খানিকটা এগিয়ে গিয়ে চুল্লির আগুনটা আবার জ্বালাতে গিয়ে তিন-তিনবার মেঝের উপর পড়ে গেল স্মিথ। ফলে কিছুক্ষণ বিশ্রাম নিতে সে বাধ্য হল। শারীরিক কষ্টের উপর ছিল মানসিক দুশ্চিন্তা। রাইফেলটা নেই, পিছনে রাখা নীল-সাদা ডোরাকাটা থলেগুলো উধাও! বাইরের দিকে দৃষ্টিনিক্ষেপ করে স্মিথ স্লেজ-গাড়িটাকে দেখতে পেল না, অর্থাৎ গাড়িটাকেও নিয়ে গেছে লুঠেরাগুলো!
ডাকগাড়ি লুঠ! ডাকাতরা আসলে কোন জিনিসটা নিতে এসেছিল? বেয়ারভ্যালি মাইনিং কম্পানির ঠিকানায় রেজিস্ট্রি করে পাঠানো সেই পার্সেলটাই কি?
সাধারণ ডাকে পাঠানো চিঠিপত্র লুঠ করে নেওয়ার লোভ কার হবে? এদিকে যে-ডাক আসে, তাতে খনিজ পদার্থ মেশানো মাটি বা পাথরের নমুনা থাকে না। মাথাটা অসম্ভব ঠান্ডা রেখে স্মিথ এসব কথা ভাবছিল আর সেইসঙ্গে লুঠেরাদের ফেলে-যাওয়া পুরানো ধরনের ছোটো বাক্সটার মধ্যে হাত গলিয়ে কিছু খাবার খুঁজে বার করার চেষ্টা করছিল। চুল্লির আঁচে শরীরের হাড়-কাঁপানো শীতের ভাব কিছুটা কেটে যাওয়ার পর স্মিথ তার ক্ষতস্থানগুলো পরিষ্কার করে ভালোভাবে বেঁধে নিল, তারপর কিছুক্ষণ ভেবে ভবিষ্যৎ কর্মপন্থা স্থির করে ফেলল।
লুঠেরাগুলোকে তাড়া করে ধরে ফেলা সম্ভব নয়। স্মিথ নিরস্ত্র, তার উপর একটা হাত তার জখম। ডাকাতগুলো খুব সম্ভব ধরে নিয়েছে সে মরেই গেছে গুলি খেয়ে। কুকুরগুলো সমেত স্লেজ-গাড়িটা পেয়ে যাওয়ায় ডাকাতদের পক্ষে এখনই লম্বা পথ পাড়ি দিয়ে পলায়ন-পর্ব নিতান্তই সহজ, কিন্তু আহত দেহ নিয়ে স্মিথের পক্ষে পায়ে হেঁটে তাড়াতাড়ি ফোর্ট এগবার্টে পৌঁছে নিজের চিকিৎসায় ব্যবস্থা করা প্রায় অসম্ভব বললেই চলে।
খাবারের একটা ছোটো প্যাকেট বানিয়ে নিয়ে স্মিথ কেবিন ছেড়ে বাইরে বেরিয়ে এল। ফোর্ট এগবার্টের রাস্তা ধরে সোজা এগিয়ে যাবে বলেই মনস্থ করেছিল সে, কিন্তু বাইরে এসে বরফের উপর পায়ের ছাপগুলো দেখেই তারা চিন্তাধারা বদলে গেল।
পায়ের ছাপগুলো দেখে সে বুঝতে পারল ডাকাতগুলো ফোর্ট এগবার্টের দিকে যায়নি, গেছে। উলটো দিকে অর্থাৎ যেদিক থেকে স্মিথ এসেছিল সেই দিকে। তার চেয়েও উল্লেখযোগ্য ব্যাপারটা হল যে, তার কুকুরগুলো মোটেই ঠিকভাবে পথ চলেনি। পদচিহ্ন দেখে স্পষ্টই বোঝা যাচ্ছে যাত্রা আরম্ভের প্রথমদিকে অন্তত কুকুরদের মধ্যে নিয়মশৃঙ্খলা বলে কিছু ছিল না।
ফোর্ট এগবার্টের পথ না-ধরে পদচিহ্ন অনুসরণ করে এগিয়ে চলল হিমবাহের দিকে। বেশ কয়েক মিনিট ধরে কুকুরের এলোমেলো পায়ের দাগ পর্যবেক্ষণ করে স্মিথ বুঝতে পারল কুকুরগুলোকে ঠিকমতো ক্রমানুসারে সাজিয়ে গাড়িতে জোড়া হয়নি। আর একটু ভালো করে দেখে সে বুঝল মামালুজকে দলের প্রধান হিসাবে সারির প্রথমদিকে বাঁধা হয়নি–অতএব লুঠেরাদের যে বেশ ঝাটে পড়তে হবে সে-বিষয়ে সন্দেহ নেই। স্মিথের সারমেয়বাহিনী সম্পর্কে সঠিক ধারণা না-থাকলে কারো পক্ষে তাদের পর পর ঠিকমতো সাজিয়ে গাড়িতে জোড়া অসম্ভব, আর নেতৃত্বের পদটা বিনা প্রতিবাদে ছেড়ে দেওয়ার পাত্র মামালুজ নয়।
