরকারের সেনাবাহিনীতে, রেল কোম্পানির মজুরদের মধ্যে এবং টম্বস্টোন শহরের ১৫০০০ শহরবাসীর কাছে মাংস বিক্রয় করে সে আদর্শ ব্যবসায়ীর জীবনযাপন করত, তাকে না-ঘাঁটালে সে কোনো গোলমালে নাক গলাত না।
