জ্যাক এবার ভয় পায়। তার গুলি ফুরিয়ে এসেছে। হাঁস-মুরগির আস্তানাও প্রায় শূন্য। কয়েকটা বড়ো হাঁস শক্তিশালী ডানা আর ধারালো ঠোঁটের সাহায্যে আত্মরক্ষা করছে বটে, কিন্তু তারাও বেশি দিন টিকতে পারবে কি?
জ্যাক ভাবতে থাকে, জন্তুগুলো যদি তাকে দল বেঁধে আক্রমণ করে, তা হলে সে কি করে আত্মরক্ষা করবে? বিড়ালগুলো এখন একেবারেই বন্য প্রাণীতে পরিণত হয়েছে। তাদের পক্ষে সব কিছুই সম্ভব।
রাত্রিবেলা জ্যাক আর ঘরের বাইরে যায় না।
অন্ধকারের মধ্যে মার্জারকছে ক্রুদ্ধ গর্জন কানে আসে… জ্যাক বোঝে, যোদ্ধারা এখন দাঁত আর নখের বোঝাঁপড়া করছে… যুদ্ধের আওয়াজ একদিকে মিলিয়ে যায়, অন্যদিক থেকে আবার নতুন আর একদল যোদ্ধা সগর্জনে সাড়া দেয়… উৎকট, হিংস্র মাজার কণ্ঠের সেই গর্জনধ্বনি চলে সারা রাত ধরে… ঘরের মধ্যে বিনিদ্র চোখে চেয়ে থাকে জ্যাক লেতাৰ্ক… এমনকি
জানালা-দরজাও সে রাত্রে খুলতে সাহস পায় না…।
হঠাৎ এক রাত্রে জ্যাক চমকে উঠল- মাথার উপর কুঁড়ে ঘরের চালের উপর বেজে উঠেছে তীক্ষ্ণ নখরে ঘর্ষণধ্বনি! ঘরের ভিতর মাছ রান্না করছে জ্যাক। সেই মাছের গন্ধে অস্থির হয়ে কয়েকটা বিড়াল ঘরের চালে উঠে আঁচড় কাটছে পাগলের মতো!
চাল ফাঁক করে বিড়ালগুলো ভিতরে আসতে চায়! মানুষের অস্তিত্ব তারা গ্রাহ্য করতে রাজি নয়…
বিড়ালদের উদ্দেশ্য অবশ্য সফল হয়নি।
কিন্তু এই ঘটনায় জ্যাকের মনোবল ভেঙে গেল। যথাসম্ভব তাড়াতাড়ি সাজ-সরঞ্জাম গুটিয়ে সে এক দিন নৌকোয় চড়ে পাড়ি জমাল তাহিতির রাজধানীর দিকে-~
জীবনে আর কোনো দিন জ্যাক ওই দ্বীপে ফিরে যায়নি, যার নাম সে রেখেছিল লেতার্কের দ্বীপ।
দ্বৈরথ
বিলি প্যারট ছিল ইংলন্ডের মানুষ। কোনো কাজই তার বেশিদিন ভালো লাগত না, কিন্তু একটি বিষয়ে তার অনুরাগ ছিল অত্যন্ত প্রবল। সেটি হচ্ছে মল্লযুদ্ধ!
দেখতে ছোটোখাটো হলেও বিলি ছিল অসাধারণ শক্তির অধিকারী। তার পরিচিত ইংরেজ ও ভারতীয় সঙ্গীসাথির দল তার নামকরণ করেছিল লৌহমানব।
নামটা যে নিতান্ত মিথ্যার উপর ভিত্তি করে দেওয়া হয়নি বর্তমান কাহিনির শেষ অংশেই তার প্রমাণ পাওয়া যাবে।
পেশায় সে ছিল কামার, কিন্তু বিলি প্যারট করেনি এমন কাজ ছিল না ভূভারতে!
