অদৃশ্য অমঙ্গলের কায়াহীন আত্মা এই বড়োরাস্তার উপর আসতে পারে না, ওই গলিপথই হচ্ছে তার অধিকারভুক্ত এলাকা!
পিছন ফিরে সবেগে পা চালিয়ে দিলাম নিজের আস্তানার দিকে। এবার আর ভুল হল না। বাড়ি এসে দেখলাম কমল ও সুশীল দাবা খেলছে। সব কথা খুলে বলে আমি তাদের আমার সঙ্গে ওই বাড়িতে যেতে অনুরোধ করলাম। ভেবেছিলাম অ্যাডভেঞ্চার-এর আশায় দুজনেই আমার সঙ্গে ওই বাড়ির দিকে যেতে রাজি হবে, কিন্তু আশ্চর্য হয়ে দেখলাম তারা কেউ সেই, বাড়ির দিকে পা বাড়াতে রাজি নয়!
দুজনেরই অভিমত হচ্ছে, বিদেশে বেড়াতে এসে ভূতের কবলে পড়া মোটেই বুদ্ধিমানের কাজ হবে না। আমি জানালাম ওখানে কোনো ভূত আমার দৃষ্টিগোচর হয় নি এবং আমার সম্মুখে উপবিষ্ট দুই মূর্তিমান অদ্ভুতের চাইতে বড় কোনো ভূত সেখানে থাকতে পারে বলে মনে হয় না। ওরা কোনো কথা বলল না, চুপ করে দাবা খেলতে লাগল। আমি তখন ভীরু, কাপুরুষ প্রভৃতি বিশেষণে ভূষিত করে দুই বন্ধুর আত্মসম্মানবোধ জাগ্রত করার চেষ্টা করলাম। আশা ছিল, সুশীল রাজি না হলেও কুরুরাজ দুর্যোধনের আধুনিক প্রতিনিধির স্থান যে-মানুষটি অধিকার করেছিল অন্তত সেই কমল বিশ্বাস আমার ধিক্কার শুনে অপমান বোধ করে আমার সঙ্গে যেতে রাজি হবে। কিন্তু আশা সফল হল না, আমার দুর্বাক্যগুলি দুর্যোধনের একদা-প্রতিনিধি অবলীলাক্রমে হজম করলেন এবং দাবার চাল দিতে দিতে আমাকে লক্ষ করে যেসব উপদেশ বর্ষণ করলেন তার সারমর্ম হচ্ছে : কোনো বুদ্ধিমান মানুষই বিদেশে বেড়াতে এসে ভূতের সঙ্গে আলাপ করার আগ্রহ প্রকাশ করে না, অতএব আমার মতো নির্বোধের দুর্বাক্যে বিচলিত হয়ে সংকল্প ত্যাগ করার পাত্র যে কমল বিশ্বাস নন এই পরম সত্যটি উদঘাটন করে উক্ত নামধারী মানুষটি আবার দাবার চালে মনোনিবেশ করলেন।
আমি খুবই হতাশ হলাম। কিন্তু একা ওখানে যাওয়ার আমার সাহস ছিল না, তাই সেরাতে কৌতূহল দমন করে সুবোধ বালকের মতোই নৈশভোজন শেষ করে শয্যার বুকে আশ্রয় গ্রহণ করলাম।
পরের দিন খুব সকাল উঠে সেই বাড়িটার সন্ধানে বেরিয়ে পড়লাম। কিন্তু কী আশ্চর্য! কোথাও সেই বাড়ি অথবা পূর্বদৃষ্ট জলাশয়টির অস্তিত্ব আবিষ্কার করতে পারলাম না।
এই ঘটনার পর আরও সাত দিন আমরা মধুপুরে ছিলাম। ওই সাত দিনের মধ্যে প্রত্যেক দিনই আমি অনুসন্ধান করেছি, কিন্তু ওই বাড়ি আর জলাশয় আমার দৃষ্টিপথে একদিনও ধরা দিল না! খুবই আশ্চর্যের বিষয় সন্দেহ নেই।
এলাকাটা ছিল খুব ছোটো, আর অট্টালিকাগুলির মধ্যবর্তী পথগুলি কিছু অগুনতি নয়, কিন্তু সবগুলি গলিপথ ও পথের শেষে অবস্থিত প্রান্তরগুলির উপর তন্নতন্ন করে অনুসন্ধান চালিয়েও আমি ঈপ্সিত বস্তুর দর্শন পেলাম না।
যাদের কাছে এই ঘটনার বর্ণনা দিয়েছি তাদের মধ্যে অনেকেই বলে ওটা হচ্ছে ইলিউশন বা চোখের ভুল। আমার ধারণা অন্যরকম। আমার বিশ্বাস ওই বাড়ি আর জলাশয় দিনের আলোতে আমি খুঁজে পাইনি বটে, কিন্তু রাতের অন্ধকারে যদি অনুসন্ধান করতাম, তাহলে নিশ্চয়ই ওই বাড়ির সাক্ষাৎ লাভ করতাম। নিঃসঙ্গ অবস্থায় রাত্রিকালে ওই বাড়ির খোঁজ করার সাহস আমার হয়নি, তাই রহস্য আমার কাছে রহস্যই রয়ে গেল।
