ছত্রপতি শিবাজির নেতৃত্বে দাক্ষিণাত্যের বুকে জন্ম নিল দুরন্ত মারাঠা-শক্তি–দিল্লির বাদশাহি ফৌজের প্রচণ্ড আক্রমণকে বারংবার ব্যর্থ করে মহারাষ্ট্রের আকাশে উড়তে লাগল মারাঠার বিজয়-বৈজয়ন্তী গৈরিক পতাকা!
শিবাজির মৃত্যুর পরে মহারাষ্ট্রের কর্ণধার হলেন তার পুত্র শম্ভাজি। সেই সময় বাদশাহ ঔরঙ্গজেবের হাবসি নৌবলাধ্যক্ষ সিঙ্গি ইয়াকুব খাঁ তার দুর্জয় নৌবহর নিয়ে কঙ্কন উপকূলে হানা দিল। উপকূলে অবস্থিত দুর্গগুলিকে দুর্ভেদ্য করে গড়েছিলেন শিবাজি মহারাজ, তবু খুব অল্প সময়ের মধ্যে সিঙ্গি অনেকগুলি দুর্গ অধিকার করে ফেলল। সিঙ্গি দুর্ধর্ষ যোদ্ধা, কিন্তু সে কৌশলীও বটে–প্রচুর উৎকোচ অর্থাৎ ঘুস দিয়ে সে দুর্গস্বামীদের বধ করে ফেলতে লাগল। ঘুসের মহিমায় বিনা যুদ্ধেই অনেকগুলি দুর্গ অধিকার করলে সিঙ্গি–অবশেষে অবরুদ্ধ হল সুবর্ণদুর্গ।
সুবৰ্ণ মোহরের লোভে সুবর্ণদুর্গের অধিপতি অচলাজি মোহিতে সিঙ্গির হাতে দুর্গ সমর্পণ করার উদ্যোগ করতে লাগলেন। দুর্গরক্ষী সৈন্যরা এ-কথা জানতে পারল কিন্তু তারা প্রতিবাদ করতে চাইল না। তারা বুঝেছিল যে উৎকোচের কিছু অংশ সৈন্যদের মধ্যেও ভাগ-বাঁটোয়ারা হবে তাই যুদ্ধের কথা ভুলে মোটা বকশিশের লোভে তারা উদগ্রীব হয়ে উঠল। উদ্যত তরবারির সম্মুখে যারা বুক ফুলিয়ে দাঁড়াতে ভয় পায়নি সুবর্ণমুদ্রার প্রলোভন তারা জয় করতে পারল না। গভীর রাতে দুর্গের সৈন্যরা আসন্ন উৎকোচের স্বর্ণ নিয়ে কে কীভাবে তার সদ্ব্যবহার করবে তারই আলোচনায় মত্ত হয়ে উঠেছে ঠিক সেই সময়ে দুর্গের নীচে খাঁড়ির জলে নিঃশব্দে নেমে পড়ল এক নির্ভীক কিশোর…
খাঁড়ির জলে পাহারা দিচ্ছে সিদ্দির জাহাজ।
জাহাজের সৈন্যসামন্তরা কেউ জানল না যে অন্ধকারে গা-ঢাকা দিয়ে একটি মনুষ্যমূর্তি অর্ণবপোতের প্রহরা ভেদ করে নিঃশব্দে এগিয়ে চলেছে দূরবর্তী
অরণ্য-আবৃত তীরভূমির দিকে…।
সিদ্দির সৈন্যদের দৃষ্টি এড়িয়ে গেলেও জলবাসী রাক্ষসের ক্ষুধার্ত চক্ষুকে ফাঁকি দিতে পারল না কিশোর ছেলেটি মাত্র কয়েক হাত দূরে জলের উপর মাথা তুলে আচম্বিতে আত্মপ্রকাশ করলে এক বৃহৎ কুম্ভীর!
