একটু থেমে, একটু চুপ করে থেকে কমলবাবু বললেন, তারপর থেকেই আমি যাত্রার দল ছেড়ে দিয়েছি।
প্রায় একটা বছর কেটে গেল। কমল বিশ্বাস কাজকর্ম ভালোই করে, ফকিও দেয় না। আমাদের মধ্যে তখন অপরিচিতের ব্যবধান ঘুচে গেছে, কমলের সাহচর্য হয়ে উঠেছে আমার কাছে দস্তুরমতো লোভনীয়।
একদিন কমল হঠাৎ বলল, ওহে মহীতোষ, চলো দিনকয়েক বাইরে থেকে ঘুরে আসি।
-কোথায়?
–মধুপুর। আমার এক বন্ধুর পরিচিত এক ভদ্রলোকের বাড়ি আছে ওখানে। বন্ধুটির নাম সুশীল, সে দিনকয়েকের জন্য হাওয়াবদল করে আসতে চায়। চলো, আমরাও ওইসঙ্গে ঘুরে আসি। বাড়িভাড়া তো লাগবে না, আর তুমি বললে মালিক ছুটি দিতে রাজি হবেন! কাজকর্ম বিশেষ নেই এখন, আর তোমার অনুরোধ মালিক ফেলতেও পারবেন না।
সত্যি কথা। আমার কাজকর্মে অফিসের মালিক আমার উপর খুবই সন্তুষ্ট ছিলেন। আমি ছিলাম তাঁর বিশেষ স্নেহের পাত্র।
পনেরো দিনের ছুটি মঞ্জুর করে নিয়ে কমল এবং তস্য বন্ধু সুশীলের সঙ্গে মধুপুর চলে গেলাম। সুশীলের পুরো নাম হচ্ছে সুশীল বন্দ্যোপাধ্যায়। ট্রেনের মধ্যেই বেশ আলাপ জমে গেল এবং আপনি ও বাবু প্রভৃতি অধিকন্তু বিসর্জন দিয়ে আমরা বেশ অন্তরঙ্গ হয়ে উঠলাম অতি অল্প সময়ের মধ্যেই।
মধুপুর গিয়ে নির্দিষ্ট বাড়িটা খুঁজে নিতে খুব বেগ পেতে হল না। পুরানো দোতলা বাড়ি, দেখাশুনা করে একটা মালি। সে আমাদের ঘরদোর খুলে সব ব্যবস্থা করে দিল। বাড়িটা বেশ বড়ো, পরিচর্যার অভাবে তার অবস্থা বেশ জীর্ণ। নীচের একটা ঘর পরিষ্কার করে আমরা আশ্রয় গ্রহণ করলাম।
স্টেশনের কাছাকাছি একটা হোটেলে আমরা সেদিন খেয়ে নিলাম। ঠিক করলাম, যে-কয়দিন আছি ওই হোটেলেই খাব, রান্নার হাঙ্গামা করব না। আমরা যে বাড়িটায় ছিলাম তার আশেপাশে সমস্ত জায়গাটার একটা বর্ণনা দেওয়া দরকার। তিরিশ-পঁয়ত্রিশ বৎসর আগেকার কথা, তখনকার ভৌগোলিক অবস্থার সঙ্গে বর্তমান মধুপুরের বিশেষ মিল থাকার কথা নয়। কারণ এই দীর্ঘ সময়ের ব্যবধান মধুপুরের চেহারায় অনেক পরিবর্তন এনেছে বলেই আমার বিশ্বাস।
স্টেশনের নিকটবর্তী এলাকা অর্থাৎ শহর অঞ্চলে ছাড়িয়ে চলে গেছে একটা সুদীর্ঘ পথ। ওই পথের দু-পাশে দাঁড়িয়ে আছে বহু অট্টালিকার ধ্বংসাবশেষ। বিরাট বিরাট সেই প্রাসাদোপম অট্টালিকাগুলির অবস্থা নিতান্তই জীর্ণ-শীর্ণ এবং সেই অতিবৃহৎ অট্টালিকাগুলির সম্মুখবর্তী উদ্যানের স্থান অধিকার করে আত্মপ্রকাশ করেছে ঘন ঝোপজঙ্গল, এমনকী কোনো কোনো বাড়ির ভিতর থেকে ইষ্টক-অবরোধ ভেদ করে মাথা তুলেছে বট ও অশ্বথ বৃক্ষ। ওই বৃহৎ অট্টালিকা-অরণ্য ছড়িয়ে রয়েছে বড়ো পথের দু-পাশে এবং তাদের মধ্যবর্তী গলিপথগুলি বিলুপ্ত হয়েছে সবুজ প্রান্তরের উপর। আমরা যে বাড়িতে আশ্রয় নিয়েছিলাম সেটা ছিল একটা মাঠের উপর এবং সেখানে যেতে হলে দুটি অট্টালিকার মধ্যবর্তী একটা গলিপথ অতিক্রম করতে হত।
