সিদ্দি প্রতিজ্ঞা রক্ষা করতে পারেনি।
কাহ্নোজি আংগ্রের নেতৃত্বে দুর্জয় হয়ে উঠল মারাঠা নৌবহর। কেবল মুঘল শক্তি নয়, দুর্ধর্ষ ইংরেজও আঙ্গারিয়ার কাছে পরাজয় স্বীকার করতে বাধ্য হয়েছিল।
[ভাদ্র-আশ্বিন ১৩৭৫]
নিশানা নির্ভুল
ঊনবিংশ শতাব্দীর শেষ ভাগে আমেরিকা যুক্তরাষ্ট্রের টেক্সাস ও আরিজোনার মধ্যবর্তী বিস্তীর্ণ তৃণভূমির বুকে বর্তমান কাহিনির শুরু এবং পাত্র ও অপাত্রদের মধ্যে প্রথমেই যে ব্যক্তি পাঠকের দৃষ্টি আকর্ষণ করছে, সে হচ্ছে অশ্বপৃষ্ঠে উপবিষ্ট এক বলিষ্ঠ পুরুষ।
অশ্বারোহী যেখানে অবস্থান করছে সেখান থেকে কিছুদূরে মাঠের ওপর ঘাস খেতে খেতে ঘুরে বেড়াচ্ছে একদল গোরু। গোরুর পালের আশেপাশে ঘোড়ার পিঠে চেপে যে লোকগুলো টহল দিচ্ছে, তাদের মুখ-চোখ দেখলেই বোঝা যায় তারা কেউ নিরীহ ভদ্রলোক নয়। ওরা হল আমেরিকার দুর্ধর্ষ কাউবয় বা গো-পালক।
প্রথমেই যে বলিষ্ঠ অশ্বারোহীর উল্লেখ করেছি, সেই মানুষ ওই গোরুর পালের মালিক এবং কাউবয়দের প্রভু। অশ্বারোহীর নাম জন চেসাম। ওই অঞ্চলের মানুষজনকে ভয় করত, এড়িয়ে চলত। ভয়টা অহেতুক নয়–জন অত্যন্ত ভয়ানক চরিত্রের লোক, সামান্য কারণেই নরহত্যা করতে সে অভ্যস্ত। তার লক্ষ্মীছাড়া চ্যালাচামুণ্ডারা ছিল তারই মতো, রাইফেল ও রিভলভারে সিদ্ধহস্ত, প্রভুর আদেশে গুলি চালিয়ে মানুষ খুন করতে তারা একটুও ইতস্তত করত না।
আইন? হ্যাঁ, আইন একটা ছিল বটে তবে যে সময়ের কথা বলছি, সেই সময়ে সরকারের আইন নিয়ে আমেরিকাতে কেউ মাথা ঘামাত না। শক্ত মুঠিতে নির্ভুল নিশানায় যে গুলি চালাতে পারত, আইনের প্রতিনিধিরা তাকে স্পর্শও করতে চাইত না। গৃহযুদ্ধের পরবর্তীকালে ঊনবিংশ শতাব্দীর আমেরিকার এই ছিল চেহারা।
সেদিন জন চেসামের মেজাজটা বেশ ভালো ছিল। কারণ, কয়েকদিন আগেই তার পোষা গুন্ডার দল পঞ্চাশটা গোরু চুরি করে এনেছে। মাঠের ওপর চেসামের নিজস্ব গোরুর পালের মধ্যে সেই চুরি করা গোরুগুলিও ছিল। পশুপালক প্রতিষ্ঠানগুলি তাদের নিজস্ব গোরুর গায়ে লোহা পুড়িয়ে নিজের দলের প্রতীক চিহ্ন এঁকে দিত। চুরি করা গোরুদের গায়েও অন্য প্রতিষ্ঠান র্যাঞ্চ-এর প্রতীক চিহ্ন ছিল। কিন্তু চেসাম খুব ভালোভাবেই জানত যে, সেই চিহ্ন দেখে তার গোরুর পালের ভিতর থেকে নিজস্ব গোরু শনাক্ত করে নিয়ে যেতে পারে এমন দুঃসাহসী মানুষ ওই অঞ্চলে নেই। অতএব, রাতারাতি পঞ্চাশটা গোরুর মালিকানা লাভ করে জন চেসাম খুব খুশি হয়ে উঠেছিল।
আচম্বিতে তৃণাবৃত প্রান্তরের বুকে জাগল অশ্বখুরধ্বনি, চেসামের ললাটে জাগল কুঞ্চনরেখা।
মাঠের ওপর ঘোড়ার খুরে বাজনা বাজাতে বাজাতে ধুলোর ঝড় তুলে এগিয়ে আসছে একদল অশ্বারোহী!