ইলিউশন বা চোখের ভুল প্রভৃতি বিজ্ঞানসম্মত ব্যাখ্যা আমার মনঃপূত নয়। আমি নেশাগ্রস্ত হইনি, সম্পূর্ণ সজ্ঞানে সুস্থ দেহে চাঁদের আলোতে অন্তত দশ মিনিট ধরে মরীচিকা দেখার মতো অসুস্থ মন বা চোখ আমার তখনও ছিল না, এখনও নেই।
[১৩৮৭]
দ্বীপ
বয়স হবে বছর কুড়ি, নাম জ্যাক লেতার্ক।
১৯৩৬ খ্রিস্টাব্দে সে যখন গৃহত্যাগ করে তখন তার বয়স মাত্র কুড়ি। এই বয়সেই সে জন্মভূমি ফ্রান্স ছেড়ে প্রশান্ত মহাসাগরের ফরাসি উপনিবেশ তাহিতি দ্বীপে পাড়ি জমিয়েছে এবং কয়েক দিনের মধ্যেই দ্বীপের ফরাসি গভর্নরের সঙ্গে বিলক্ষণ ভাব জমিয়ে ফেলেছে।
ফ্রান্সের এক কৃষক পরিবারে জন্মগ্রহণ করেছিল জ্যাক। তাহিতি দ্বীপে এসেও সে চাষ-আবাদ নিয়ে ভাবতে শুরু করে। এই বিষয়ে গভর্নরের সঙ্গেও তার কিছু কিছু আলাপ হয়েছে।
হঠাৎ একদিন গভর্নর জ্যাককে ডেকে বললেন, এখান থেকে প্রায় চল্লিশ মাইল দূরে একটা দ্বীপ আছে। দ্বীপটা চমৎকার। মাটি উর্বর, যে কোনো ফসল ফলানো যায়। দ্বীপে পানীয় জলের অভাব নেই, ঝরনা আছে। আরও আছে নানা রকম ফলের গাছ। দেখ বাপু- ওখানে গিয়ে যদি স্থায়ীভাবে বসবাস করতে রাজি থাক, তাহলে সরকারের তরফ থেকে ওই দ্বীপ তোমাকে উপহার দেওয়া হবে। এক পয়সাও খাজনা দিতে হবে না।
স্তম্ভিত বিস্ময়ে জ্যাক বলল, এমন চমৎকার জায়গাটা ফরাসি সরকার আমাকে বিনামূল্যে দিয়ে দেবেন কেন?
গভর্নর বললেন, ওখানে কেউ বাস করে না। কেউ যদি ওখানে গিয়ে স্থায়ীভাবে বাস করতে রাজি থাকে তবে ফরাসি সরকার তাকে বিনা-খাজনায় ওই দ্বীপের স্বত্ব ও সুখ-সুবিধা ভোগ করতে দেবেন। তবে দুঃখের বিষয়, এখন পর্যন্ত কেউ ওই দ্বীপের স্বত্ব ভোগ করার জন্য আগ্রহ প্রকাশ করেনি।
জ্যাক প্রশ্ন করল, কারণ কি? খুব সংক্ষেপে উত্তর এল, ইঁদুর!
ইঁদুর! গভর্নরের উত্তর শুনে জ্যাক হতভম্ব। এমন চমৎকার জায়গা ইঁদুরের জন্য পতিত রয়ে গেছে এ কথা কি বিশ্বাসযোগ্য?
হ্যাঁ, ইঁদুর। গভর্নর বলতে শুরু করেন, এই দ্বীপের বুকে ঘুরে বেড়ায় বড়ো বড়ো হিংস্র ইঁদুর। একটা জাহাজডুবি হয়েছিল দ্বীপের কাছে। জাহাজের ইঁদুরগুলি তখন সাঁতার কেটে এসে আশ্রয় নিয়েছিল ওই দ্বীপের উপর। কিছু দিনের মধ্যেই জন্তুগুলো বংশবৃদ্ধি করে ফেলে। ওই দ্বীপে তখন মানুষের বসবাস ছিল। কিছু কালের মধ্যেই দ্বীপবাসীরা ইঁদুরের অত্যাচারে অতিষ্ঠ হয়ে উঠল। হাঁস-মুরগি থেকে আরম্ভ করে ঘরবাড়ি দরজা-জানালা প্রভৃতি সচল-অচল যাবতীয় বস্তুর উপরেই ইঁদুররা দাঁতের ধার পরীক্ষা করতে শুরু করল। দ্বীপবাসীরা বুঝল, এ দ্বীপে মানুষ আর ইঁদুর পাশাপাশি বাস করতে পারবে না। অতএব ইঁদুর-বাহিনীর বিরুদ্ধে মানুষ করল যুদ্ধ। ঘোষণা! ফাঁদ, আগুন, বিষ প্রভৃতি সব রকম মহাস্ত্র প্রয়োগ করেছিল দ্বীপের বাসিন্দারা, কিন্তু ইঁদুররা কাবু হয়নি। অবশেষে মানুষগুলোই কাবু হয়ে পড়ল, দ্বীপ ছেড়ে তারা পলায়ন করল।