স্মিথ তার আহত কাঁধকে বিশ্রাম দেওয়ার জন্য থেমে গিয়ে কিছুক্ষণ চিন্তা করল। ডাকাতদের সঙ্গে দৈবাৎ দেখা হয়ে গেল সে কী করতে পারে? এদিকে চব্বিশ ঘণ্টার মধ্যে চিকিৎসার ব্যবস্থা না করতে পারলে মৃত্যু অনিবার্য। ।
হঠাৎ একটু দূরে পাথরের উপর একটা চিহ্ন স্মিথের দৃষ্টি আকর্ষণ করল। এগিয়ে গিয়ে চিহ্নটা ভালো করে পরীক্ষা না-করেই ওখানে কী ঘটেছিল অনুমান করতে পারছিল স্মিথ। বরফের উপর ফুট দুই জায়গা জুড়ে একটা ছোটো গর্তের মতো ছিল, এলোমেলো পায়ের দাগে সেই জায়গাটা বিপর্যস্ত বেশ বোঝা যাচ্ছে ওখানে একটা খণ্ডযুদ্ধ হয়ে গেছে। ধবধবে সাদা বরফের উপর রক্তের চিহ্ন আর গোছ গোছ কুকুরের লোম ছড়িয়ে আছে এখানে-ওখানে। মানুষের পায়ের দাগও রয়েছে। একটা লোকের কনুইয়ের দাগও স্পষ্ট দেখা যাচ্ছে ওখানে নিশ্চয়ই লোকটা উলটে পড়ে গিয়েছিল।
দাগটার ওপারে রক্তের ফোঁটাগুলো বেশি ঘন। কনুইতে ভর করে উবু হয়ে আরও ভালো করে দাগগুলো দেখে স্মিথ বুঝতে পারল দুটো কুকুর কামড়াকামড়ির ফলে আহত হয়েছে, আরও দুটো কুকুর পথ চলেছে খুঁড়িয়ে খুঁড়িয়ে। আগের দিন হিমবাহের পথ ধরে আসার সময়ে যে-দুটো কুকুরের পায়ে চোট লেগেছিল, এই পদচিহ্নগুলো নিশ্চয়ই তাদের।
আর একটা চিহ্ন দেখে স্মিথ সবচেয়ে খুশি হল–স্লেজ-গাড়ির রানার যাওয়ার মসৃণ দাগটার উপর ফোঁটা ফোঁটা রক্ত পড়েছে, অর্থাৎ গাড়ির পিছনে যারা হেঁটে আসছিল সেই ডাকাত দুটোর মধ্যে অন্তত একজন জখম হয়েছে।
অনেকক্ষণ পথ চলার পর স্মিথ যখন বিপদসংকুল হিমবাহের শেষ প্রান্ত অতিক্রম করছে, বেলাশেষের স্নান আলো তখন বিদায় নিতে চাইছে পৃথিবীর বুক থেকে। একটু পরেই জ্যোৎস্নার আলোকধারা ছড়িয়ে পড়ল চারদিকে। খাবারের প্যাকেট থেকে শুকনো মাংস নিয়ে চিবোতে চিবোতে সামনের দিকে পা ফেলে এগিয়ে চলল স্মিথ…
এ কী! ওটা কি রিলিফ কেবিন?… হ্যাঁ, রিলিফ কেবিনই বটে। ঘরের ভিতরের আলো জানালার পথে স্মিথের দৃষ্টি আকর্ষণ করেছে। কিন্তু ওখানে আলো জ্বলছে কেন? আরে! স্লেজ-গাড়িটাও যে দেখা যাচ্ছে দরজার কাছে! ডাকাত দুটো তাহলে ওই রিলিফ কেবিনের মধ্যেই রাত কাটাবে নাকি? স্মিথ ঠিক করল চুপি চুপি দরজার কাছে রাখা স্লেজ-গাড়িটার কাছে এগিয়ে গিয়ে দেখবে তার মধ্যে বন্দুক আছে কি না। সৌভাগ্যের বিষয়, কেবিনটার যে-ঘরে আলো জ্বলছিল, কুকুরদের থাকার ঘরটা তার পিছন দিকে–অতএব কুকুরদের কাছে তার ধরা পড়ার ভয় নেই। কুকুরগুলো মনিবকে দেখে চিৎকার করলে স্মিথ ডাকাতদের চোখেও ধরা পড়ে যাবে, কিন্তু এখন আর সেই ভয় নেই বুঝে সে নির্ভয়ে অগ্রসর হল…
