বাঁ-হাতের কনুইটা সে ঠেলে দিল ভল্লুকীর গলার নীচে এবং তার মুষ্টিবদ্ধ দক্ষিণ হাত হাতুড়ির মতো পড়তে লাগল শ্বাপদের নাকে, মুখে, পাঁজরে।
ভালুকটা বিলিকে জড়িয়ে ধরেছিল, তার পিছনের দুই থাবা বিলির কুস্তির প্যাঁচে অকেজো হয়ে পড়েছিল বটে কিন্তু সামনের থাবা দুটোর ধারালো নখগুলি শত্রুর কাঁধের উপর এঁকে দিল অনেকগুলো রক্তাক্ত ক্ষতচিহ্ন।
ভল্লুকী গর্জন করছিল। বিলিও নীরব ছিল না, পৃথিবীর বিভিন্ন ভাষায় যে-কয়টা গালাগালি তার জানা ছিল সবকটাই সে প্রয়োগ করছিল উচ্চকণ্ঠে!
এই অদ্ভুত কাণ্ড দেখে জেমস হঠাৎ হো হো শব্দে হেসে উঠলেন। হাসির আওয়াজটা বিলির কানে গিয়েছিল, সে ভল্লুকীর সঙ্গে লড়তে লড়তেই জেমসের উদ্দেশে যেসব শব্দ উচ্চারণ করতে লাগল সেগুলো কোনো ভদ্রলোকের পক্ষেই সম্মানজনক নয়।
জেমসের হাসি বন্ধ হয়ে গেল, তিনি অবস্থার গুরুত্ব সম্বন্ধে সচেতন হয়ে গেলেন। ভল্লকীর কবলে যেকোনো মুহূর্তে বিলির প্রাণ যেতে পারে, এই অবস্থায় তাঁর হেসে ওঠা উচিত হয়নি।
বন্দুক হাতে নিয়ে মাচার উপর থেকে মাটিতে নেমে এলেন জেমস। ভল্লুকীর পিঠের উপর যে-বাচ্চাটা ছিল সে অবশ্য অনেক আগেই সরে পড়েছে।
ততক্ষণে শিকারিরা সকলেই যার যার মাচা থেকে নেমে ছুটে এসেছেন, বনতাড়ুয়াদের মধ্যেও অধিকাংশ লোক এসে উপস্থিত হয়েছে অকুস্থলে।
শিকারিদের হাতে বন্দুক তো ছিলই, বনতাড়ুয়ারাও নিতান্ত নিরস্ত্র ছিল না তাদের হাতেও ছিল লাঠিসোঁটা। কিন্তু বিল এবং ভল্লুকী পরস্পরকে জড়িয়ে ধরে যেভাবে মাটির উপর গড়াগড়ি দিচ্ছিল তাতে বন্দুক তো দূরের কথা, লাঠি পর্যন্ত ব্যবহার করা সম্ভব ছিল না। কারণ আঘাত ভল্লুকীর গায়ে না-লেগে বিলির গায়েও লাগতে পারে।
সকলে নিরুপায় হয়ে দেখতে লাগলেন, দ্বিপদ ও শ্বাপদ আলিঙ্গনে-আবদ্ধ অবস্থায় গড়াতে গড়াতে এগিয়ে চলেছে যেদিকে, সেখানে হাঁ করে রয়েছে একটা গভীর নালা বা খাত। সমবেত শিকারির দল চিৎকার করে বিলকে এই নূতন বিপদ সম্বন্ধে হুঁশিয়ার করে দিলেন, কিন্তু কোনো কাজ হল না। দুই প্রতিদ্বন্দ্বী গড়াতে গড়াতে এসে পড়ল খাতের কিনারে, পরক্ষণেই মৃত্যু-আলিঙ্গনে আবদ্ধ শ্বাপদ ও দ্বিপদের দেহ দুটি অদৃশ্য হয়ে গেল অন্ধকার খাদের মধ্যে!
