এমনকী এই বাড়িতে বাস করা বেশ যুক্তিবাদী মেইডরাও তাদের ভুতুড়ে সব অভিজ্ঞতার বর্ণনা দিয়েছে। রান্নাঘরের দায়িত্বে ছিল লিজি। সে জানায় তার বিছানার চাদরটা অদৃশ্য এক জোড়া হাত ছিন্নভিন্ন করে ফেলে। ওপরতলার মেইড কার্টার জানায় এক ভোরে ঘুম থেকে জেগে দেখে ধূসর শাল পরা এক নারীর অর্ধেক শরীর তার বিছানার পাশে। ওই অশরীরীর কোন পা ছিল না। পুরোপুরি আলো হওয়া পর্যন্ত কম্বলের ভেতর কাঁপতে থাকে মেয়েটা। তারপর এক ছুটে বাড়িতে। আর কখনও বেলেচিনমুখী হয়নি।
শেষ পর্যন্ত বেলেচিন হাউস স্টুয়ার্টদের হাতছাড়া হয়। ১৯৩২ সালে মি. আর. ওয়েমিস হানিম্যান নামের এক ভদ্রলোক এটা কিনে নেন। ১৯৬৩ সালে ভেঙে ফেলা হয় পুরানো বাড়িটি।
প্রেতাত্মার প্রতিশোধ
১৭৫৫ সালের গ্রীষ্মের এক সন্ধ্যা। ক্যাম্পবেল অভ ইনভেরাওয়ি ক্রুচানের পাহাড়ি পথে হাঁটছিলেন। এসময়ই একজনকে তাঁর দিকে এগিয়ে আসতে দেখলেন। বেশ দ্রুতগতিতে আসছে সে, তবে একই সঙ্গে টলমল করছে। দৃশ্যটা দেখে ইনভেরাওয়ির জমিদারের কৌতূহল হলো। পাহাড় বেয়ে নেমে এলেন লোকটার সঙ্গে মিলিত হতে।
কাছাকাছি আসতেই ইনভেরাওয়ি (নিজেও জায়গাটির নামেই পরিচিত ছিলেন) বুঝতে পারলেন লোকটার এই অস্বাভাবিকতার কারণ। শুধু যে ক্লান্ত তাই না, বেশ আহতও। চোখ-মুখে আতঙ্কের ছাপ সুস্পষ্ট। আক্রান্ত হতে পারে এই ভেবে জমিদারের পায়ের ওপর আছড়ে পড়ল লোকটি। ‘স্যর, দয়া করুন। এই বিপদ থেকে বাঁচান।’
‘শান্ত হও,’ বললেন তিনি, ‘আমার কাছে তুমি নিরাপদ। কী হয়েছে বলো। তোমার এই করুণ হাল হলো কীভাবে? আশা করি সাহায্য করতে পারব তোমাকে।’
বিধ্বস্ত লোকটা উঠে দাঁড়িয়ে বলল, ‘ওরা আমার পিছু নিয়েছে।’ কেঁদে উঠল সে, ‘রক্তের বদলা নিতে আমাকে অনুসরণ করে আসছে। স্যর, হাতে সময় নেই একেবারেই। আমাকে দেখা মাত্র খুন করবে। দয়া করুন।’
ইনভেরাওয়ির ক্যাম্পবেলের লোকটার মর্মান্তিক অবস্থা দেখে দয়া হলো। ‘আমি তোমাকে বাঁচাব। প্রতিজ্ঞা করছি। ইনভেরাওয়িরা কখনও কথা দিয়ে তা রাখতে ব্যর্থ হয় না।’
তারপর আগন্তুককে ক্রুচান পাহাড়ের একটা গোপন গুহায় নিয়ে চললেন। এর খোঁজ কেবল তিনিই জানেন। যুগের পর যুগ ধরে গুপ্ত এই স্থানটার খবর দাদা থেকে বাবা, বাবা থেকে ছেলে এভাবে জেনে আসছে। পুরানো দিনে অনেক যোদ্ধাই এটিকে লুকানোর জায়গা হিসাবে ব্যবহার করেছিলেন। প্রবেশ পথটা এতটাই ছোট যে পথচারীরা দেখলে ভাববে শিয়ালের গুহা। ভেতরে বেশ কয়েকটা বড় কুঠুরী আছে। এর একটায় আবার ঝরনার জল জমে একটা কুয়ার মত তৈরি হয়েছে।
