স্লেজ-গাড়িটা খুঁজে স্মিথ হতাশ হল। গাড়ির সব জিনিসই ভিতরে নিয়ে গেছে লোকদুটো। মনে মনে ভাগ্যকে ধিক্কার দিয়ে স্মিথ কেবিনের যে-কোণ থেকে কুকুরগুলোকে দেখা যায় না, নিঃশব্দে সেই কোণটায় গিয়ে পৌঁছাল।
স্মিথের বাঁ-হাত অকেজো, ডান হাত দিয়ে খুঁড়িতে তৈরি কেবিনের দেয়ালে একটা জোড় থেকে আলগা কিছু শ্যাওলা নীচের দিকে ঝরিয়ে ফেলে দিল স্মিথ। তৎক্ষণাৎ জোড়ের ফাঁক দিয়ে বাইরে এসে পড়ল সরু এক ফালি আলো। সেই ফাটলে চোখ রেখে ঘরের ভিতরই দেখার চেষ্টা করতে লাগল স্মিথ
ঘরের এককোণে মরচে-ধরা লোহার চুল্লিতে আগুন জ্বলছে… পিছন দিকের দেয়ালে যাত্রীদের শয়ন করার জন্য যে দুটো বড়ো বড়ো তাক আছে, তার একটার উপর পশমের জামাকাপড় আর ডাকের থলেগুলো গাদা করে রাখা… ছুঁচলো-মুখে দাড়িওয়ালা লোকটা অন্য তাকটাতে বসে। পাশে-রাখা একটা ডাকের থলে থেকে চিঠিপত্র বার করে সেগুলোর উপর চোখ বুলিয়ে নিচ্ছে…অন্য লোকটা একটা টেবিলে বসে আছে, সেও চিঠি দেখতে ব্যস্ত…
হঠাৎ দুটো রাইফেলের উপর স্মিথের নজর পড়ল। দুটোর মধ্যে একটা তার নিজের রাইফেল। টেবিল আর তাকের মাঝখানে দেয়ালে হেলান দিয়ে দস্যুদের হাতের খুব কাছাকাছি জায়গায় রাইফেল দুটো রাখা হয়েছে।
স্মিথ সোজা হয়ে দাঁড়াল। ঠান্ডায় তার পা থেকে মাথা পর্যন্ত একবার কেঁপে উঠল। এতক্ষণ লোক দুটোকে অনুসরণ করে দ্রুত পথ চলার ফলে তেমন ঠান্ডা লাগেনি, এখন বাইরের হিমশীতল আবহাওয়া স্মিথের হাড়ে কাঁপুনি ধরিয়ে দিচ্ছে। আবার ফাটলটা দিয়ে চোখ কুঁচকে তাকিয়ে স্মিথ দেখতে পেল টেবিলে-বসা লোকটা ঘুরে বসেছে, তার পরনের প্যান্ট হাঁটু পর্যন্ত চিরে গেছে, আর সেই ফাঁক দিয়ে দেখা যাচ্ছে লোকটার পায়ের উপর জড়ানো রয়েছে একটা রক্তাক্ত ব্যান্ডেজ।
স্মিথ আর একবার ঘরের চুল্লিটার দিকে চেয়ে দেখল আগুন ভালোভাবেই জ্বলছে। কাছেই ঘন গাছপালায় ঘেরা একটা জায়গার মধ্যে স্মিথ গা-ঢাকা দিল… ।
একটা পাতা-ঝরা শুকনো বার্চ গাছের ছাল ছুরি দিয়ে ফুটখানেকের মতো কেটে নিয়ে স্মিথ সেটাকে উলটোদিকে গুটিয়ে সোজা করে নিল, তারপর ছালটাকে কেবিনের এককোণে রেখে দিয়ে পা টিপে টিপে কুকুরদের থাকার জায়গাটায় উপস্থিত হল।
গর্জিত কণ্ঠের ঐকতানে কুকুররা স্মিথকে সাদর অভ্যর্থনা জানাল। শঙ্কিত হয়ে গলায় যতদূর সম্ভব মধু ঢেলে স্মিথ তাদের শান্ত করার চেষ্টা করতে লাগল। চেষ্টা প্রায় সফল হল, মামালুজ ছাড়া দলের অন্য কুকুরগুলো অল্প সময়ের মধ্যেই চুপ করল। মামালুজের ক্রুদ্ধ কণ্ঠ তবুও স্তব্ধ হল না।
কেবিনের পিছন দিকের দরজাটা হঠাৎ খুলে গেল, বাইরে ছুটে এল এক ঝলক আলো। তড়াক করে লাফিয়ে উঠে স্মিথ চটপট একটা ঝোপের আড়ালে গা-ঢাকা দিল।
