স্মিথ হাঁপ ছেড়ে বাঁচল। খুব সাবধানে ধীরে ধীরে কুকুরগুলোকে চালিয়ে একটা নিরাপদ জায়গায় নিয়ে এল সে। বর্ণসংকর কুকুরটার প্রাণহীন প্রকাণ্ড দেহটা ততক্ষণে বরফের উপর শক্ত হয়ে গেছে। আরও দুটো কুকুর অতিকষ্টে খুঁড়িয়ে খুঁড়িয়ে হাঁটছিল। স্মিথ তাদের বাঁধন খুলে গাড়ির উপর তুলে নিতে বাধ্য হল। অন্যান্য কুকুরগুলো তখন রক্তাক্ত ক্ষতস্থান চাটছিল আর দলপতির দাঁত-খিচানো নির্দেশের জবাব দিচ্ছিল একইভাবে দাঁত খিঁচিয়ে!
স্মিথ মশারদের উপাস্য সব সাধুসন্তদের নামে শপথ নিয়ে স্থির করল যে, রিলিফ কেবিন-এ পৌঁছেই সে মামালুজকে শেষ করবে। একটা খুনি কুকুরের সৌন্দর্যের মোহে পড়ে নিতান্ত নির্বোধের মতো বিচার-বিবেচনা বিসর্জন দিতে বসেছিল সে।
হিমবাহের পথে এই বিপর্যয় আর কুকুরগুলোর ক্ষয়ক্ষতির জন্য রিলিফ কেবিনে পৌঁছাতে তার বেশ রাত হয়ে গেল। মামালুজ ছাড়া সব কুকুরদের খেতে দিল স্মিথ। মামালুজকে খেতে দেওয়া তো দূরের কথা, তার দিকে ফিরে একটা কথাও বলল না সে। মামালুজ তার রক্তিম বাদামি চোখে প্রতিবাদ আর অনুযোগের আগুন জ্বালিয়ে বার বার নীরবে দৃষ্টিপাত করছিল স্মিথের দিকে সে বোধ হয় বুঝতে পেরেছে তার বরাতে কী ঘটতে চলেছে…
রিলিফ কেবিনের কাছে তুষার-ঝড় নেই। আকাশ পরিষ্কার। চাঁদের আলোয় রাতের পৃথিবী প্রায় দিনের মতোই স্পষ্ট। খুনি কুকুরটার চোখের দিকে তাকিয়ে স্মিথ রাইফেল তুলল। অন্য কোনো কুকুর এই অবস্থায় পড়লে ভয়ে কুঁকড়ে পিছিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করত, কিন্তু মামালুজ বিন্দুমাত্র ভয়ের ভাব দেখাল না। জ্বলন্ত চোখে স্মিথের দিকে তাকিয়ে সে যেন বলতে চাইছে, হাতে বন্দুক না-থাকলে তোমার বীরত্বের বহর দেখে নিতাম। কুকুরটার বেপরোয়া ভাব দেখে স্মিথের মাথায় রক্ত চড়ে যাচ্ছিল, রাইফেলের মাছির দিকে তাকিয়ে লক্ষ স্থির করার চেষ্টা করলেও তার হাত কঁপছিল–
কুকুরটা শান্তভাবে দাঁড়িয়ে চরম আঘাতের জন্য অপেক্ষা করছে, তার আচরণে ভয়ের চিহ্নমাত্র নেই! স্থিরদৃষ্টিতে সে তাকিয়ে আছে স্মিথের দিকে!…
স্মিথের মনে হল মামালুজ বলতে চাইছে, আমার যা কর্তব্য বলে মনে হয়েছে, তাই করেছি আমি। আমার স্বভাবটাই এমন। কী করব বল? তার জন্য যদি আমায় শেষ করে দিতে চাও, তবে তাই করো।
স্মিথের আঙুল রাইফেলের ট্রিগারে চেপে বসেছিল, কিন্তু ওই পর্যন্তই ট্রিগার টিপে গুলি ছুঁড়তে সে পারল না। সে স্পষ্টই বুঝতে পারছিল কুকুর হলেও মামালুজ তার চাইতে অনেক বেশি সাহসী। স্মিথ স্থির করল এবারের গন্তব্যস্থল ফোর্ট এগবার্টে গিয়ে পৌঁছানো পর্যন্ত কুকুরটার মৃত্যুদণ্ড সে মুলতুবি রাখবে। আপাতত শ্রান্ত দেহকে বিশ্রাম নেওয়া প্রয়োজন, অতএব শয্যার আশ্রয় গ্রহণ করল স্মিথ। বিছানায় শুয়েও সহজে ঘুম এল না, সে ভাবতে লাগল তার বন্ধুরা এবার কী বিদ্রুপের হাসিই-না হাসবে এই ব্যাপারটা নিয়ে!…
হঠাৎ কুকুরদের ভয়ংকর গর্জনের আওয়াজে স্মিথের ঘুম ভেঙে গেল। প্রথমে তার মনে হল কোনো জন্তুজানোয়ার হয়তো কুকুরগুলোর কাছে এসে পড়েছে। পরক্ষণেই ভুল ভাঙল একটি লোকের ভারী পায়ের শব্দ আর মামালুজের গম্ভীর গর্জনধ্বনি ভেসে এল তার কানে!
