শিকারিদের নির্দেশ অনুযায়ী এইবার পশ্চিম দিক থেকে বিট আরম্ভ করার জন্য বনতাড়ুয়ার দল জঙ্গলের ভিতর ছড়িয়ে পড়ল। প্রত্যেকেই অধীর আগ্রহে অপেক্ষা করতে লাগলেন। পুব দিকের জঙ্গলে তাড়া দিয়ে কোনো ফল হয়নি, কিন্তু এবার ভিন্ন দিক থেকে জঙ্গল পিটিয়ে বিট শুরু করলে হয়তো দু-একটা ভালুকের দেখা মিলতেও পারে।
নিঃশব্দ অরণ্য। বনতাড়ুয়ারা তখনও বিট অর্থাৎ জঙ্গল ঠেঙিয়ে জানোয়ার তাড়াতে শুরু করেনি। শিকারিদের মধ্যে সঞ্চারিত হয়েছে তীব্র উত্তেজনা।
আতম্বিতে জেমস এবং তার পরবর্তী সঙ্গীর মধ্যস্থলে অবস্থিত একটা ঝোপের ভিতর জাগল এক শব্দের তরঙ্গ–মট মট করে শুকনো গাছের ডাল ভাঙতে ভাঙতে কে যেন এগিয়ে আসছে।
শব্দ লক্ষ করে দুই শিকারিই রাইফেল তুলে ধরলেন, কিন্তু যে-জীবটি তাদের সামনে আত্মপ্রকাশ করল তাকে দেখে দুই বন্ধুই হয়ে গেলেন হতভম্ব!
বাঘ নয়, ভালুক নয় তাদের সামনে দাঁড়িয়ে আছে বিলি প্যারট!
একগাল হেসে বিলি জেমস সাহেবকে যা বলল তার সারমর্ম হচ্ছে, সে অত্যন্ত তৃষ্ণার্ত এবং যেহেতু তার জলের বোতলে একটুও জল নেই, তাই বাধ্য হয়েই সে এখানে এসেছে তৃষ্ণা নিবারণ করতে–কারণ তাদের কাছে যে জলের বোতল আছে সে-কথা তার অজানা নয়।
জেমসের কাছে জলের বোতল ছিল না, জল ছিল তার বন্ধুর কাছে। কিন্তু শুধু একটু জলের জন্য বিল বিট-এর সময় মাটিতে নেমে এতদূর হেঁটে এসেছে শুনে তিনি ভীষণ অসন্তুষ্ট হলেন। জেমসের বক্তব্য হচ্ছে, কিছুক্ষণ জলপান না-করলে একটা মানুষ মরে যায় না, কিন্তু বিট-এর সময় হঠাৎ ভালুক বেরিয়ে পড়লে যে বিলের জীবন বিপন্ন হতে পারে এ-কথা কি তার জানা নেই?
বিল বলল, সে জলের জন্য এসেছে, জলপান না-করে সে এখান থেকে এক পাও নড়তে রাজি নয়।
জেমস সবিস্ময়ে লক্ষ করলেন বিল সম্পূর্ণ নিরস্ত্র অবস্থায় এসেছে, মাচার ওপর থেকে তার রাইফেলটাও সে সঙ্গে আনার প্রয়োজন মনে করেনি।
জেমসের বন্ধু অন্য গাছ থেকে দুই বন্ধুর কথা কাটাকাটি শুনছিলেন, তাড়াতাড়ি আপদ-বিদায় করার জন্য তিনি মাচা থেকে একটা নীচু ডালে নেমে এসে বিলকে ডেকে তার হাতে জলের বোতলটা সমর্পণ করলেন।
বোতলটা হাত বাড়িয়ে টেনে নিয়েই বিলি ঢক ঢক করে জলপান করতে শুরু করল। বিলিকে জলপান করতে দেখে জেমস সাহেবের মনে হল তার গলাটাও অসম্ভব শুকিয়ে এসেছে, একটু জল খেলে মন্দ হয় না। রাইফেল, ছোরা প্রভৃতি মাচার ওপর রেখে তিনি নীচে নেমে এলেন শুকনো গলাটাকে ভিজিয়ে নেবার জন্য।
ততক্ষণে বিলির তৃষ্ণা মিটে গেছে, সে পূর্বোক্ত শিকারির মাচার নীচে দাঁড়িয়ে জলের বোতলটা এগিয়ে দিয়েছে এবং শিকারিও মাচার উপর শুয়ে পড়ে হাত বাড়িয়ে দিয়ে বোতলটা হস্তগত করার চেষ্টা করছেন। অকস্মাৎ বাঁ-দিকের একটা মাচার উপর থেকে ভেসে এল বিচারক মহোদয়ের উচ্চ কণ্ঠস্বর–সাবধান! ভালুক! ভালুক!