একটি লোক এগিয়ে এল, কুকুরগুলোর আশেপাশে চারদিকে একবার নজর বুলিয়ে নিল, কিন্তু সন্দেহজনক কিছুই তার চোখে পড়ল না। কুকুরদের উদ্দেশে গালাগালি দিতে দিতে লোকটি আবার প্রবেশ করল ঘরের মধ্যে।
স্মিথের শরীরের পেশিগুলো টান টান হয়েছিল–লোকটি ঘরে ঢুকতেই সে ঝোপের পিছন থেকে বেরিয়ে তাড়াতাড়ি চলে এল মামালুজের দিকে। এবার তাকে শান্ত করতে বিশেষ অসুবিধা হল না। প্রথমে অবশ্য খুনি কুকুরটা স্মিথের উপর ঝাঁপিয়ে পড়ার উপক্রম করেছিল, কিন্তু মিষ্টি কথায় তোয়াজ করে মাথায় দুই-একবার হাত বুলিয়ে দেওয়ার পর মামালুজ আবার স্বাভাবিকভাবে উঠে দাঁড়াল। মুখ তুলে একবার যেন লোমশ লেজটাও নেড়ে ফেলল মামালুজ। ব্যস ওই পর্যন্ত আদর-সোহাগ দেখানোর ব্যাপারটা মামালুজের ধাতেই নেই আসলে। তার একজন মনিব আছে, কাজেই তাকে মনিবের কথা শুনে চলতে হয়, এইটুকুর বেশি খাতির করার কথা ভাবতেই পারে না মামালুজ।
মামালুজের গলায় বাঁধা শিকলের অন্য প্রান্ত খুঁটি থেকে খুলে নিয়ে স্মিথ গুঁড়ি মেরে এগিয়ে এল কেবিনের কোণের দিকে। সেখানে তাকে বেঁধে রেখে স্মিথ ওক গাছের ছালটা নিয়ে কেবিনের ছাতে ওঠার উদ্যোগ করল। গাছের গুঁড়ি-বাঁধা দেয়ালের বাইরের দিকে বেরিয়ে-আসা অংশগুলোতে মই-এর ধাপের মতো পা রেখে সে উঠতে লাগল এবং শেষ পর্যন্ত গিয়ে পৌঁছাল সামনের দিকে ঝুঁকে-পড়া ছাতটার উপর। আস্তে আস্তে এগিয়ে কেবিনের চুল্লি থেকে ধোঁয়া বার স্মিথের ফস্তিস্বর–কেউ তৈরি হল রির হাত বুলিও লোক টলতেয়ার উপক্রম হওয়ার চিমনির কাছে চলে গেল স্মিথ, তারপর গাছের ছালটা মুড়িয়ে চিমনির মধ্যে ভালো করে ঢুকিয়ে দিয়ে নলের মুখ বন্ধ করে দিল। এবার ছাত থেকে নামার পালা–নিঃশব্দে প্রায় লাফ দিয়েই সে নামল এবং মামালুজকে নিয়ে এসে দাঁড়াল জানালার কাছে…
কিছুক্ষণ পরেই কেবিনের ভিতর থেকে দমফাটা কাশির আওয়াজ ভেসে এসে জানিয়ে দিল স্মিথের ফন্দিটা বিলক্ষণ কাজে লেগেছে। আবার কাশির আওয়াজ, তারপরই শোনা গেল অপরিচিত কণ্ঠস্বর–কেউ একজন জানতে চাইছে চুল্লিটার কী হল!
এইবার আক্রমণের জন্য তৈরি হল স্মিথ। তার শরীরের প্রত্যেকটি ইন্দ্রিয় এখন সজাগ হয়ে উঠেছে, নীচু হয়ে মামালুজের মাথায় একবার হাত বুলিয়ে দিল সে…।
আচম্বিতে প্রচণ্ড শব্দে খুলে গেল কেবিনের দরজা। দুটি লোক টলতে টলতে বাইরে বেরিয়ে এল ঘরের ভিতর মুখবন্ধ চুল্লিটার ধোঁয়ায় তাদের শ্বাসরোধ হওয়ার উপক্রম হয়েছে। ভীষণভাবে কাশতে কাশতে বাইরের খোলা হাওয়ায় তারা শ্বাসপ্রহণের চেষ্টা করতে লাগল।
