না প্রভু, দ্বিতীয় কিশোর এবার উত্তর দিল, দিনের আলোতে আসার উপায় ছিল না। সব কথা আপনাকে বললেই বুঝতে পারবেন।
এই কিশোরটি আমাদের পরিচিত। একটু আগেই সে খাঁড়ির জলে নেমেছিল।
সন্ন্যাসী বললেন, বেশ চলো। আমার কুঠিতে চলো। তবে আগে তোমার পরিচয় জানতে চাই। বালাজি বিশ্বনাথকে আমি জানি। এই মহারণ্যের কাছেই চিপলুন গ্রামের লবণগোলায় বালাজি কেরানির কাজ করে এবং ওই গোলা তার বাসস্থানও বটে কিন্তু তুমি কে? তোমার নাম কী?
প্রভু! আমি সুবর্ণদুর্গের একজন দুর্গরক্ষী আমার নাম কাহ্নোজি শংখপাল। বালাজি বিশ্বনাথ আমার বাল্যবন্ধু। আ,ই খাঁড়ির জল সাঁতরে জঙ্গল ভেঙে বালাজির গোলায় গিয়েছিলাম– আমার কথা শুনে সে আমাকে আপনার কাছে নিয়ে আসছিল। হঠাৎ বাঘটা ।
বুঝেছি। আমার সঙ্গে এসো।
হুঁ। দুর্গস্বামী অচলা মোহিতে স্বর্ণমুদ্রার বিনিময়ে সিদ্দির হাতে দুর্গ সমর্পণ করতে চায়!
বিশ্বাসঘাতক! সন্ন্যাসী জ্বলন্ত দৃষ্টিতে কাহ্নোজির মুখের দিকে চাইলেন, তুমি যা চাইছ তাই পাবে। কিন্তু সোনার লোভে তুমিও যদি বিশ্বাসঘাতকতা কর অর্থাৎ এই স্বর্ণ যদি আত্মসাৎ কর তাহলে? ।
প্রভু, আমি–
চুপ করো। শোনো। যদি তুমি বিশ্বাসঘাতকতা কর তাহলে আমি তোমায় অভিশাপ দেব। মনে রেখো আমার অভিশাপ অব্যর্থ।
জানি প্রভু। বালাজির মুখে শুনেছি চিপলুনের এক শ্রেষ্ঠী আপনার কাছ থেকে অর্থ নিয়ে আপনাকে ফাঁকি দিয়েছিল। আপনার অভিশাপে সে কুষ্ঠরোগে আক্রান্ত হয়েছে! তা ছাড়া আমি স্বচক্ষে দেখেছি যে বনের বাঘও আপনার আদেশ পালন করে।
তোমরা অপেক্ষা করো। আমি আসছি।
অন্ধকার বনপথে সন্ন্যাসী অদৃশ্য হয়ে গেলেন।
কাহ্নোজি প্রশ্ন করলে, বালাজি! সত্যিই কি উনি আমাকে স্বর্ণমুদ্রা দেবেন? সংসারত্যাগী যোগী কোথা থেকে সংগ্রহ করেছেন এত সোনার মোহর?
বালাজি হাসল, ব্রহ্মেন্দ্র স্বামী অজস্র অর্থের অধিকারী। উনি কৈশোর থেকেই সংসার ত্যাগী। প্রথম জীবনে জ্ঞান সাধনা করেছেন হিমালয়ে। কেউ জানে না কোথা থেকে তিনি এত অর্থ সম্পদ পেয়েছেন কোথায় থাকে এই ধনরত্ন তাও আজ পর্যন্ত কেউ জানত পারেনি! ব্রহ্মেন্দ্রস্বামীর কাছে অনেক ধনবান ব্যক্তিও বিপদে পড়লে ঋণ গ্রহণ করে। উনি ঋণ দেন কিন্তু চড়া সুদে। ওই ঋণ শোধ না-করলে, দেন অভিশাপ। সেই অভিশাপ অব্যর্থ।
কাহ্নোজি বললে, আশ্চর্য পুরুষ!… ওই যে উনি আসছেন।
গভীর অরণ্যের ভিতর থেকে নিঃশব্দে আত্মপ্রকাশ করলেন ব্রহ্মেন্দ্রস্বামী তার দুই হাতে ঝুলছে দুটি চামড়ার থলি।
