হাঁ করে শুনছে জ্যাক। একটু থেমে গভর্নর আবার বললেন, ওখানে এখন মানুষ নেই, ইঁদুরেরাই বসবাস করছে। জাহাজের ইঁদুররা কেমন ছিল জানি না, তবে দ্বীপের উপর যে জগুলো ইঁদুরের উপনিবেশ স্থাপন করেছে, তাদের দৈহিক আয়তন যেমন সাতিশয় বৃহৎ, তাদের স্বভাবও তেমনি অত্যন্ত হিংস্র। এখন বোধহয় বুঝতে পারছ, কেন ওখানে মানুষ থাকে না? শোনো তোমার বয়স অল্প, সাহসও আছে মনে হয়। এমন চমৎকার জায়গাটা কী তুমি ইদরের ভয়ে ছেড়ে দেবে? ভেবে দেখ। স্থায়ীভাবে বাস করতে পারলে ওই দ্বীপের সম্পূর্ণ মালিকানার স্বত্ব ফরাসি সরকার তোমাকে দিয়ে দেবেন। তবে হ্যাঁ, মনে রাখবে- স্থায়ীভাবে বাস করতে হবে।
জ্যাক ভাবল। কয়েকদিন ধরেই ভাবল। গভর্নরের প্রস্তাবটা তার কাছে মনে হল চ্যালেঞ্জ। এই চ্যালেঞ্জ সে গ্রহণ করে নিল মনে মনে। দ্বীপের স্থানীয় অধিবাসীরা ইঁদুরের কাছে পরাজয় স্বীকার করতে পারে, কিন্তু সুসভ্য ফ্রান্সের এক তরুণ কী পিছিয়ে যাবে ইঁদুরের ভয়ে? কখনই নয়। যেমন করে তোক দ্বীপের উপর থেকে ইঁদুরদের তাড়াতে হবে।
কিন্তু জন্তুগুলোকে বিতাড়িত করার উপায়টা কী হতে পারে? বড়ো কঠিন সমস্যা। জ্যাক চিন্তা করতে থাকে…
তাহিতি দ্বীপের রাজধানী পাপেতি। ওই পাপেতির পথে পথে একদিন ঘুরে বেড়াচ্ছে জ্যাক। অন্যমনস্কভাবে হাঁটতে হাঁটতে যে অঞ্চলটায় সে এসে পড়ল, সেখানে বাস করে খুব দরিদ্ৰশ্রেণির মানুষ।
জ্যাক লক্ষ করল, এই অঞ্চলে বিড়ালের সংখ্যা খুব বেশি। তার মনে হল, প্রত্যেকটি বাড়িতেই বাস করে একাধিক মার্জার। যে দিকেই তাকায়, সেই দিকেই তার দৃষ্টিপথে ধরা দেয় শুধু বিড়াল আর বিড়াল আর বিড়াল।
জস্তুগুলোর চেহারা দেখে মনে হয়, তারা বেওয়ারিশ। খাওয়া-দাওয়ার ব্যাপারে গৃহস্থের সাহায্য তারা পায় না। নিজেরাই খেটে খায়!
অকস্মাৎ বিদ্যুৎ-চমকের মতো এক নতুন চিন্তাভোত ধাক্কা মারে জ্যাকের মস্তিষ্কের কোষে ইঁদুরের শত্রু বিড়াল!
