এই সুযোগের জন্যই অপেক্ষা করছিল স্মিথ, তার অক্ষত ডান কাঁধ দিয়ে কেবিনের পলকা জানালায় সজোরে ধাক্কা মারল সে, সঙ্গেসঙ্গে জানালাটা কাঠামো সমেত ভেঙে পড়ে গেল ঘরের মধ্যে। ডান হাত দিয়ে মামালুজকে ভেতরে ঢুকিয়ে স্মিথও ঘরের ভিতর প্রবেশ করল…
লোকদুটো যখন দৌড়ে আবার কেবিনের মধ্যে ফিরে এল, স্মিথ তখন তাদের জন্য অপেক্ষা করছে, হাতে তার উদ্যত রাইফেল।
ওদের উপর নজর রাখো, মামালুজকে নির্দেশ দিল স্মিথ।
সঙ্গেসঙ্গে হিংস্র আক্রোশে দন্তবিস্তার করে গর্জে উঠল মামালুজ। কুকুরটাকে খুনের তালিম দেওয়া আছে, স্মিথ বলল, তার দৃষ্টি স্থির হয়ে আছে লোকদুটোর দিকে, নড়াচড়া করবার চেষ্টা করলেইও তোমাদের টুটি ছিঁড়ে ফেলবে।
ডাকাত দুটো নিশ্চল হয়ে দাঁড়িয়ে পড়ল।
ডাকের থলে দুটো যে-তাকটায় রয়েছে, ওটার উপর উঠে বসো দুজনে, স্মিথ কঠিন স্বরে বলে উঠল, কোণের দিকে চুপচাপ বসে থাকো।
স্মিথের হুকুম তারা তামিল করল সুবোধ বালকের মতো। মামালুজের মুখের কাছ থেকে সরে দেয়ালের দিকে যথাসম্ভব ঘেঁষে থাকার চেষ্টা করছিল তারা। স্মিথ এবার ডান হাত থেকে রাইফেলটাকে বাঁ-হাতে সরিয়ে নিল, সঙ্গেসঙ্গে অসহ্য যন্ত্রণায় তার বাঁ-কাধটা যেন ছিঁড়ে যেতে লাগল। বাঁ-হাত দিয়ে রাইফেল ছোঁড়ার ক্ষমতা ছিল না তার, নিতান্ত জরুরি একটা কাজ করার জন্যই বাঁ-হাতে রাইফেল ধরেছিল স্মিথ। সেই জরুরি কাজটা হল অন্য রাইফেলটাকে অকেজো করে দেওয়া। দ্বিতীয় রাইফেলটার লম্বা বেল্ট খুলে নিয়ে সেটাকে জানালা গলিয়ে বাইরে ছুঁড়ে দিল স্মিথ। এইবার কিছুটা নিশ্চিন্ত হয়ে ঘরের ভিতর চারদিকে একবার দৃষ্টিনিক্ষেপ করে স্মিথ আবিষ্কার করল একটা বাটি। বাটিটা শূন্যগর্ভ নয়, বরবটির তরকারিতে পরিপূর্ণ। স্মিথের দারুণ খিদে পেয়েছিল, বাটি থেকে কয়েকটা বরবটি নিয়ে সে মুখে দেওয়ার উদ্যোগ করল।
ডাকাতদের মধ্যে কালো দাড়িওয়ালা লোকটা আক্রমণের সুযোগ খুঁজছিল। স্মিথের বাঁ-হাতটা যে একেবারেই অকেজো হয়ে পড়েছে সে-কথা লোকদুটোকে বুঝতে না-দেওয়ার চেষ্টা করছিল সে। কিন্তু ধাপ্পায় কাজ হল না; কালো দাড়িওয়ালা যে-লোকটা স্মিথকে গুলি করে মেরে ফেলার চেষ্টা করেছিল, সে হঠাৎ বিদ্যুৎগতিতে লাফ মেরে তাক থেকে নেমে এল এবং স্মিথের আহত বাঁ-হাতটা ধরে ফেলার চেষ্টা করল, কিন্তু মামালুজকে পেরিয়ে আসা সম্ভব হল না..
দারুণ আতঙ্ক আর যন্ত্রণায় লোকটার চোখমুখ তখন রক্তহীন, ফ্যাকাশে এবং তার কণ্ঠভেদ করে বেরিয়ে আসছে আর্তনাদের পর আর্তনাদ
মামালুজের নিষ্ঠুর দাঁতগুলো তার কাঁধ আর বাহুর মাংস কেটে ফালা ফালা করে দিচ্ছে!
