জ্যোৎস্না-আলোকিত উন্মুক্ত প্রান্তরের উপর সেই জলাশয় এবং নীলাভ-কৃষ্ণ রাত্রির আকাশের পটভূমিতে দ্বিতল গৃহের একটিমাত্র ঘরের আলোক-উজ্জ্বল বাতায়ন আমাকে চুম্বকের মতো আকর্ষণ করল মন্ত্রমুগ্ধের মতো সেইদিকে এগিয়ে গেলাম নিজেরই অজ্ঞাতসারে!
আর তৎক্ষণাৎ আমার অন্তরের অন্তঃস্থল থেকে এক তীব্র অনুভূতি আমাকে সাবধান করে দিল। আমি বুঝলাম ওই বাড়িতে গেলে আর ফিরে আসতে পারব না!
একেই কি বলে ষষ্ঠ ইন্দ্রিয়?
জানি না। তবে এক অদম্য আকর্ষণে আমার পা দুটো যেন আমাকে বার বার ঠেলে দিতে। চাইছিল সেই বাড়ির দিকে। তবু জোর করে আত্মসংবরণ করলাম। কিন্তু স্থানত্যাগ করতে পারলাম না। পিছন ফিরতে গেলেই মনে হচ্ছিল আমি যেন এক পরম কামনার ধন ফেলে রেখে চলে যাচ্ছি, অদ্ভুত এক মানসিক যাতনাবোধ করছিলাম–মনে হচ্ছিল নিতান্ত প্রিয়জনকে যেন বিদায় দিচ্ছি আমার জীবন থেকে।
হঠাৎ মনে হল, এইখানে দাঁড়িয়ে না-থেকে তাড়াতাড়ি ফিরে গিয়ে যদি বন্ধুদের নিয়ে আসি তাহলে তো নির্ভয়ে ওই বাড়িটার কাছে যেতে পারি আর তিনজন একসঙ্গে থাকলে ভয়ের কোনো কারণ থাকবে না, অতএব পিছন ফিরে যে পথে এসেছি সেই পথেই আবার পদচালনা করতে উদ্যত হলাম।
আর ঠিক সেই মুহূর্তে ভয় পেলাম।
দারুণ আতঙ্কে আমার পা দুটি নিশ্চল হয়ে গেল!
না, কোনো ভয়ংকর দৃশ্য দেখিনি।
যে পথের উপর দিয়ে আমি মাঠে এসে পৌঁছেছিলাম, সেই পথের দু-ধারে অবস্থিত দুটি বিশাল অট্টালিকার জীর্ণ প্রাচীরের উপর দিয়ে দুই বাড়ির গাছপালা অজস্র ডালপালা হাত বাড়িয়ে পরস্পরকে আলিঙ্গন করছে, তার ফলে ঘন পত্রপল্লবশোভিত বৃক্ষশাখার নীচে পথটার উপর বিরাজ করছে এমন এক ঘনীভূত অন্ধকার যে চাঁদের আলো পর্যন্ত সেই উদ্ভিদের নিবিড় আবরণ ভেদ করে পথের উপর প্রবেশ-অধিকার পায়নি।
অন্ধকার-আবৃত সেই পথ এবং মাথার ওপর ঝাকড়া গাছপালার নিবিড় সমাবেশের দিকে তাকিয়ে এক দারুণ আতঙ্ক অনুভব করলাম। আমি বুঝলাম ওই পথের উপর দিয়ে হেঁটে যাওয়ার ক্ষমতা আমার নেই, আমার অনুভূতি আমাকে বলে দিচ্ছে ওই পথের উপর অবস্থান করছে এমন এক ভয়ংকর যার অস্তিত্ব আমি অনুভব করতে পাচ্ছি বটে, কিন্তু তাকে চোখে দেখতে পাচ্ছি না! পিছন ফিরে বাড়িটার দিকে চাইলাম। যাব নাকি? এগিয়ে যাব ওই বাড়ির দিকে? ওখানে আশ্রয় চাইব?
