জন্তুটা ভীষণ বদরাগী, স্মিথ বলত, কিন্তু সে পথ চলতে জানে। আমার চাইতেও ভালোভাবে সে পথের সন্ধান করতে পারে। বরফের তলায় গভীর খাদের মরণফঁদ এড়িয়ে চলার ক্ষমতা জন্তুটার আছে। নেতৃত্ব করার জন্যেই জন্মগ্রহণ করেছে মামালুজ।
কেটে গেল জানুয়ারি মাসের শীতার্ত দিনগুলো; এল ফেব্রুয়ারির অনিশ্চিত আবহাওয়া। সুৎমা নামক দিগন্তবিস্তৃত সমতলভূমি দিয়ে এগিয়ে যাওয়ার পথে তুষার-ঝটিকার মুখে পড়ল স্মিথ। আশেপাশে সব কিছু তখন তুষারের আবরণে অদৃশ্য। মামালুজের উপরেই পথ চলার সম্পূর্ণ দায়িত্ব অর্পণ করল নিরুপায় স্মিথ। মামালুজ তার প্রভুকে নিরাশ করেনি তার নির্ভুল নেতৃত্ব দুর্গম তুন্দ্রা অঞ্চলের বরফঢাকা মৃত্যুফাঁদ এড়িয়ে দশ মাইল রাস্তা পার হয়ে স্লেজ গাড়িটাকে পৌঁছে দিল অরণ্যের প্রবেশপথে।
কিন্তু তারপরই এল সেই বীভৎস দিন, নরকের প্রহরী যেদিন তার সম্বন্ধে যাবতীয় ভবিষ্যদ্বাণীগুলোকে প্রায় সত্য বলে প্রমাণ করে দিল…
স্যালকিনা হিমবাহের উপর দিয়ে ছুটে চলেছে উন্মত্ত বাতাস, পুঞ্জ পুঞ্জ মেঘের মতো তুষারের আবরণে দৃষ্টির অন্তরালে অদৃশ্য হয়েছে স্যালকিনার সুগভীর মরণফাঁদগুলো, মাংসের মধ্যে যেন কেটে বসতে চাইছে মেরুপ্রদেশের হিমশীতল বায়ু… শকটবাহী কুকুরদের লোমে বরফ জমে গিয়ে ঝুলছে ফিতের মতো, মুখের কালো লোম বরফে সাদা, চোখের উপর বরফ জমে জন্তুগুলোর অবস্থা প্রায় অন্ধের মতো… তাদের মালিক স্মিথের অবস্থাও তার পোষ্যদের চাইতে ভালো নয়।
হিমবাহ স্যালকিনা–
বন্ধুর গিরিখাতে পরিপূর্ণ উত্রাই-এর পথ। সেই পথ বেয়ে স্লেজ গাড়িটাকে চালিয়ে দিয়েছিল স্মিথ। স্লেজের তিন দাঁতওয়ালা গতি-নিরোধক ব্রেকটা চেপে ধরেছিল সে, কিন্তু হিমবাহের বরফ এত মসৃণ আর শক্ত যে, ব্রেকের দাঁত কিছুতেই সেই কঠিন বরফ কেটে ভালোভাবে বসতে পারছিল না। স্লেজগাড়ির রানার (ইস্পাতের সমান্তরাল ফলক, যার উপর ভর করে স্লেজ চলে) দ্রুত গতিতে বরফের উপর দিয়ে এগিয়ে যাচ্ছিল। সেই বরফের রং কোথাও ইবনাইটের মতো মসৃণ কালো, কোথাও-বা সমুদ্রের মতো সবুজ। কখনো কখনো গভীর গিরিখাতের কাছ ঘেঁষে গাড়িটা পার হচ্ছিল। স্মিথের তখন আতঙ্কে শ্বাসরোধের উপক্রম। একটা নড়বড়ে জীর্ণ সাঁকো বাতাসে দুলছিল; অবিশ্বাস্য দ্রুতবেগে কুকুর-বাহিনীর স্লেজ-গাড়ি সেটাকে পার হয়ে গেল। ধীরেসুস্থে পার হতে গেলে সেই সাঁকোটা নির্ঘাত ভেঙে পড়ত হুড়মুড় করে।
দলপতি মামালুজ সম্পর্কে একটা সশ্রদ্ধ মনোভাব গড়ে উঠেছিল স্মিথের মনে, আর ঠিক সেই সময়েই দুর্ঘটনার সূত্রপাত।
