গোটা বাড়িটা নানা ধরনের কুকুর দিয়ে ভরিয়ে ফেলেন তিনি। তাঁর সবচেয়ে প্রিয় ছিল একটা বিশাল কালো স্প্যানিয়েল। মৃত্যুর পর ওটার দেহেই ফিরে আসার বাসনা ছিল স্টুয়ার্টের। মেজর স্টুয়ার্টের কুকুরের দেহে ফিরে আসার এই খায়েশ তাঁর বংশধর ও আত্মীয়-স্বজনরা মোটেই সহজভাবে নেয়নি। রবার্ট স্টুয়ার্টের মৃত্যুর পর দেরি না করে স্প্যানিয়েলটাসহ সবগুলো কুকুরকেই গুলি করে মারে তারা। ধরে নেয় এভাবে মেজরের ফিরে আসার পথ বন্ধ হয়ে গেল।
১৮৫৩ সালের উইলে মেজর বেলেচিনের উত্তরাধিকার করেন তাঁর বিবাহিত বোন মেরির সন্তানদের। মেরির ছিল পাঁচ সন্তান। ১৮৬৭ সালে বড় ছেলে মারা যান। পরের বছরই ছোট তিন সন্তানকে উত্তরাধিকার থেকে বঞ্চিত করে নতুন উইল করেন। এতে ১৮৭৬ সালে বেলেচিনের একমাত্র মালিক বনে যান মেরির দ্বিতীয় পুত্র জন। দেরি না করে নিজের নামের সঙ্গে স্টুয়ার্ট জুড়ে দেন। সরাসরি উত্তরাধিকার না হওয়া সত্ত্বেও বংশ ঐতিহ্য ঠিক রাখার জন্য এটা করেন বলে ধারণা করা হয়।
খালা ইসাবেলার মত জন স্টুয়ার্ট ছিলেন ক্যাথলিক খ্রীষ্টান। বুড়ো মেজর ছিলেন একজন প্রটেসট্যান্ট। লজিয়েরেটের গোরস্থানে ২৭ বছর বয়সী তাঁর সেই হাউসকিপারের পাশেই সমাহিত করা হয় তাঁকে। ১৮৭৩ সালে রহস্যময়ভাবে মারা যায় সারা নামের ওই মেয়েটি।
বেলেচিনের প্রধান বেডরুমে মৃত্যু হয় সারার। পরবর্তীতে বাড়ির সবচেয়ে ভুতুড়ে কামরায় পরিণত হয় এটি। যে বিছানায় সারা শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করে তার চারপাশে খুঁড়িয়ে খুঁড়িয়ে মেজরের ভূতের চলাফেরা করার আওয়াজ পাওয়া যেত।
জীবিত থাকা অবস্থায় একুশ বছর মামার ওই সম্পত্তির আয়-রোজগারে আরামের সঙ্গেই দিন গুজরান করেন জন স্টুয়ার্ট। বিবাহিত ছিলেন তিনি, কয়েকটা সন্তানও ছিল। বড় ছেলে যোগ দেয় সেনাবাহিনীতে, ছোটটা হয় যাজক। জন স্টুয়ার্টের সময় মামার গড়ে তোলা ওই কটেজটায় নান বা সন্ন্যাসিনীদের থাকার ব্যবস্থা হয়। ওই সময়ই ভুতুড়ে ঘটনার শুরু।
বুড়ো মেজরের মৃত্যুর পর পরই তাঁর ভাগ্নে বউ মিসেস স্টুয়ার্ট, যে কামরাটাকে মেজর স্টাডি হিসাবে ব্যবহার করতেন সেখানে নিজের বিভিন্ন জিনিসপত্র রাখা শুরু করেন। এসময়ই একদিন হঠাৎ কামরাটায় কুকুরের কড়া গন্ধ পেতে থাকেন। ছোট্ট ডেস্কটায় বসে কুকুরের গায়ের গন্ধ কীভাবে এল এটা ভেবে বের করার চেষ্টা করতে লাগলেন। তাঁর মনে পড়ল যখন মেজরের মৃত্যুর পর সবগুলো কুকুরকে পরপারে পাঠিয়ে দেয়া হয় তখনও কামরাটায় এমন একটা গন্ধ পাওয়া গিয়েছিল। তারপরই সবচেয়ে বড় ভয়টা পেলেন। মনে হলো, অদৃশ্য একটা কুকুর ধাক্কা দিচ্ছে তাঁকে। তাঁর মনে হলো কুকুরগুলোকে মেরেও মেজরের অতৃপ্ত আত্মার হাজির হওয়া বন্ধ করতে পারেননি তাঁরা।