ব্রহ্মেন্দ্রস্বামী সামনে এসে দাঁড়ালেন, কাহোজিকে উদ্দেশ করে বললেন, শোনো কাহোজি। আমি ঋণস্বরূপ অর্থ দিয়ে থাকি কিন্তু তোমাকে আমি এই থলি ভরতি মোহর দান করছি। দেশের জন্য সৎকার্যে এই অর্থ তুমি ব্যয় করবে। তবে যদি লোভের বশবর্তী হয়ে
প্রভু! আপনি নিশ্চিন্ত থাকুন। স্বর্ণমুদ্রার চাইতে জন্মভূমির স্বাধীনতার মূল্য আমার কাছে অনেক বেশি।
… খাঁড়ির পাড়ে এসে দাঁড়াল দুটি কিশোর—-বালাজি ও । কাহ্নোজি।
কাহ্নোজির দেহের সঙ্গে বাঁধা মোহরভরতি দুটি চামড়ার থলি।
বালাজি বললে, সাবধানে যাও কাহ্নোজি, জলে কুমিরের ভয় আছে।
কাহ্নোজি হাসল, আমার মাথার উপর আছে ব্রহ্মেন্দ্রস্বামীর আশীর্বাদ, কটিবন্ধে আছে শানিত তরবারি–কুমির আমায় গ্রাস করতে পারবে না।
পরক্ষণেই সে জলে ঝাঁপিয়ে পড়ল…
দুর্গের মধ্যে কোমল শয্যায় শুয়ে দুর্গস্বামী অচলাজি মোহিতে স্বপ্ন দেখছেন–
সোনার মোহর! রাশি রাশি সোনার মোহর! দুই হাত বাড়িয়ে অচলাজি মোহরগুলি আঁকড়ে ধরলেন।
হঠাৎ মোহরের স্তূপ থেকে একটি সাপ বেরিয়ে এসে তার দুটি হাত জড়িয়ে ধরলে।
অচলাজি টানাটানি করে হাত ছাড়াতে পারলেন না–তার মুখের সামনে ফণা বিস্তার করে গর্জে উঠল বিষধর সর্প!
আর্তনাদ করে উঠলেন অচলাজি মোহিতে আর সঙ্গেসঙ্গে তার ঘুম ভেঙে গেল–
না, সাপ নয়–একজোড়া লৌহবলয়ের মারাত্মক আলিঙ্গনে বন্দি হয়েছে তার দুই হস্ত এবং সামনে দাঁড়িয়ে হাসছে কাহ্নোজি শংখপাল!
রাগে ফেটে পড়লেন অচলাজি, এর মানে কী? কাহ্নোজি উত্তর দিল, আপনাকে আমি বুন্দি করলুম। মহারাজ শম্ভাজির কাছে পরে আপনার বিচার হবে।
অচলাজি চিৎকার করে উঠলেন, ওরে কে আছিস এই শয়তানকে বন্দি কর। একজনকে পাঁচ পাঁচ মোহর বকশিশ দেব–সদাশিব! রঘুনাথ! পিংলে!
কেউ এল না।
কাহ্নোজি বললে, চেঁচিয়ে লাভ নেই। আপনি কত মোহর দেবেন? আমি প্রত্যেক দুর্গরক্ষীকে দশ মোহর করে দিয়েছি।
আমায় ছেড়ে দাও। আমি তোমায় এক-শো মোহর দেব।
সহস্র মোহর দিলেও আপনাকে ছাড়ব না। কাহোজি শংখপালের কাছে সুবর্ণের চাইতে জননী ভূমির মূল্য অনেক বেশি…
যথাসময়ে ঔরঙ্গজেবের নৌবলাধ্যক্ষ সিদ্দি ইয়াকুব খাঁ জানতে পারল যে কাহোজির হাতে বন্দি হয়েছে অচলাজি মোহিতে এবং সমস্ত চক্রান্ত হয়ে গেছে ব্যর্থ!
ক্রুদ্ধ সিদ্দি প্রশ্ন করলে, কে এই কাহ্নোজি?
একজন বললে, ওর বাবার নাম তুকোজি শংখ পাল! ওদের বাড়ি ছিল আঙ্গার ওয়াদি গ্রামে।
সিদ্দি গর্জে উঠল, আঙ্গারিয়া? আঙ্গার? ওই আঙ্গারিয়াকে দেখে নেব আমি!..।
সিদ্দির কথার প্রতিধ্বনি তুলে কাহ্নোজিকে আংগ্রে বা আঙ্গারিয়া নামে ডাকতে লাগল শত্ৰুমিত্র সবাই। কাহোজি শংখপাল ইতিহাসে পরিচয় লাভ করল ভিন্ন নামে–কাহোজি আংগ্রে!
