দুনিয়ার নানান দেশের গল্পগাথায় প্রচলিত আছে, মানুষের মাংস খেলে নাকি বিশেষ কিছু ক্ষমতা জন্মায়, বলল আয়ান। গতি, শক্তি, অমরত্বের কাছাকাছি দীর্ঘ জীবন। বছরের পর বছর যদি খান, একটা সময় পরিণত হবেন। মানুষরূপী জানোয়ারে। সব সময় ক্ষুধার্ত থাকবেন তখন।
সেরকম হলে তো বাঁচার কথা না ম্যাডির! আশঙ্কা ডেইজির।
তা-ও বলব, সম্ভাবনা আছে।
কীভাবে?
ওয়েনডিঙ্গোরা জানে, দীর্ঘ শীতে কীভাবে খাবার ছাড়া টিকে থাকা যায়। টানা কয়েক বছর হাইবারনেট করতে পারে ওরা। এ ক্ষেত্রে তেইশ বছর পর-পর জেগে উঠছে ওটা। …তো, সব শিকারকে মারে না ওরা, কাউকে কাউকে স্টোর করে রাখে জ্যান্ত… পরে যাতে খেতে পারে। জ্যান্ত খাবার ছাড়া অন্য কিছুতে রুচি নেই ওদের। আপনার ভাই যদি বেঁচে থাকেন, নিশ্চিত, ওঁকে অন্ধকার কোথাও লুকিয়ে রাখা হয়েছে। জায়গাটা খুঁজে বের করতে হবে আমাদের।
দশ
চারজনের দলটার নেতৃত্ব দিয়ে জঙ্গল ভেদ করে এগিয়ে চলেছে আয়ান, ওর বাঁ হাতে একটা মলোটভ ককটেল। বিয়ারের বোতলে কেরোসিন ভরে তৈরি করেছে ওটা। সলতে বানিয়েছে ক্যাম্পারদের কাপড় ছিঁড়ে। কেরোসিন-ভেজানো কাপড়টার কিছু অংশ বোতলের বাইরে রেখে শক্ত করে এঁটে দেয়া হয়েছে ছিপি। সহজ-কি-কার্যকর আগুনে-বোমা।
ধারাল নখের চিহ্নঅলা একাধিক গাছ পড়ছে পথে। মাটিতে, গাছের গায়ে রক্তের দাগ। এ ছাড়া ভাঙা ডাল পড়ে রয়েছে যত্রতত্র। নির্জলা ট্র্যাক, যাকে বলে।
অবশেষে ভেসে এল একটা গর্জন।
পাই করে ঘুরে গেল ওরা আওয়াজ লক্ষ্য করে। স্তব্ধ ক টা মুহূর্ত তাকিয়ে রইল। কিন্তু আর হলো না আওয়াজটা। আধা-মানুষ, আধা ওই জানোয়ারটারও চেহারা দেখতে হলো না।
এ গাছের পাতায় মর্মর তুলে বয়ে চলেছে বাতাস। কেমন একটা নোনতা গন্ধ পরিবেশে। স্বস্তি দেয় না একদম।– গর্জনটা শোনার পর এগোতে আর ভরসা পাচ্ছে না; যেখানটায় থেমেছিল, ইতস্তত ঘুরে বেড়াচ্ছে ওরা আশপাশে। একটা গাছের গায়ে হেলান দিতেই উপর থেকে কয়েক ফোঁটা রক্ত পড়ল ডেইজির শার্টে। জান্তব ভয়ে সরে এল ও ব্যাপারটা টের পেয়ে। সঙ্গে সঙ্গে ধপাস করে নিচে পড়ল কনরয়ের নিথর শরীর- ঠিক যেখানটায় মুহূর্ত আগে দাঁড়িয়ে ছিল ডেইজি!
মেয়েটার কান ফাটানো চিৎকারে ছুটে এল বাকি তিনজন।
ইউ ওকে?