এদিকে মেজরের মৃত্যুর পর থেকে কিছু রহস্যময় ঘটনা ঘটতে থাকে। বিভিন্ন কামরায় জোরে টোকা দেয়ার শব্দ শোনা যায় যখন-তখন। নানা ধরনের অদ্ভুত আওয়াজ হয়। হঠাৎ একটা কামরার মাঝখান থেকে শোনা যেতে থাকে ঝগড়ার শব্দ।
চাকর-বাকরেরা আর এখানে থাকতে রাজি হলো না। তাদের মাধ্যমে গল্পগুলো ছড়িয়ে পড়ল আশপাশের এলাকায়। একপর্যায়ে স্কটল্যাণ্ডের সবচেয়ে ভুতুড়ে বাড়ির তকমা লেগে গেল এর গায়ে।
১৮৭০-এর দশকের শেষ দিকে স্টুয়ার্টদের সন্তানদের দেখভালের দায়িত্বে থাকা গভর্নেস মেয়েটাও একের পর এক ভুতুড়ে ঘটনা এবং অস্বাভাবিক শব্দের জন্য চাকরি ছেড়ে চলে যায়। এ বাড়িতে কিছুদিন বাস করা এক যাজক বলেন তাঁর বিছানা এবং ছাদের মাঝামাঝি কোন জায়গা থেকে বিস্ফোরণের মত একটা শব্দ হতে থাকে টানা।
কটেজে বাস করা সন্ন্যাসীদের আত্মিক প্রশিক্ষণের জন্য বেলেচিনে আনা হয় ফাদার হেইডেনকে। বাড়ির মালিককে সমস্যার বিষয়টা খুলে বলেন তিনি। জন স্টুয়ার্ট অনুমান করেন তাঁর প্রয়াত মামার কীর্তি এটা। মেজরের পৃথিবীতে ফিরে আসবার জন্য প্রার্থনা করবেন এই আশায় যাজকের মনোযোগ আকর্ষণের চেষ্টা করছেন তিনি।
যাজক আরও বেশ কিছু অতিপ্রাকৃত ঘটনা টের পান। বিশেষ করে বড় একটা জানোয়ারের চিৎকার, সম্ভবত কোন কুকুরের। বাইরে থেকে তাঁর ঘরের দরজার ওপর ঝাঁপিয়ে পড়ার শব্দও পেতেন তিনি। কখনও দরজায় টোকা দেয়ার ঠক ঠক আওয়াজও শুনতেন যাজক।
স্টুয়ার্ট পরিবার বেশ চিন্তিত হয়ে পড়ল। বিশেষ করে ছোট ছেলে-মেয়েদের কথা ভেবে। জন স্টুয়ার্ট নিজেও একদিন এক জানালা থেকে ভুতুড়ে কয়েকজন সন্ন্যাসী এবং সন্ন্যাসিনীকে দেখেন। এদিকে ফাদার হেইডেন যে কামরায় থাকতেন পরে এক রাতে ওই কামরায় ঘুমানো এক দম্পতিও একই ধরনের অভিজ্ঞতার বর্ণনা দেন। একপর্যায়ে স্টুয়ার্ট বেলেচিন হাউসের কিছু অংশ সম্প্রসারিত করে মোট ১২টি নতুন বেডরুম তৈরি করান। উদ্দেশ্য, অন্তত ছেলে- মেয়েগুলো যেন দালানের ভুতুড়ে অংশের বাইরে থাকে।
জানুয়ারি ১৮৯৫ সালে ঘটে ভয়ানক ঘটনাটা। এক সকালে পারিবারিক এক ব্যবসার কাজে লণ্ডনের উদ্দেশে রওয়ানা দেয়ার কথা তাঁর। স্টাডিতে এজেন্টের সঙ্গে কথা বলছিলেন। এসময় হঠাৎ প্রবল তিনটি টোকার শব্দে কথা থামিয়ে দিতে বাধ্য হন দু’জনে। ওই দিন লণ্ডনে পৌছার পরই গাড়ি চাপায় মারা যান জন স্টুয়ার্ট। তাঁর মৃত্যুর সঙ্গে ওই টোকার শব্দের কোন ভূমিকা আছে কিনা নিশ্চিত করে বলা মুশকিল।