প্রথমে সে নাবিক হয়ে পৃথিবীর বিভিন্ন স্থানে জলপথে ভ্রমণ করল। তারপর হঠাৎ একদিন নাবিকের কাজে ইস্তফা দিয়ে সে চাকুরি গ্রহণ করল কলকাতার টাকশালে। মাইনে হল প্রায় পঞ্চাশ টাকার মতো। আমি যখনকার কথা বলছি ভারতবর্ষ তখন স্বাধীন হয়নি, তাই ইংলন্ডের মানুষ বিলি প্যারটের পক্ষে ব্রিটিশ-অধিকৃত ভারতে ট্যাকশালের কাজটা জোগাড় করতে বিশেষ অসুবিধা হয়নি। কিছুদিন পরে এই কাজটাও তার ভালো লাগল না। হেনরি নামক জনৈক ইংরেজ তার যন্ত্রপাতি বহন করার জন্য একটি উপযুক্ত লোকের সন্ধান করছিল–দৈবাৎ তার যোগাযোগ হয়ে গেল বিলির সঙ্গে। মাসিক এক-শো পঞ্চাশ টাকা বেতন এবং ভবিষ্যতে উন্নতিলাভের প্রলোভন দেখাতেই হেনরির কাছে চাকরি করতে সম্মত হল বিলি।
ভারতের বিভিন্ন স্থানে ঘুরতে ঘুরতে দুজনেই এসে উপস্থিত হল পূর্ণিয়ার অন্তর্গত তিরহাট নামক স্থানে।
ওই সময় পূর্ণিয়া ও ভাগলপুরের অরণ্যময় অঞ্চলে শিকার করতে এসেছিলেন বিখ্যাত শিকারি জেমস ইংলিস। বিলির সঙ্গে তার পরিচয় হয়েছিল অনেক আগেই। মল্লযুদ্ধে তার দক্ষতা ও অসাধারণ দৈহিক শক্তির পরিচয় পেয়ে তিনি বিস্মিত ও মুগ্ধ হয়ে গিয়েছিলেন। মধ্যে কয়েক বৎসর তাঁর সঙ্গে বিলির দেখাসাক্ষাৎ হয়নি। হঠাৎ সাহেবগঞ্জ মহকুমার এক ডাকবাংলোতে জেমস সাহেব যাকে দেখে চমকে উঠলেন সেই মানুষটি হল স্বয়ং বিলি প্যারট!
বিলির তখন দারুণ দুরবস্থা। ধারদেনায় তার মাথার চুল পর্যন্ত বিকিয়ে গেছে; খুব সম্ভব হেনরির চাকরিটাও সে ছেড়ে দিয়েছিল। ছোটোখাটো এই মানুষটিকে শিকারি জেমস খুবই ভালোবাসতেন। বিলির দুরবস্থা দেখে তাকে নিয়ে তিনি স্বস্থানে চলে এলেন। ওই সময়ে স্থানীয় পুলিশ-সুপারিনটেন্ডেন্ট ভালুক শিকারের জন্য জেমস সাহেবকে নিমন্ত্রণ করেছিলেন। জেমসের সঙ্গে ওই শিকার-অভিযানে সানন্দে অংশগ্রহণ করল বিলি প্যারট।
জেমস আর বিলি ছাড়া আর যেসব শিকারি পূর্বোক্ত শিকার-অভিযানে যোগ দিয়েছিলেন, তারা হলেন কলকাতার দুই ব্যারিস্টার, পিলার নামক জেমসের এক বন্ধু এবং স্থানীয় জেলার এক বিচারক। দলের মধ্যে একমাত্র জেমস সাহেবকেই প্রকৃত অর্থে শিকারি বলা চলে, অন্য সকলে ছিলেন শখের শিকারি–নিতান্তই শখ চরিতার্থ করতে তারা শিকারে প্রবৃত্ত হয়েছিলেন।
পূর্ণিয়া ও ভাগলপুরের নিকটবর্তী একটি অরণ্যে শিকারের আয়োজন করা হয়েছিল। জঙ্গলের মধ্যে শিকারিদের জন্য গাছে গাছে মাচা বাঁধা হল, মাচাগুলির পরস্পরের মধ্যবর্তী দূরত্ব ছিল প্রায় পঞ্চাশ ফিট। এক একজন শিকারির জন্য নির্দিষ্ট ছিল এক একটি মাচা, কোনো মাচাতেই একাধিক মানুষ স্থান গ্রহণ করেনি। মাচার সারির একপ্রান্তে ছিল বিলি এবং অপর প্রান্তে অবস্থিত শেষ দুটি মাচায় আশ্রয় নিয়েছিলেন যথাক্রমে জেমস ইংলিশ এবং তার বন্ধু পূর্বোক্ত পুলিশ অফিসার।
একটু পরে বিট আরম্ভ হল। বিটার অর্থাৎ বনতাড়ুয়ার দল বিকট শব্দে চেঁচাতে চেঁচাতে জানোয়ার তাড়াতে শুরু করল। প্রথমেই শিকারিদের দৃষ্টিপথে ধরা দিল অসংখ্য পাখি–তারপর শেয়াল, খরগোশ প্রভৃতি ছোটো ছোটো অনেক জানোয়ার শিকারিদের চোখের সামনেই ছুটে পালাতে লাগল। ওইসব ছোটোখাটো জন্তুগুলিকে নিয়ে কেউ মাথা ঘামাল না, শিকারিরা চাইছেন বড়ো শিকার। ওই জঙ্গলের ভিতর ছোটো ছোটো গুহার মধ্যে ভালুকের অস্তিত্ব আছে শুনেই শিকারিরা উৎসাহিত হয়ে উঠেছিলেন, কিন্তু ভালুক যদি না দেখা দেয় তবে ভালুকের পরিবর্তে অন্য বড়ো জানোয়ার মারতেও তাদের আপত্তি ছিল না। শিকারিদের দুধের তৃষ্ণা ঘোল দিয়েই মেটাতে হল–দুটি হরিণ গুলি খেয়ে মারা পড়ল বটে, কিন্তু শিকারিদের সম্মুখে কোনো ভালুকই আত্মপ্রকাশ করতে রাজি হল না।
