লোকজনের সঙ্গ জ্যাকের দরকার নেই। তার দিন কাটে মহা-আনন্দে।
তার হাতে অখণ্ড অবসর, এ কথা মনে করলে ভুল হবে। সারদিন সে কঠিন পরিশ্রম করে। নানা রকম উদ্ভিদ, ফলমূল আর শাক-সবজির চাষ করে সে। হাঁস-মুরগিগুলিকে দেখাশুনা করাও বেশ কষ্টসাধ্য ব্যাপার। ভীষণ কর্মব্যস্ততার মধ্যে দিয়েই জ্যাকের দিন কেটে যায়।
তবে এইভাবে সারা জীবন নিঃসঙ্গ জীবন-যাপনের পরিকল্পনা তার নেই। সে আশা করে, হাঁস-মুরগি, নারিকেলের শাঁস প্রভৃতি চালান দিয়ে সে কয়েক বছরের মধ্যেই বেশ ধনী হয়ে উঠবে, তারপর তাহিতি থেকে একটি স্থানীয় মেয়েকে বিয়ে করে এনে এই দ্বীপেই বাকি জীবনটা সুখে-স্বচ্ছেন্দে কাটিয়ে দেবে।
ভবিষ্যতের রঙিন স্বপ্নে বিভোর হয়ে জ্যাকের দিন কাটে…
হঠাৎ একদিন তার মনে হল, হাঁস-মুরগির সংখ্যা যেন কমে গেছে। ব্যাপারটা সে বুঝতে পারে না। তার পাখিগুলো বেশ সুস্থসবল, আজ পর্যন্ত একটি পাখিকেও সে মরতে দেখে নি। পাখির সংখ্যা গণনা করেনি সে কোনো দিনই। কিন্তু আজ চোখের আন্দাজ থেকেই তার ধারণা হল, হাঁস-মুরগিদের সংখ্যা কমে গেছে এবং যাচ্ছে।
খুব আশ্চর্য হয় জ্যাক। পাখিগুলোর উপর নজর রাখতে লাগল। কয়েক দিন পরেই সে দেখতে পেল, একটা মস্ত বিড়াল ঝোপের ভিতর থেকে বেরিয়ে এসে তারের জাল টপকে হাঁসের দলের মধ্যে ঝাঁপিয়ে পড়ল। জ্যাক বাধা দেওয়ার আগেই বিড়ালটা একটা হাঁসের বাচ্চা মুখে নিয়ে আবার তারের জাল পার হয়ে ঝোপের ভিতর মিলিয়ে গেল।
শুধু সেই দিনই নয়, জ্যাক নজর রেখে দেখল পরবর্তী কয়েক দিনের মধ্যেই প্রায় বারো-তেরোটা হাঁস ও মুরগির ছানা বিড়ালের আক্রমণে ইহলীলা সংবরণ করল। আক্রমণের কায়দা ওই একই রকম– তারের জাল টপকে জন্তুগুলো পাখিগুলিকে ধরে নিয়ে যায়। পাখিদের সংখ্যা কমে যাওয়ার রহস্য এইবার জ্যাকের কাছে পরিষ্কার হল।
বেচারা জ্যাক! মার্জার বাহিনীর কীর্তি দেখে তো মাথায় হাত দিয়ে বসে। একটু চিন্তা করতেই তার মনে হয়, শুধু তার পোষা পাখিগুলোকে দিয়েই দ্বীপের গোটা বিড়ালগোষ্ঠী নিশ্চয় ক্ষুন্নিবৃত্তি করে না। কারণ তাহলে এত দিনে পাখির বংশ নিঃশেষ হয়ে যেতে। আজ পর্যন্ত একটা ইঁদুরও তার চোখে পড়েনি, সুতরাং মার্জার বাহিনী নিশ্চয় ইঁদুরের বংশ উজাড় করে দিয়েছে। তবে এতগুলো বিড়াল কি খেয়ে বেঁচে আছে?