জেমস তৎক্ষণাৎ তার মাচা-বাঁধা গাছটার দিকে দৌড় মারলেন। যে শিকারিটি বিলির হাত থেকে জলের বোতল নেবার জন্য মাচার উপর শুয়ে পড়ে হাত বাড়িয়েছিলেন তিনি তড়াক করে উঠে বসে হাত বাড়ালেন রাইফেলের দিকে। বিল জলের বোতল ফেলে দিয়ে বলে উঠল, সর্বনাশ করেছে!
পাঁচ সেকেন্ডের মধ্যেই ঝোপজঙ্গল ভেদ করে সগর্জনে আত্মপ্রকাশ করল একটা মস্ত বড়ো ভল্লুকী।
জন্তুটার পিঠের উপর একটা বাচ্চা প্রাণপণে মাকে জড়িয়ে ধরে বসে আছে।
ঠিক সেই মুহূর্তে জেমস আবিষ্কার করলেন, তার হাতের রিভলভারটা তিনি মাচার উপরে ফেলে এসেছেন। চটপট কোমর থেকে রিভলভার টেনে নিয়ে তিনি ভল্লুকীকে লক্ষ করে গুলি চালালেন।
ভল্লুকী শিকারিদের আক্রমণ করত কি না বলা যায় না, হয়তো সে পাশ কাটিয়ে পালিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করতো, কিন্তু গুলিটা তার চোয়ালে লাগতেই জন্তুটা ভীষণ গর্জন করে বিলির দিকে তেড়ে এল।
যে-শিকারিটি বিলিকে জল দিয়েছিলেন, তিনি তাড়াতাড়ি মাচার উপর শুয়ে পড়ে বিলির উদ্দেশে হাত বাড়িয়ে দিলেন। কোনোরকমে হাতটা ধরে ফেলতে পারলে বিলি নিশ্চয়ই গাছের উপর উঠে ভালুকের আক্রমণ থেকে আত্মরক্ষা করতে পারত, কিন্তু বার বার চেষ্টা করা সত্ত্বেও খর্বকায় বিলের পক্ষে বন্ধুর হাতটাকে হস্তগত করা সম্ভব হল না। ভল্লুকী যখন প্রায় তার দেহের উপর এসে পড়েছে। তখন আর হাত ধরে গাছে ওঠার বৃথা চেষ্টা না-করে বিলি প্রাণপণে ছুটতে শুরু করল।
বিলির দুর্ভাগ্য, আচমকা একটা শুকনো গাছের ডালে পা আটকে সে ছিটকে পড়ল মাটির উপর এবং পরক্ষণেই তার উপর ঝাঁপিয়ে পড়ল আহত ভল্লুকী।
জেমসের নিক্ষিপ্ত রিভলভারের গুলি জন্তুটার নীচের চোয়াল ভেঙে দিয়েছিল, তাই তার দংশন করার ক্ষমতা ছিল না। কিন্তু কামড়াতে না-পারলেও ভল্লুকী তার ধারালো নখের সাহায্যে বিলকে ছিঁড়ে ফেলার চেষ্টা করতে লাগল।
অন্য মানুষ হলে নিশ্চয়ই ভল্লুকীর নখে ছিন্নভিন্ন হয়ে ইহলীলা সংবরণ করত, কিন্তু বিলি প্যারট ছিল পাকা কুস্তিগির এবং তার দেহেও ছিল অসাধারণ শক্তি এত সহজে সে পরাজয় স্বীকার করল না।
এমন অদ্ভুত কায়দায় সে পা দিয়ে ভল্লুকীর কোমর জড়িয়ে ধরল যে জন্তুটার পিছনের থাবা দুটো হয়ে গেল অকেজো, ওই দুটো থাবা দিয়ে জন্তুটা তার শত্রুর দেহে আঁচড় বসাতে পারল না।