পাহাড়ের গায়ে দুটি ফাটলের সন্ধিস্থলে পৌঁছে যাত্রাপথ স্থির করতে একটু দ্বিধায় পড়েছিল মামালুজ, মুহর্তের জন্য সে থমকে গিয়েছিল। ব্লেজার নামে যে-কুকুরটা এতক্ষণ তার গা ঘেঁষে চলছিল, সে হঠাৎ মামালুজের পিছনের পায়ের উপর কামড় বসাল। ব্লেজার ছিল বর্ণসংকর, সাইবেরীয় আর এস্কিমো রক্তের সংমিশ্রণে তার জন্ম, যেমন প্রকাণ্ড শরীর তেমনই প্রচণ্ড শক্তি দলপতির দ্বিধার ভাবটা সে অমার্জনীয় ত্রুটি বলেই মনে করেছিল। কিন্তু ওই কামড়টা যে তারই মৃত্যুর পরোয়ানা বহন করে আনবে, সেটা বোধ হয় তার জানা ছিল না। আর সেই নৃশংস মৃত্যুদণ্ডকে কার্যকরী করা জন্য ওই জায়গাটার চাইতে উপযুক্ত স্থানও বোধ হয় আর পাওয়া যেত না।
কুকুরগুলোর ঝটাপটির মাঝখানে স্মিথ প্রাণপণে ব্রেক চেপে ধরেও বারো ফুট লম্বা মালপত্র-ঠাসা ভারী স্লেজটাকে সামলাতে পারছিল না–ধীরে ধীরে গাড়িটা এগিয়ে যাচ্ছিল পাশের অতলস্পর্শী গিরিখাদের দিকে। তবু মরিয়ার মতো স্লেজটাকে আটকে রাখার প্রাণান্তকর চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছিল স্মিথ। কুকুরগুলোর লড়াই দেখার সময় বা সুযোগ ছিল না তার, তবে তাদের ভয়ংকর চিৎকার শুনে স্মিথ বুঝতে পারছিল যে, ওখানে চলছে এক মৃত্যুপণ লড়াই। মুহূর্তের মধ্যে নয়টি কুকুরের কণ্ঠে জেগেছে ক্রুদ্ধ গর্জন, শুরু হয়েছে ঝটাপটি আর রক্তাক্ত তাণ্ডব…
স্মিথ প্রাণপণে চিৎকার করে মামালুজকে ডাকল একবার। কিন্তু ঝড়ের প্রচণ্ড শব্দে তার গলার আওয়াজ ডুবে গেল। খুব ধীরে ধীরে স্লেজটা তখন এগিয়ে চলেছে খাতের দিকে। সারমেয় বাহিনীর যোদ্ধাদের সেদিকে দৃষ্টি নেই, তারা তখনও যুদ্ধ করছে আর তাদের সমবেত ওজনে স্লেজের সামনের দিকটা নেমে যাচ্ছে তলার দিকে। স্মিথের চোখের পাতার উপর বরফ জমে গেছে, তারই ফাঁক দিয়ে তাকিয়ে অনেক কষ্টে অবস্থাটা বুঝবার চেষ্টা করছে সে। আর মাত্র ফুটখানেক এগিয়ে গেলেই স্মিথকে স্লেজ ছেড়ে লাফিয়ে পড়ে নিজের প্রাণ বাঁচাতে হবে, গাড়িটাকে বাঁচানোর কোনো উপায়ই থাকবে না। এই অবস্থার মধ্যেও সে স্লেজের সঙ্গে বাঁধা কুকুরগুলোর লাগাম কেটে দেওয়া কথা ভাবল–কিন্তু পরক্ষণেই বুঝল বড়ো দেরি হয়ে গেছে, এখন লাগাম কেটে দিয়েও জন্তুগুলোকে বাঁচানো যাবে না, কয়েক মুহূর্তের মধ্যেই স্লেজ সমেত এক-শো ফুট নীচে আছড়ে পড়ে শেষ হয়ে যাবে তারা।
স্মিথ আবার চিৎকার করে উঠল। স্লেজটাও যেন দুলে উঠল একবার, তারপর হঠাৎ থেমে গেল। মামালুজ এবার সাইবেরীয় কুকুরটার গলায় কামড় বসিয়েছে। গিরিখাতের গা ঘেঁষে বরফের একটা উঁচু জায়গায় অবিশ্বাস্যভাবে আটকে গিয়ে স্লেজ-গাড়িটা অনিবার্য পতন থেকে বেঁচে গেছে!….