জ্যাক ঠিক করল, এইবার ভালো করে বিড়ালদের হালচাল লক্ষ করতে হবে।
সব কাজকর্ম ছেড়ে জ্যাক দ্বীপটাকে পর্যবেক্ষণ করতে শুরু করে। খুব ভোরবেলা এবং সন্ধ্যার সময়ে বেরিয়ে দেখলে, সমুদ্রের তীরে ছোটো ছোটো দলে ভাগ হয়ে বিড়ালগুলি বেড়াতে আসে। বালি খুঁড়ে ধরে শামুক, গুগলি, পাথর সরিয়ে টেনে আনে কাঁকড়া। কয়েকটা অতি উৎসাহী বিড়াল আবার জলে নেমে মাছ ধরছে।
হঠাৎ একদিন বিড়ালগুলোর হিংস্র স্বভাবের পরিচয় পেয়ে স্তম্ভিত হয়ে গেল জ্যাক।
বেলাভুমির কাছে অগভীর জলের ভিতর দিয়ে ঘুরে বেড়াচ্ছে একটা কচ্ছপ। হঠাৎ কয়েকটা বিড়াল একসঙ্গে তার উপর ঝাঁপিয়ে পড়ল এবং টানাটানি করতে করতে তাকে চিৎ করে ফেলল। কিছুক্ষণের মধ্যেই দাঁতে নখে ছিন্ন-ভিন্ন করে তারা খেয়ে ফেলল কচ্ছপটাকে। পড়ে রইল শুধু কচ্ছপের শক্ত খোলা!
জ্যাক মনে মনে বুঝল, তাহিতি দ্বীপের বিড়াল কেন বন্য প্রকৃতির সংস্পর্শে এসে ভয়ংকর হয়ে উঠেছে, ওদের সম্বন্ধে একটু সাবধান থাকা দরকার।
সে সঙ্গে বন্দুক আনেনি। আনার দরকারও মনে হয়নি। এইবার সে আগ্নেয়াস্ত্রের প্রয়োজন অনুভব করল। কিন্তু বন্দুক যখন নেই, তখন আর কি করা যাবে? বুনো লতা দিয়ে সে ফঁদ পাতল। কিন্তু দুঃখের বিষয়, ফাঁদে একটি বিড়ালও ধরা পড়ল না।
জ্যাক বিড়ালগুলোর আস্তানা আবিষ্কার করেছিল। আগুন আর ধোঁয়ার সাহায্যে সে। জন্তুগুলোকে জব্দ করারও চেষ্টা করেছিল। কিন্তু কোনো ফল হয়নি। বিড়ালগুলো আস্তানা ছেড়ে সাময়িকভাবে সরে পড়ল।
জ্যাক এবার তাহিতির রাজধানী থেকে বিষ এবং বন্দুক নিয়ে এল। বিষ মাখানো টোপ সাজিয়ে লাভ হল না। বিড়ালগুলো অসম্ভব ধূর্ত, তারা বিষাক্ত টোপ স্পর্শও করল না। জ্যাকের বন্দুকের গুলিতে অবশ্য কয়েকটা বিড়াল মারা পড়ল, কিন্তু পাখিগুলোর উপর মার্জার বাহিনীর আক্রমণ বন্ধ করা গেল না। বিড়ালকে লক্ষ্য করে গুলি ছুড়লে অনেক সময় পাখির উপর গুলি লাগার সম্ভাবনা থাকে– কয়েকটা পাখি এইভাবে নিক্ষিপ্ত গুলিতে মারাও পড়েছিল।
জ্যাক আবার যখন তাহিতিতে গেল, তখন তার সমস্যার কথা খুলে বলল গভর্নরকে। গভর্নর তাকে ডিনামাইটের সাহায্য নিতে বললেন। গভর্নরের পরামর্শ জ্যাকের মনঃপূত হল না। ডিনামাইট বিস্ফোরণ দ্বীপের গায়ে বহু গহ্বর ও গর্তের সৃষ্টি করবে এবং যে বিড়ালগুলো বেঁচে যাবে, তারা আবার ওই সব ফাটলে আশ্রয় নিয়ে বংশবৃদ্ধি করে যাবে নির্বিবাদে।
বিড়ালগুলো জ্যাককে এখন ভালোভাবে চিনে নিয়েছে। তারা বুঝেছে, এই লোকটাই হচ্ছে দ্বীপের মধ্যে তাদের একমাত্র শত্রু। জ্যাককে দেখলে তারা সরে যায় বটে, কিন্তু খুব বেশি দূরে পালায় না– অত্যন্ত অনিচ্ছার সঙ্গে কিছুটা পিছিয়ে যায় মাত্র। কয়েকটা জানোয়ার আবার পিঠটাকে ধনুকের মতো বেঁকিয়ে হিংস্রভাবে ফাঁস-ফাঁস করতে থাকে।