একটু এগিয়ে গেলাম। দারুণ আকর্ষণ বোধ করছি, মনে হচ্ছে ছুটে যাই ওই বাড়ির দিকে। কিন্তু তবু অবচেতন মনে অনুভব করলাম ওখানেই রয়েছে আমার মৃত্যু, যত মোহ যত আকর্ষণই বোধ করি না কেন, ওই বাড়ি হচ্ছে আমার মরণফাঁদ! কোনো যুক্তি নেই এমন চিন্তার, তবু বার বার মনে হতে লাগল মোহময় ওই মরণ-ভবনকে পিছনে ফেলে আমাকে এগিয়ে যেতে হবে ওই পথের দিকে ভয় দেখানো ভয়ংকরকে অগ্রাহ্য করে এগিয়ে যেতে পারলে ওই পথই হবে আমার প্রাণরক্ষার একমাত্র উপায়।
তবু সেদিকে পা বাড়াতে পারলাম না। যতবার পা বাড়াই ততবারই দারুণ আতঙ্কে পিছিয়ে আসি। হঠাৎ ভীষণ ক্রোধে আমার চৈতন্য যেন আচ্ছন্ন হয়ে গেল কেন? কেন যেতে পারব না ওই পথে? কোন অমঙ্গলের অদৃশ্য ছায়া প্রাণরক্ষার একমাত্র পথ থেকে সরিয়ে আমাকে ঠেলে দিতে চায় ওই মরণ-ভবনের দিকে?
দুই হাত মুষ্টিবদ্ধ করে আমি এগিয়ে যাই গলিপথ ধরে। একটু এগিয়ে যেতেই আবার ভয় পেলাম, দারুণ ভয়!
অপার্থিব সেই আতঙ্কের অনুভূতি ভাষায় প্রকাশ করা সম্ভব নয়। মনে হল আমার ঠিক পিছনেই এসে দাঁড়িয়েছে এক অশুভ জীব, যার অস্তিত্ব অনুভব করা যায়, কিন্তু যাকে চোখে দেখা যায় না! প্রতি মুহূর্তে মনে হতে লাগল এক দৌড়ে ওই পথটা পার হয়ে চলে যাই, কিন্তু নিজেকে সংবরণ করে স্বাভাবিকভাবেই হাঁটতে লাগলাম। জানতাম ছুটতে গিয়ে যদি হোঁচট খেয়ে পড়ে যাই তাহলে আর আমার উঠে দাঁড়ানোর ক্ষমতা থাকবে না এবং চলৎশক্তি রহিত হয়ে যদি ওইখানে পড়ে থাকি তাহলে যে জীবটির অস্তিত্ব আমি অনুভব করতে পাচ্ছি তার কবলেই যে আমাকে আত্মসমর্পণ করতে হবে সে-বিষয়ে সন্দেহ নেই.. আমি বলছি আর অনুভব করছি আমার ঠিক পিছনেই সতর্ক পদক্ষেপে এগিয়ে আসছে অমঙ্গলের অদৃশ্য ছায়া… অবশেষে আর আত্মসংবরণ করতে না-পেরে ঘুরে দাঁড়ালাম–নাঃ! কেউ নেই!
আচম্বিতে দারুণ আতঙ্ক আমার চেতনাকে গ্রাস করল। হিতাহিত জ্ঞানশূন্য হয়ে আমি তিরবেগে ছুটলাম গলিপথ ধরে বড়োরাস্তার দিকে।
না, পড়ে যাইনি; কয়েক মুহূর্তের মধ্যেই এসে পড়লাম বড়োরাস্তার ওপর আর ঠিক সেই মুহূর্তে নারীকণ্ঠের ঐকতান সংগীত প্রবেশ করল আমার শ্রবণ-ইন্দ্রিয়ে।
সাঁওতাল মেয়েরা দল বেঁধে গান গাইতে গাইতে এগিয়ে আসছে বড়ো রাস্তা ধরে!
আঃ! গান যে কত মধুর সেই মুহূর্তে অনুভব করলাম। জীবনে অনেক ভালো ভালো গায়কের গান শুনেছি, কিন্তু কয়েকটি অশিক্ষিত সাঁওতাল রমণীর কণ্ঠসংগীত সেই রাতে আমাকে যেমন আনন্দ দিয়েছিল তেমন আনন্দ কখনো গান শুনে পাইনি। নীরব মৃত্যুকে অগ্রাহ্য করে সেই সংগীত যেন জীবনের অস্তিত্ব ঘোষণা করল আমার সম্মুখে!
দুই বাড়ির মাঝখানে গাছপালার আচ্ছাদনের নীচে যে অন্ধকার-আচ্ছন্ন পথটা পার হয়ে এলাম সেইদিকে দৃষ্টিপাত করে আবার সেই অশুভ ও অদৃশ্য অমঙ্গলের অস্তিত্ব অনুভব করলাম। ওইসঙ্গে আমার অনুভূতিতে ধরা পড়ল আর এক সত্য :
