বেলেচিনের পরবর্তী স্টুয়ার্ট ছিলেন এক আর্মি ক্যাপ্টেন। তবে এই ভুতুড়ে বাড়িতে বাস করার কোন ইচ্ছাই তাঁর ছিল না। বিশাল এস্টেটটাকে ১৮৯৬ সালে একটা ধনী পরিবারের কাছে ভাড়া দিতে মোটেই বেগ পেতে হলো না তাঁর।
তবে ক্যাপ্টেন পরিবারটির কাছে বাড়িটার ভুতুড়ে বলে যে বদনাম আছে তা প্রকাশ করেননি। অগ্রিম ভাড়া দিয়ে এক বছরের জন্য এস্টেটটার অধিকার পায় পরিবারটি। মাত্র সাত সপ্তাহ এখানে কাটাতে সমর্থ হয়। রাত্রিকালীন নানা উপদ্রব এবং শরীরের রক্ত পানি করে দেয়া ভুতুড়ে কুকুরের গর্জন তাদের এলাকাছাড়া হতে বাধ্য করে।
বিছানার চারপাশে একটা খোঁড়া লোকের চলার শব্দে ভয় পেয়ে বাড়ির মেয়েটা ভাইকে ডেকে আনে। সে কামরার মধ্যে সোফায় শুয়ে পড়ে। শুতে না শুতেই ওই খোঁড়ানো পদশব্দ শুরু হয় আবার। ছেলেটা নিশ্চিত হয়ে যায় বোনের বিছানার চারপাশে কেউ খুঁড়িয়ে হাঁটছে। তবে দু’জনের কেউই কাউকে দেখতে পায়নি। ১৮৭৩ সালে এই বিছানায়ই মারা যায় সারা। তবে ভাইটি পরে দু’বার এক অশরীরীকে দেখার দাবি করে। একবার একটা ঘন, দুর্ভেদ্য কুয়াশার আবরণে ঢাকা অবস্থায়, দ্বিতীয়বার ওটা হাজির হয় একটা লোকের বেশে। দরজা দিয়ে ভেতরে ঢোকে, তবে দেয়ালের সামনে গিয়ে অদৃশ্য হয়।
১৮৯৬ সালের সেপ্টেম্বরটা ছিল বেলেচিনের জন্য বিভীষিকাময়। ওই সময় অতিথি হিসাবে থাকা এক নারী লেখেন, প্রতি রাতে প্রবল ঠক ঠক শব্দ, আর্ত চিৎকার আর গোঙানিতে চমকে উঠতে হত বাড়িসুদ্ধ লোককে। অতিথিরা দরজায় প্রবল ধাক্কার শব্দে জেগে উঠতেন। মনে হত দরজাটাই ছিটকে পড়বে। কিন্তু সাহস করে দরজা খুললে কাউকেই পেতেন না। এমনকী একটা কামরায় কুকুর পর্যন্ত থাকতে চাইত না কোনভাবেই।
দ্য টাইমসের ১৮৯৭ সালের ৮ জুন সংখ্যায় এই বাড়ির ভুতুড়ে কাণ্ড-কারখানাগুলো নিয়ে একটি নিবন্ধ ছাপা হয়। তারপর সেখানে ছাপা হয় বেলেচিনের প্রাক্তন বাটলার হেরল্ড স্যাণ্ডার্সের একটি চিঠি। স্যাণ্ডার্স বাড়ির সবাইকে আতঙ্কিত করে তোলা ভয়ানক এক গর্জনের কথা বলে। তারপরই বাড়ির চাকর-বাকরেরা বিদায় নেয়। এমনকী বাড়িতে বেড়াতে আসা অতিথিরা রাতে ভয়ে লাঠি আর রিভলভার নিয়েও জেগে কাটান।
এদিকে এখানকার অশরীরীদের হানা দেয়ার বিষয়টি অতিপ্রাকৃত বিষয় নিয়ে কাজ করা গোস্ট হান্টারদের নজর কাড়ে। এদের মধ্যে আছেন কর্নেল টেইলর এবং মিস গুডরিচ ফ্রিয়ার। টেইলর অল্প সময়ের জন্য স্টুয়ার্ট পরিবারের কাছ থেকে ভাড়া নেন বাড়িটা।
টেইলর কোন কারণে যেতে না পারায় বান্ধবী মিস কন্সটেন্সি মুরসহ ১৮৯৭ সালের ৩ ফেব্রুয়ারি বেলেচিনে আস্তানা গাড়েন মিস ফ্রিয়ার।