তীক্ষ দৃষ্টিতে পর্যবেক্ষণ করে চেসাম বুঝতে পারল, এরা কেউ আরিজোনার মানুষ নয়, সকলেই টেক্সাসের অধিবাসী। নবাগত ঘোড়সওয়ারদের নেতৃত্ব দিচ্ছিল একটি ছোটোখাটো নিরীহ চেহারার মানুষ।
গোরুর পালের দিকে এক নজরে তাকিয়েই ছোটোখাটো মানুষটি আদেশ দিল, আমাদের গোরুগুলির চিহ্ন দেখে ওদের আলাদা করে নাও।
টেক্সানরা বিনা বাক্যব্যয়ে আদেশ পালন করল। কিছুক্ষণের মধ্যেই চোরাই গোরুগুলিকে তারা দল থেকে তাড়িয়ে আলাদা করে ফেলল।
জন চেসাম এতক্ষণ স্তম্ভিত হয়ে তাদের কার্যকলাপ দেখছিল, এইবার সে সগর্জনে প্রতিবাদ জানাল।
চেসামের দলের লোকগুলি প্রস্তুত হল লড়াইয়ের জন্য। প্রত্যেকেরই কোমরে ঝুলছে রিভলভার, মালিকের আদেশ পেলেই তারা অস্ত্র ব্যবহার করতে পারে।
নবাগতদের আচরণে বোঝা গেল, বিনা যুদ্ধে দাবি ত্যাগ করতে তারাও রাজি নয়। তারাও সশস্ত্র। দুই দলের দুই নেতা পরস্পরের মুখোমুখি দাঁড়াল।
জন চেসাম তার প্রতিপক্ষের মুখের ওপর দৃষ্টি নিক্ষেপ করল। তার লম্বা-চওড়া মস্ত শরীরের তুলনায় প্রতিদ্বন্দ্বীর ছোটোখাটো চেহারাটা নিতান্তই নগণ্য। সেই নগণ্য মানুষটি গম্ভীর স্বরে বলল, চেসাম! গোরুগুলি আমার, অতএব ওগুলো আমি নিয়ে যাচ্ছি। তুমি অনেকদিন এখানে আছ, আইন তোমার অজানা নয়।
নবাগত অশ্বারোহীর দল তাদের নিজস্ব গোরুগুলিকে তাড়িয়ে নিয়ে প্রস্থান করার উদ্যোগ, করল। জন চেসাম বাধা দেওয়ার চেষ্টা করল না। প্রতিদ্বন্দ্বীর চোখের দিকে তাকিয়ে সে কী দেখেছিল সেই জানে, কিন্তু কোমরের রিভলভারে হাত না-দিয়ে সে ঘোড়ার মুখ ঘুরিয়ে নিল পিছন দিকে এবং দ্রুতবেগে ঘোড়া ছুটিয়ে অদৃশ্য হয়ে গেল অকুস্থল থেকে। চুরি যাওয়া গোরুগুলিকে নিয়ে নবাগতরা প্রস্থান করল নির্বিবাদে।
জন চেসামের মতো দুর্দান্ত মানুষও যার কাছে বিনা যুদ্ধে পরাজয় স্বীকার করল তার নামও জন, তবে চেসাম নয়, স্লটার।
আরিজোনার মানুষ একটি নতুন নাম শুনল–জন স্লটার।
জন স্লটার নামক মানুষটি টেক্সাস অঞ্চল থেকে আরিজোনার টম্বস্টোন শহরের দিকে যাত্রা করেছিল। ওই জায়গাটা ছিল পশুপালকদের পক্ষে আদর্শ স্থান। টেক্সাস থেকে স্লটার এসেছিল ওইখানে পশুর ব্যাবসা করতে। তার দলে ছিল অনেকগুলি গোরু। আরিজোনার বিস্তৃত অঞ্চলে যারা পশুমাংসের ব্যাবসা করতে র্যাঞ্চ বা গোশালা প্রতিষ্ঠিত করেছিল, তাদের মধ্যে অধিকাংশই ছিল অসাধু প্রকৃতির মানুষ। গোরু চুরি করে সম্পত্তি বৃদ্ধি করার নিয়মটা ছিল সেখানে নিতান্তই সাধারণ ব্যাপার। প্রতিবাদ করলে আসল মালিকের মৃত্যু ছিল অবধারিত, কাজেই কেউ প্রতিবাদ জানাতে সাহস পেত না। জন স্লটার নামে মানুষটি, যে তার নিজস্ব গোরু দাবি করার সাহস রাখে, এই খবরটা চারদিকে ছড়িয়ে পড়ল। জন চেসামের পরে আরও কয়েকটি গুন্ডা প্রকৃতির লোক স্লটারের গোরু চুরি করার চেষ্টা করল। প্রত্যেকবারই হল এক ঘটনা পুনরাবৃত্তি হারানো গোরুগুলিকে আবিষ্কার করে স্লটার সেগুলোকে আবার নিজের দলে ফিরিয়ে নিয়ে গেল, তার চোখের দিকে তাকিয়ে কেউ প্রতিবাদ করার সাহস পেল না। একদিন স্লটারের দলের লোকরা অন্য প্রতিষ্ঠানের গোরুর পালের ভিতর থেকে এক-শোটা চুরি করা জন্তু উদ্ধার করেছিল।