এই আকস্মিক দুর্ঘটনায় সকলেই প্রথমে স্তম্ভিত হয়ে পড়লেন। একটু পরে সংবিৎ ফিরতেই শিকারিরা খাতের ভিতর নেমে বিলের চূর্ণবিচূর্ণ দেহটাকে উদ্ধার করতে সচেষ্ট হলেন।
কাজটা অবশ্য সহজ ছিল না। উঁচু-নীচু পাথুরে জমি, ছোটো বড়ো পাথর ও শিকড়বাকড় লতাপাতার প্রায়-দুর্ভেদ্য বেষ্টনীর ভিতর দিয়ে নামতে গেলে প্রতিমুহূর্তে পা ফসকে পড়ে গিয়ে প্রাণহানির আশঙ্কা আছে। তবু ওর মধ্যেই জেমস হরিণদের পায়ে-চলা একটা পথ আবিষ্কার করে ফেললেন। অতিকষ্টে প্রাণ হাতে নিয়ে শিকারিরা নীচে নেমে গেলেন এবং অস্পষ্ট অন্ধকার-মাখা জঙ্গলের মধ্যে বিলির খোঁজ করতে লাগলেন।
হ্যাঁ, বিলিকে পাওয়া গিয়েছিল। একটা মস্ত বড়ো পাথরের পাশে ভল্লুকীর মৃতদেহের উপর উপবিষ্ট অবস্থায় যে ক্ষতবিক্ষত মানুষটি শিকারিদের অভ্যর্থনা জানাল, সে হচ্ছে স্বয়ং বিলি প্যারট!
শিকারিরা বিলিকে জীবিত অবস্থায় দেখবেন আশা করেননি, কারণ অত উঁচু থেকে পড়লে কোনো জীবের পক্ষেই বেঁচে থাকা প্রায় অসম্ভব।
এই অসম্ভব কী করে সম্ভব হল জানাতে গিয়ে বিলি যা বলল তার সারমর্ম হচ্ছে এই যে, ভল্লুকীই প্রথমে মাটির ওপর আছড়ে পড়ে এবং বিলি পড়েছিল তার দেহের ওপর। ভল্লুকীর অস্থিপঞ্জর একেবারে চূর্ণ হয়ে গিয়েছিল, কিন্তু তার শরীরের উপর পড়ার দরুন বিলি তেমন জখম হয়নি।
অবশ্য তার কাঁধের ওপর সুগভীর রক্তরেখায় বিরাজ করছে ভল্লুকীর নখরচিহ্ন এবং পতনজনিত আঘাতের ফলে দেহের বিভিন্ন স্থানে, বিশেষ করে জানুর কাছে একটা গভীর ক্ষত অনর্গল রক্ত-উদগিরণ করছে বটে, কিন্তু বিলির মতো বলিষ্ঠ মানুষের পক্ষে ওই আঘাতগুলো মারাত্মক নয়।
বিলিকে বহন করে নিয়ে যাওয়া হল শিকারিদের তাঁবুতে। উপযুক্ত চিকিৎসার গুণে বিলি খুব শীঘ্রই আরোগ্য লাভ করেছিল।
[শ্রাবণ ১৩৭৯]
নরকের প্রহরী
সপাং!
সিন্ধুঘোটকের চামড়ার ভারী চাবুক সশব্দে নামল বিশাল কুকুরটার পিঠে–একগোছা লোম কেটে উড়িয়ে মাংসের মধ্যে চেপে বসল চাবুক, কুকুরটা বসে পড়ল বরফের উপর, তার পেটের মাংসপেশি তখন থর থর করে কাঁপছে!
আবার! আবার! বার বার আছড়ে পড়ল চাবুক। কুকুরটার দুই কান চেপটা হয়ে মিশে গেল মাথার খুলির সঙ্গে, তুষার ভেদ করে তলার শ্যাওলার উপর চেপে বসল পায়ের নখগুলো–আক্রমণের সংকেত?…
সপাং!
আবার পড়ল চাবুক; সঙ্গেসঙ্গে কুকুরটা ঝাঁপিয়ে পড়ল চাবুকধারী রেড ইন্ডিয়ানটির উপর। একটা হিংস্র চাপা গর্জন–পরক্ষণেই ছুরির মতো ধারালো দাঁতগুলো ছিঁড়ে ফেলল নরম মাংসের আবরণ, চাবুকের আস্ফালন হল স্তব্ধ। চাবুকধারী তার হাতের চাবুক ফেলে দুই হাতে গলার ক্ষতস্থান চেপে ধরে বসে পড়ল, বিদীর্ণ কণ্ঠের রক্তধারায় লাল হয়ে গেল হাতের দস্তানা।
আহত রেড ইন্ডিয়ান পেশায় ছিল স্লেজ-গাড়ির চালক। অবাধ্য কুকুরকে যেভাবে পেশাদার, চালকেরা শায়েস্তা করে, সেইভাবেই লোকটি বশ করতে চেয়েছিল বিশাল জন্তুটাকে। কিন্তু কুকুরটা চাবুকের শাসন মানল না, বিদ্রোহ করল এবং তার ফলেই রক্তাক্ত দুর্ঘটনার সূত্রপাত।