সেই রাতে অনেকক্ষণ ধরে চিন্তা করল জ্যাক। পরের দিনই সে কিনে ফেলল একটা পালতোলা নৌকো।
স্থানীয় বাসিন্দা কয়েকটা কিশোর ছেলেকে ডেকে সে জানিয়ে দিল যে, তারা যদি তাকে বিড়াল এন দিতে পারে, তবে সে তাদের পুরস্কার দিতে রাজি আছে। পুরস্কারের মূল্য ধার্য হল প্রতিটি বিড়ালের জন্য এক সেনতিম (সেনতিম- স্থানীয় মুদ্রা)। তবে হ্যাঁ বিড়াল সে অনেকগুলো নিতে চায় বটে, তবে জন্তুগুলো খুব শান্তশিষ্ট হলে চলবে না, মারকুটে দাঙ্গাবাজ হাড়বজ্জাৎ বিড়ালই তার পছন্দ।
বাচ্চারা দারুণ আগ্রহের সঙ্গে জ্যাকের প্রস্তাব গ্রহণ করল। কয়েক দিনের মধ্যেই তাবৎ তাহিতি দ্বীপের সবচেয়ে পাজি আর ওঁচা বিড়ালগুলোকে পাকড়াও করে তারা জ্যাকের কাছে নিয়ে এল।
খুব চটপট হাত চালিয়ে অনেকগুলো খাঁচা তৈরি করে ফেলল জ্যাক। বিড়ালের সংখ্যাও কম নয়- একশো কিংবা তার চেয়েও কিছু বেশি জোগাড় হয়েছে। স্থানীয় একজন মাঝিকে ডেকে বিড়ালগুলিকে নিয়ে জ্যাক নৌকো ভাসিয়ে দিল। নির্দিষ্ট স্থানে পৌঁছে সে বন্দি বিড়ালদের ছেড়ে দিল বেলাভূমির উপর। খাঁচার ভিতর থেকে মুক্তি পেয়েই বিড়ালগুলো দ্রুতবেগে পা চালিয়ে দ্বীপের মধ্যে অদৃশ্য হয়ে গেল। জ্যাক আবার ফিরে এল তাহিতির রাজধানী পাপেতি শহরে।
বেশ কয়েক মাস পরে জ্যাক লোক আবার দ্বীপের উদ্দেশ্যে যাত্রা করল। সে আশা করেছিল এত দিনে বিড়াল বাহিনী নিশ্চয়ই ইঁদুরের সংখ্যা কমিয়ে দিয়েছে। কয়েক জন স্থানীয় অধিবাসীর সঙ্গে সে দ্বীপের উপর পদার্পণ করল। সকলেই একটু সতর্ক হঁদুরের আতঙ্ক তাদের মন থেকে মছে যায়নি। খুব সাবধানে তারা বেলাভূমির উপর দিয়ে হেঁটে দ্বীপের ভিতর প্রবেশ করল, কিন্তু একটা ইঁদুরও তাদের নজরে পড়ল না। মাঝে মাঝে দুই-একটা অত্যন্ত বদখৎ চেহারার বিড়াল অবশ্য তাদের দৃষ্টিগোচর হয়েছে, তবে জন্তুগুলি মানুষ দেখেই ঘন ঝোঁপঝাড়ের ভিতর সরে গেছে লোকচক্ষুর সামনে আসতে তারা রাজি নয়।
দ্বীপের পরিবেশ চমৎকার লাগে জ্যাকের কাছে। সে এবার জায়গাটাকে বসবাসের উপযোগী করার জন্যে সচেষ্ট হল। লোকজনের সাহায্যে কিছু দিনের মধ্যেই সে দ্বীপের চেহারা ফিরিয়ে দিল। তাহিতি দ্বীপের স্থাপত্য-শিল্পের অনুকরণে এই দ্বীপের উপর আত্মপ্রকাশ করল একটি সুন্দর কুঁড়েঘর।
হাঁস-মুরগি নিয়ে এসেছিল জ্যাক নৌকো করে। এবার সেগুলিকে জাল দিয়ে ঘেরা জায়গার মধ্যে ছেড়ে দেওয়া হল। জঙ্গল পরিষ্কার করে তৈরি হল নারিকেল কুঞ্জ।
পাপেতি শহরে গিয়ে জ্যাক তার সাফল্যের বিশদ বিবরণী দিল সরকারের কাছে। প্রমাণ-পত্রও পেশ করল। পূর্ব-পরিচিত গভর্নর তাকে অভিনন্দন জানালেন এবং প্রতিশ্রুতি অনুযায়ী মালিক বলে স্বীকৃতি দিতেও ভুললেন না। ফরাসি সরকার তাকে স্বীকার করার পর সত্যি সত্যি কাগজে-কলমে দ্বীপের মালিক হল জ্যাক লেতার্ক।
আহ্লাদে আটখানা হয়ে জ্যাক দ্বীপের নতুন নামকরণ করল ‘লেতার্কের দ্বীপ’।
তারপর আবার সে ফিরে এল তার দ্বীপে। এবার তার সঙ্গে কেউ নেই। সঙ্গীসাথী না থাকলেও জ্যাক কিন্তু কখনই নিঃসঙ্গ বোধ করে না। গাছে গাছে অজস্র সুমিষ্ট ফল, সুপেয় ঝরনার জল, গৃহপালিত হাঁস-মুরগির ডিম এবং মাঝে মাঝে জিভের স্বাদ ফেরাবার জন্য সমুদ্রের মাছ, কঁকড়া ও কাছিম– আর কি চাই?