প্রাণপণ চেষ্টায় নিজেকে কোনোমতে মুক্ত করে ডাকাতটা যখন তাকের উপর তার সঙ্গীর পাশে উঠে বসল, তখন তার অবস্থা নিতান্তই শোচনীয়। নীচে দাঁড়িয়ে সগর্জনে চ্যালেঞ্জ জানাচ্ছিল মামালুজ, বোধ হয় সারমেয়-ভাষায় বলতে চাইছিল, আরেকবার চেষ্টা করে দেখবে না কি স্যাঙাৎ?…
সল্ট ওয়াটার ল্যান্ড থেকে ডাকগাড়িটা ফোর্ট এগবার্টে পৌঁছানোমাত্র চারদিকে দস্তুরমতো সাড়া পড়ে গেল। স্মিথ এবং তার স্নেজগাড়ির দুরবস্থা প্রথমেই যে-লোকটির চোখে পড়েছিল, সে-ই চিৎকার চেঁচামেচি করে সবাইকে ঘরের বাইরে জড়ো করে দিল।
দৃশ্যটা সত্যি অদ্ভুত—
মৃতপ্রায় অবস্থায় গাড়ির সামনের দিকের হাতলটা ধরে কোনোরকমে বসে ছিল স্মিথ। গাড়িতে ঠাসা ডাকের থলে, পশমের কম্বল আর শীতবস্ত্রের স্তূপের উপর চেপে বসেছিল স্লেজ-গাড়ির সবকয়টি কুকুর। না সবাই নয়, একটি বাদে গাড়ির পাশ দিয়ে কুচকাওয়াজ করার দৃপ্ত ভঙ্গিতে এগিয়ে চলেছে ধূসরবর্ণের এক কুখ্যাত কুকুর
খুনি মামালুজ!
কিন্তু তাহলে গাড়ি টানছে কারা?… না, কুকুর না, মানুষেই টানছে গাড়ি। স্লেজ-গাড়ির লাগামগুলো মানুষ দুটোর বাহুর তলা দিয়ে ঘুরিয়ে ঘাড়ের উপর দিকে বাঁধা রয়েছে, তাদের আর এখন দাঁড়াবার ক্ষমতা নেই। লোকদুটোর চোখমুখে নিদারুণ আতঙ্কের আভাস, তারা বার বার তাকাচ্ছিল মামালুজের দিকে। তাদের পোশাক-পরিচ্ছদ রক্তাক্ত ছিন্নভিন্ন।
ফোর্ট এগবার্ট ব্যাঙ্কের ম্যানেজার একবার লোকদুটোর বিবর্ণ মুখের দিকে তাকিয়ে স্মিথকে বললেন, এই লোক দুটো এক সপ্তাহ আগে আমাদের ব্যাঙ্কে হানা দিয়ে হেড টেলারকে গুলি করেছিল, তারপর পাঁচ হাজার ডলার লুঠ করে পালিয়ে গিয়েছিল। তোমার মালপত্রের মধ্যে সেই পাঁচ হাজার ডলার রয়েছে–তাই না?
দারুণ ক্রোধে চিৎকার করে উঠল স্মিথ, ওসব ব্যাপার আমি কিছু জানি না। তোক দুটো আমায় খুন করে ডাকের থলেগুলো লুঠ করার চেষ্টা করেছিল। আমার কুকুরগুলোকে প্রায় খোঁড়া করে দিয়েছিল ওরা। কাজেই আমার মনে হল কুকুরের কর্তব্য ওদেরই করা উচিত, তাই কুকুরগুলোকে গাড়িতে বসিয়ে আমি ওদের দিয়ে গাড়ি টানিয়েছি।
ওই খুনি কুকুরটা তাহলে ওদের রক্ষী হিসাবে ছিল?
হ্যাঁ, তা তো ছিলই। তা ছাড়া শয়তান দুটোকে ধরে ফেলার পর দু-দুবার ও আমার প্রাণ বাঁচিয়েছে।
কথাগুলো বলেই স্মিথ মাথা ঘুরে পড়ে যাচ্ছিল। ম্যানেজার তাকে ধরে ফেলে বলে উঠলেন, সাংঘাতিক আঘাত লেগেছে তোমার। চলো, আগে তোমাকে ডাক্তারের কাছে নিয়ে যাই।
ম্যানেজারের হাত ছাড়িয়ে স্মিথ কোনোমতে ঝুঁকে পড়ে তার অক্ষত হাতটা দিয়ে ত্রিভুজের মতো একজোড়া কানে মৃদু টান দিল, তারপর বলল, আগে মামালুজকে শহরের সবচেয়ে ভালো খাবার দেওয়ার ব্যবস্থা করুন। আলাস্কার সেরা কুকুর আমার মামালুজ।
নায়কের জন্ম
আজ থেকে বহু বৎসর আগেকার কথা…