সেদিন তুষার পড়ছিল অঝোর ধারায়। বাড়িটাকে মনে হচ্ছিল অশুভ। মিস ফ্রিয়ার তাঁর জার্নালে লেখেন, ‘একটা ভল্টের মত মনে হচ্ছিল ওটাকে। কয়েক মাস যাবৎ পরিত্যক্ত অবস্থায় পড়ে ছিল ওটা। যেসব জিনিসপত্রের অর্ডার দিয়েছিলাম একটাও এসে পৌছেনি। আমাদের ছুরি, প্লেট, ওয়াইন কিছুই ছিল না। খাবার আর জ্বালানী ছিল নামকাওয়াস্তে। লজিয়েরেট থেকে আসার সময় সঙ্গে আনা রুটি, মাখন এবং টিনের মাংস খেয়ে বিছানায় যাই। কামরাটা ছিল অসম্ভব শীতল।’
আগের দিনের পরিশ্রমের কারণে মড়ার মত ঘুমাচ্ছিলেন দু’জনে। রাত তিনটার দিকে চড়া একটা শব্দে ঘুম ভেঙে যায় তাঁদের। সাড়ে চারটার দিকে বেশ কয়েকটি কণ্ঠের কথা বলার আওয়াজ পান। তবে সকালে অবশ্য সব ধরনের অস্বাভাবিক শব্দ থেমে যায়। পরের দিন রাতে তাঁরা জোরে জোরে কিছু আবৃত্তি করার শব্দ শুনতে পান, অনেকটা কোন যাজকের ধর্মগ্রন্থের শ্লোক পড়ার মত।
পরবর্তীতে তাঁদের এখানকার অনুসন্ধানের বিস্তারিত প্রতিবেদন প্রকাশ পায় দ্য এলিজড হণ্টিং অভ বি. হাউস নামে। তবে ছদ্মনাম ব্যবহার করার কারণে অনেকেই তখন বুঝতে পারেননি কোন্ বাড়িটার কথা বলা হচ্ছে। ১৮৯৯ সালে প্রকাশিত হয় বইটি।
মিস ফ্রিয়ার নানের অশরীরীকে বরফে ঢাকা বার্নের কাছে কয়েকবার দেখেছেন। প্রথমবার এক নিঃসঙ্গ নান কাঁদছিল বিরামহীন। অন্য সময় নানা ছিল দু’জন। একজন হাঁটুতে ভর দিয়ে কাঁদছিল, অপরজন মৃদুস্বরে তাকে বোঝানোর চেষ্টা করছিল। ধারণা করা হয় এই নানরা জন স্টুয়ার্টের সময়কার, যখন ছোট কটেজটায় নানরা বসবাস করত। তবে এটাও হতে পারে কাঁদতে থাকা সন্ন্যাসিনীটি আর কেউ নন, ইসাবেলা, ১৮৮০ সালে এক আশ্রমে যিনি মারা যান।
তবে সব কিছু মিলিয়ে দেখা যায় মোটামুটি তিন ধরনের অতিপ্রাকৃত ঘটনার কেন্দ্রবিন্দু বাড়িটি।
প্রথমত, দুই নান। ইসাবেলার বরফঢাকা বার্নের পাশে কাঁদার রহস্য কী?
দ্বিতীয়ত, সারার রহস্যময় মৃত্যুর কারণে স্টুয়ার্টের খোঁড়া ভূতের নারীটির বিছানার চারপাশে হাঁটা।
তৃতীয়ত, মেজরের প্রিয় কালো স্প্যানিয়েল। যার শরীরে বাস করতে চেয়েছিলেন মেজর মৃত্যুর পর। এটা এড়ানোর জন্য স্টুয়ার্টের বংশধরেরা ওটাসহ অন্য কুকুরগুলোকে নির্দয়ভাবে গুলি করে মারে।
মৃত প্রাণীদের ভূতের অনেক গল্প শোনা গেলেও এটা অনেক বেশি বাস্তবসম্মত। প্রথমে এর কথা বলেন মিসেস স্টুয়ার্ট। পরের বিশ বছর অনেক মানুষই অদৃশ্য একটা কুকুরের পায়ের শব্দের উল্লেখ করেন। প্রায়ই কোন কুকুরের দরজার ওপর লাফিয়ে পড়ার আওয়াজও পাওয়া যেত। একটা ভয়াবহ অভিজ্ঞতা ঘটে মিসেস ফ্রিয়ারেরই। তাঁর বিছানায় ওই রাতে শুয়ে ছিল স্পোকস নামের একটা কুকুর। ওটা ছিল ১৮৯৭ সালের ৪ মে। মধ্যরাতে জন্তুটার ভয়াবহ গোঙানির শব্দে ঘুম ভেঙে যায় মিস ফ্রিয়ারের। মোম জ্বালতেই দেখেন স্পোকস ভয়ার্ত দৃষ্টিতে বিছানার পাশের টেবিলের দিকে তাকিয়ে আছে। ওই দৃষ্টি লক্ষ্য করে তাকাতেই টেবিলের ওপর কেবল এক জোড়া কালো পা দেখলেন। ওপরে কিছু নেই। ‘অসুস্থ হয়ে গিয়েছিলাম ওই দৃশ্য দেখে।’ স্মৃতিচারণ করেন ফ্রিয়ার।