চটপট বিছানা থেকে উঠে গিয়ে অন্ধকারের মধ্যে হাতড়ে তার টর্চটা খুঁজে বার করার চেষ্টা করছিল স্মিথ, হঠাৎ দড়াম করে খুলে গেল ঘরের দরজা। খোলা দরজা দিয়ে চাঁদের আলো ঝাঁপিয়ে পড়তেই ঘরের অন্ধকার দূর হয়ে গেল, আর কুকুরগুলোর চিৎকারের কারণটাও তৎক্ষণাৎ বুঝতে পারল স্মিথ। ফারের টুপি আর ডেনিমের পার্কা পরা খুব লম্বা-চওড়া একটা লোক প্রায় সমস্ত দরজাটা জুড়ে দাঁড়াল এবং স্মিথের বুক লক্ষ করে তুলে ধরল হাতের রাইফেল। তার ঠিক পিছনেই একটা লোক সঙ্গীর কাঁধের উপর দিয়ে উঁকি মেরে ঘরের ভেতরটা দেখার চেষ্টা করতে লাগল। রাইফেলধারীর মুখে কালো রং-এর ছাঁটা দাড়ি, তার জ্বলন্ত দৃষ্টি স্থির হয়ে আছে স্মিথের বুকের উপর। লোকটার উদ্দেশ্য বুঝতে পেরে স্মিথ হঠাৎ পিছন দিকে লাফিয়ে পড়ে নিজের রাইফেলটার জন্য হাত বাড়াল।
তৎক্ষণাৎ সগর্জনে অগ্নিবর্ষণ করল আগন্তুকের রাইফেল। সঙ্গেসঙ্গে কাঁধের বাঁ-দিক থেকে একটা যন্ত্রণার অনুভূতি স্মিথকে প্রায় অসাড় করে দিল। আবার গর্জে উঠল আততায়ীর আগ্নেয়াস্ত্র। দ্বিতীয়বারের আঘাত সহ্য করতে পারল না স্মিথ, অচৈতন্য হয়ে লুটিয়ে পড়ল মেঝের উপর…
জ্ঞান ফিরে আসার পর প্রথমেই যে অনুভূতিটা স্মিথকে দংশন করল, তা হচ্ছে নিদারুণ ঠান্ডার অনুভূতি। অসহ্য শীত তাকে কাঁপিয়ে তুলেছে–কেবিনের দরজা খোলা, ঘরের কোণে অগ্নিকুণ্ডটা নিবে গেছে অনেক আগেই। প্রাণপণ চেষ্টা করে সে তার আড়ষ্ট শরীরটা মেঝে থেকে টেনে হিঁচড়ে তুলে নিয়ে কোনোরকমে পায়ের উপর ভর দিয়ে দাঁড়াল। আহত দেহ প্রতিবাদ জানাল তৎক্ষণাৎ শরীরের বাঁ-দিকে, বিশেষ করে বাঁ-হাতের উপর দিয়ে তীব্র যন্ত্রণার ঢেউ খেলে গেল। ডান হাতটাও কাঁপছিল, তাই দিয়েই বাঁ-দিকের ক্ষতস্থানটা পরখ করার চেষ্টা করল স্মিথ
রাইফেলের প্রথম গুলিতে বাঁ-কাঁধের হাড় ভেঙে গেছে, জামাকাপড়ের তলায় পশমের অন্তর্বাস রক্তে ভেজা, দারুণ ঠান্ডায় রক্তসিক্ত পশমের টুকরোটাকে বরফ দিয়ে তৈরি বলে মনে হচ্ছে সমস্ত শরীর কুঁকড়ে যাচ্ছে অসহ্য যন্ত্রণায়। দ্বিতীয় গুলিটা বাঁ-হাতের উপরের অংশ ভেদ করে চলে গেছে, তবে হাড় ভাঙেনি।