মস্ত বড়ো হাঁ করে কুমির তেড়ে এল কিন্তু শিকার ধরা পড়ল না–হতভাগা মানুষটা হঠাৎ জলের তলায় ডুব দিয়েছে।
এত সহজে কুমিরের মুখ থেকে রেহাই পাওয়া যায় না। দূরে জলের উপর মানুষটা মাথা তুলতেই সরীসৃপ আবার আক্রমণ করলে এবার আর জলের উপর দিয়ে নয়, ডুব সাঁতার দিয়ে এগিয়ে গেল ক্ষুধার্ত কুম্ভীর…।
ছেলেটি অসাধারণ ধূর্ত, একবার শ্বাস গ্রহণ করেই সে আবার জলের তলায় আত্মগোপন করলে নির্দিষ্ট স্থানে ভেসে উঠে কুমির দেখল শিকার আবার তাকে ফাঁকি দিয়ে সরে পড়েছে।
… জল থেকে উঠে দাঁড়াল কিশোর ছেলেটি। কয়েক পা এগিয়ে এসে একটু থমকে দাঁড়াল, নিজের মনেই বললে, ডুব সাঁতার দিয়ে কুমিরটাকে ফাঁকি দিয়েছি কিন্তু সামনে আবার কী বিপদ আছে কে জানে! অনেকটা পথ যেতে হবে।
উপকূলে অবস্থিত, অন্ধকার অরণ্যের মধ্যে প্রবেশ করলে সেই রহস্যময় কিশোর–ঘন জঙ্গল আর পাহাড়ের উপর দিয়ে তার যাত্রা শুরু হল…
গভীর রাত্রি। অরণ্যের বুকে রাজত্ব করছে এখন ঘন অন্ধকার। শুধু একটুখানি জায়গায় আঁধারের যবনিকা ভেদ করে জ্বলে উঠেছে রক্তরাঙা আলোকধারা।
সেই আলোতে দেখা যায় একটি ক্ষুদ্র পর্ণকুটির এবং সেই কুটিরের দ্বারদেশে অগ্নিকুণ্ডের সম্মুখে পদ্মাসনে বসে ধ্যান করছেন এক গেরুয়াধারী সন্ন্যাসী..
অকস্মাৎ নিস্তব্ধ অরণ্যের বুকে প্রতিধ্বনি তুলে জাগল এক ভয়াবহ হুংকারধ্বনি–আহ-অ-ন-ন-ন!
সঙ্গেসঙ্গে মনুষ্যকণ্ঠের, চিৎকার–খবরদার!
সাবধান! বালাজি!
সন্ন্যাসী ভ্রূ-কুঞ্চিত করলেন, মানুষের চিৎকার! বাঘের গর্জন! কিন্তু রাতের অন্ধকারে এই শ্বাপদসংকুল অরণ্যে পদার্পণ করেছে কোন মুখ?… ব্যাপারটা। দেখে আসি।
ধুনি থেকে একটি জ্বলন্ত কাষ্ঠ তুলে নিয়ে সন্ন্যাসী শব্দ লক্ষ করে অগ্রসর হলেন…
কিছুদূর এগিয়ে যেতেই তাঁর চোখের সামনে ভেসে উঠল একটি রোমাঞ্চকর দৃশ্য–
দুটি কিশোরকে আক্রমণ করতে উদ্যত হয়েছে এক বিপুল বপু ব্যাঘ্র কিন্তু একজোড়া উন্মুক্ত তরবারির শানিত আস্ফালন অবজ্ঞা করে সে এগিয়ে আসতে সাহস করছে না, কেবল নিষ্ফল ক্রোধে বারংবার গর্জন করে প্রতিধ্বনি তুলছে নিস্তব্ধ বনানীর বুকে!
সন্ন্যাসী নির্ভয়ে এগিয়ে গেলেন, বাঘের সামনে দাঁড়িয়ে গম্ভীর স্বরে বললেন, এরা তোমার শিকার নয়। যাও–এখান থেকে চলে যাও।
সঙ্গেসঙ্গে পশ্চাত্বর্তী অরণ্যের দিকে তিনি অঙ্গুলি নির্দেশ করলেন।
দুটি কিশোর আশ্চর্য হয়ে দেখল যে বন্য ব্যাঘ্র নতমস্তকে সন্ন্যাসীর আদেশ পালন করলে। হিংস্র শ্বাপদ নিঃশব্দে অদৃশ্য হয়ে গেল অরণ্যের অন্তঃপুরে!…
সন্ন্যাসী এবার কিশোর দুটির দিকে দৃষ্টিপাত করলেন, তোমরা কারা? এই ভীষণ অরণ্যে
আরে! তিনি হঠাৎ বিস্মিত কণ্ঠে চিৎকার করে উঠলেন, বালাজি বিশ্বনাথ! তুমি এখানে?
একটি কিশোর সামনে এগিয়ে এল, করজোড়ে বললে,প্রভু! বিশেষ প্রয়োজনে আমার বন্ধুকে নিয়ে এমন অসময়ে আপনার কাছে এসেছি। বনের মধ্যে হঠাৎ আমাদের বাঘ আক্রমণ করেছিল।
বেশ করেছিল। তোমরা মুখের মতো এত রাতে কেন এখানে এসেছ? সকাল বেলা দিনের আলোতে কি আসা যায় না?