লোকটাকে গুহার কাছে পৌঁছে দিয়ে ইনভেরাওয়ি চলে যাবার জন্য উদ্যত হলেন। কিন্তু লোকটা তাঁর হাত চেপে ধরে তাকে একা রেখে চলে না যাওয়ার জন্য কাকুতি-মিনতি করতে লাগল। এত ভীতু একটা লোককে সাহায্য করার শপথ করেছেন বলে মেজাজ খিঁচড়ে গেল জমিদারের। বেশ কিছুটা অসন্তুষ্ট কণ্ঠেই বললেন, ‘আর একটু সাহসী হওয়ার চেষ্টা করো। এখানে তুমি নিরাপদ। তোমার পিছু নিয়েছে যারা, জায়গাটা খুঁজে পাবে না। পরে খাবার নিয়ে আসব তোমার জন্য।’
আগন্তুক শান্ত হলো। বিড়বিড় করে ধন্যবাদ জানাল জমিদারকে। তারপর পাহাড়ের এবড়ো-খেবড়ো পথ ধরে তাঁর শরীরটা অদৃশ্য হয়ে যেতে দেখল।
ইনভেরাওয়ি যখন প্রাসাদে পৌঁছলেন দেখলেন একজন লোক অপেক্ষা করছে তাঁর জন্য। লোকটাকে খুব অস্থির দেখাচ্ছে। বার্তাবাহক জানাল খারাপ একটা সংবাদ নিয়ে এসেছে সে। ইনভেরাওয়ির মনে হলো তাঁর পালক ভাইয়ের সঙ্গে নিশ্চয়ই এর সম্পর্ক আছে। তাকে বড্ড ভালবাসেন তিনি। কী শুনতে হয় ভেবে আতঙ্কিত হয়ে উঠলেন মনে মনে। ‘স্যর, মেচনিভেন নামের এক লোক নৃশংসভাবে আপনার পালক ভাইকে হত্যা করেছে,’ বলল লোকটা। ‘খুনেকে অনুসরণ করে এই জায়গাটির মোটামুটি কাছাকাছি চলে আসি আমরা,’ বলতে লাগল বার্তাবাহক। ইনভেরাওয়ি জায়গাতেই যেন জমে গেলেন। একটা বিষয় পরিষ্কার হয়ে গিয়েছে তাঁর কাছে। ‘আমি এখানে এসেছি আপনাকে সতর্ক করতে, যদি লোকটা আবার আপনার কাছে সাহায্য চেয়ে বসে।’
ফ্যাকাসে চেহারা নিয়ে ভাইয়ের মৃত্যু সংবাদ এবং তার হত্যাকারীকে ধরার যে চেষ্টা চালানো হচ্ছে তা শুনলেন ইনভেরাওয়ি। বার্তাবাহক ভাবল, পালক ভাই হারানোর শোকে এতটাই মুহ্যমান হয়ে পড়েছেন তিনি যে কথা বলার ভাষা হারিয়ে ফেলেছেন। তাঁকে একা থাকার সুযোগ দিয়ে পলাতক খুনিটাকে ধরার অভিযানে যোগ দেয়ার জন্য ছুটল সে।
একা হতেই ইনভেরাওয়ির মাথায় এল, এখন তিনি কী করবেন? শুধু যে খুনিটাকে সাহায্য করেছেন তা নয় তাকে রক্ষা করার শপথও করেছেন। তাঁর ভাইয়ের সঙ্গে কাপুরুষ মেচনিভেন যা করেছে তা ফিরিয়ে দেয়ার প্রবল একটা ইচ্ছা মাথা চাড়া দিয়ে উঠল। তাঁকে কথা রাখতে হবে। কিন্তু নিজেকে শান্ত করে কিছু খাবার নিয়ে গুহার দিকে চললেন। মেচনিভেনকে খাবারটা পৌঁছে দিয়ে আগামীকাল আরও খাবার নিয়ে আসবেন বলে বিদায় নিলেন। তবে একবারও ওই হত্যাকাণ্ডের ব্যাপারে কিছু বললেন না। যদিও ভাইয়ের জন্য প্রচণ্ড কষ্ট হচ্ছিল তাঁর।
মানসিকভাবে বিপর্যস্ত অবস্থায় সে রাতে শয্যায় গেলেন ইনভেরাওয়ি। এপাশ-ওপাশ করতে লাগলেন, কিন্তু দু’চোখের পাতা এক করতে পারছেন না। একটা বই হাতে নিলেন, যদি ওটা অশান্ত মনটাকে শান্ত করে ঘুম এনে দেয়। হঠাৎ আবিষ্কার করলেন বইয়ের পাতায় একটা ছায়া পড়েছে। বিস্মিত হয়ে ওপরপানে তাকিয়েই চেঁচিয়ে উঠলেন। তাঁর বিছানার পাশে দাঁড়িয়ে আছে পালক ভাই। তবে কতকটা বদলে গেছে। মুখ ফ্যাকাসে, বসা। চুল রক্তে চুপচুপে, কপাল বেয়েও পড়ছে রক্তের ধারা। ছিন্ন কাপড়েও রক্তের দাগ।