স্টেশনের কাছে পূর্বোক্ত হোটেলে আমরা সকালে চা ও দুপুরে মধ্যাহ্নভোজন সেরে নিতাম। দুপুর বেলা হোটেল থেকে ফিরে এসে আমরা দাবা খেলতাম। দুপুর পর্যন্ত আমরা একসঙ্গে থাকতাম বটে কিন্তু বিকাল হতেই আমি সঙ্গীদের সাহচর্য ছেড়ে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়তাম। কমল ও সুশীল স্টেশনে গিয়ে পরিচিত মানুষের সন্ধান করত, আর আমি যেতাম ফাঁকা মাঠের দিকে মুক্ত প্রকৃতির সান্নিধ্য গ্রহণ করতে। কলকাতা শহর থেকে এখানে এসে স্টেশনের জনাকীর্ণ স্থানে আবার কলকাতার মতোই শহরের পরিবেশ উপভোগ করতে আমার ভালো লাগত না। অতএব বিকাল হলেই আমি হয়ে পড়তাম নিঃসঙ্গ, একক।
অনেক সময় কবরখানায় বেড়াতে গেছি। সন্ধ্যার অস্পষ্ট অন্ধকারে সেই জনহীন স্থানে দাঁড়িয়ে আমি যেন এক অন্য জগতের সাড়া পেতাম। ভাষার সাহায্যে সেই অদ্ভুত অনুভূতিকে প্রকাশ করার চেষ্টা করব না। সে ক্ষমতাও আমার নেই। তবে এইটুকু বলতে পারি গোরস্থানে আমি কোনোদিন ভয় পাইনি, তবে রোমাঞ্চ অনুভব করেছি বটে।
হ্যাঁ, ভয় পেয়েছিলাম
কিন্তু কবরখানায় নয়, কবরখানা থেকে ফেরার পথে।
তখন অন্ধকার হয়ে গেছে।
হাতে ঘড়ি ছিল না, মনে হয় রাত সাড়ে সাতটা কি আটটা হবে। শহরের বাইরে ওইসব জায়গায় একটু রাত হলেই মনে হয় গভীর রাত্রি। তবে রাত বাড়লেও আমার অস্বস্তির কারণ ছিল না, জ্যোৎস্নার কল্যাণে রাতের অন্ধকার আমার দৃষ্টিকে অন্ধ করে দিতে পারেনি, চাঁদের আলোতে সব কিছুই স্পষ্ট দেখতে পাচ্ছিলাম… দুটি বৃহৎ অট্টালিকার মধ্যবর্তী সরু পথ অবলম্বন করে এগিয়ে গেলাম, এখানেই সামনে পড়বে পরিচিত প্রান্তর এবং সেই প্রান্তর পথ অতিক্রম করলেই বাড়ি। অনেকটা পথ হেঁটে এসেছি, একটু বিশ্রাম নিয়ে তারপর হোটেলের দিকে যাত্রা করব উদরের ক্ষুধা শান্ত করার জন্য।
হঠাৎ চমকে থেমে গেলাম—
কোথায় এসেছি? ভুল হয়েছে, এ তো আমার পরিচিত পথ নয়!
বেশ কিছু দূরে মুক্ত প্রান্তরের ওপর অবস্থিত একটি জলাশয়ের অপর প্রান্তে যে বাড়িটি দাঁড়িয়ে আছে সেটিও দ্বিতল বটে কিন্তু আমাদের পরিচিত গৃহ নয়!
একটু নজর দিয়ে দেখলাম দোতলা বাড়ি হলেও সেই বাড়ির ছাদের উপর এককোণে একটা ছোটো ঘর দেখা যাচ্ছে চিলেকোঠা।
বাড়িটি অন্ধকার, কিন্তু চিলেকোঠার একটিমাত্র জানলায় আলোর আভাস!