আয়মানের বুকে মুখ লুকাল ডেইজি। বাচ্চাদের মতো ফেঁপাচ্ছে মেয়েটা। কাঁপছে থরথর করে।
গোড়ালির উপরে বসে কনরয়কে পরীক্ষা করছে আয়ান।
আয়মানের প্রশ্নবোধক দৃষ্টির জবাবে জানাল: ঘাড়টা ভাঙা।
এসময় শোনা গেল আরেকটা গর্জন। খুব কাছেই যেন।
দৌড়ান! দৌড়ান! গো! গো! গো! জরুরি ব্যস্ততায় চেঁচিয়ে উঠল আয়ান-আয়মান।
দুদ্দাড় ছুটল সবাই। যেদিক থেকে এসেছে আওয়াজটা, তার উলটো দিকে।
ঊর্ধ্বশ্বাসে ছুটছে ওরা, আছাড় খেল অনেকটা পিছিয়ে থাকা রনি।
দাঁড়ান! চেঁচিয়ে উঠল মরিয়ার মতো।
ছোটার উপরেই পিছন ফিরে তাকাল আয়ান। তিন নম্বরে দৌড়াচ্ছিল ও। অসহায়ের মতো সামনে একবার তাকিয়ে ফিরে এল সাহায্য করার জন্য।
ও যখন রনির কাছে পৌঁছল, ততক্ষণে একটা বাকের আড়ালে হারিয়ে গেছে আয়মান আর ডেইজি।
এগারো
সামান্য খোঁড়াচ্ছে রনি। আয়মানদের হারিয়ে ফেলার পর দৌড়ানোর আর প্রয়োজন বোধ করেনি আয়ান। বরঞ্চ মন দিয়েছে ওদের ট্র্যাক খোঁজায়।
খুঁজতে খুঁজতে হাজির হলো এসে এক খনিমুখের কাছে।
বিপজ্জনক লেখা একটা সাইনবোর্ড পেরেক মেরে দেয়া। হয়েছে প্রবেশমুখটার পাশে। অন্য পাশটায় লেখা: প্রবেশ নিষেধ।
শ্রাগ করল আয়ান। রনিকে নিয়ে ঢুকে পড়ল ভিতরে।
.
ভাগ্যিস, সঙ্গে ছিল ফ্ল্যাশলাইটটা। পথের উপরে আলো ফেলে চলতে পারছে সেজন্য। মূল সুড়ঙ্গ থেকে বেরিয়েছে অসংখ্য শাখা-টানেল।
হঠাৎ বিশ্রী আওয়াজে ককিয়ে উঠল পায়ের নিচে কাঠের তক্তা। কিছু বুঝে ওঠার আগেই পাটাতন ভেঙে নিচে পড়ে গেল দু জনে। না চাইতেও গলা ফুড়ে বেরিয়ে এল চিৎকার।
ঝপাস করে একটা স্কুপের উপরে পড়ল দেহ দুটো। আর সেটাই বাঁচিয়ে দিল ওদেরকে ব্যথা পাওয়া থেকে।
ধাতস্থ হতেই বুঝতে পারল, কীসের উপরে পড়েছে। অসংখ্য হাড় আর খুলির স্তূপ! বোটকা, পচা গন্ধ বাতাসে।
আঁতকে উঠে হুড়মুড় করে উঠে দাঁড়ানোর চেষ্টা করল রনি। বেকায়দা ভাবে গড়িয়ে নেমে এল স্তূপটা থেকে। নেমেই হতবাক। সামনের দেয়ালে গাঁথা একটা আংটা থেকে ঝুলছে ওর বোনটা!
ডেইজি! বলে ছটে গেল রনি।
পাশেই একই ভাবে ঝুলিয়ে দেয়া হয়েছে কবজি-বাঁধা আয়মানকে। জ্ঞান নেই কারোরই।
ডেইজি! ডেইজি! চোখ খোলো! বোনের গালে চাপড় মারতে লাগল রনি।
ডুগ্গু! ডুগ্গু! ওয়েক আপ! এত উত্তেজনার মধ্যেও ছদ্মপরিচয় ভোলেনি আয়ান। ঝাঁকাতে লাগল ভাইকে ধরে।
অনেক কষ্টে চোখ মেলে তাকাল আয়মান।
থ্যাঙ্ক, গড! ঠিক আছিস তো তুই?
যন্ত্রণায় কুঁচকে উঠল ডুম্বু ওরফে আয়মানের কপাল।
হ্-হ্যাঁহ! বলল কোনও রকমে।
আয়ানের সুইস আর্মি-নাইফ দিয়ে দড়ি কেটে নামানো হলো দু জনকে বাঁধনমুক্ত হতেই দেহ দুটো নেতিয়ে পড়ল। মেঝেতে। যন্ত্রণাকাতর শব্দ বেরিয়ে এল আয়মানের মুখ দিয়ে।
ওয়েনডিঙ্গো… ওটাকে দেখেছিস তোরা? জানতে চাইল আয়ান।
জোরে জোরে মাথা ঝাঁকাল জুনিয়র।
কোথায় ওটা?
বলতে পারব না। তারা দেখিসনি?
