এতক্ষণ ভুতুড়ে বাড়ি নিয়ে পড়ে থাকলেও এবার ব্রিজের সঙ্গে সম্পর্ক আছে এমন কয়েকটা ভুতুড়ে ঘটনা দিয়ে এই অধ্যায়টি শেষ করতে চাই। টেমস নদীর সঙ্গে এত বেশি খুন, আত্মহত্যা এবং দুর্ঘটনার সম্পর্ক আছে যে এর দু’তীরে ভুতুড়ে ঘটনা ঘটা মোটেই অস্বাভাবিক নয়।
বাঁধ আর কোন কোন সেতুতে দেখা যাওয়া ভূতেদের কথা বলছি। রাতে এখান দিয়ে চলাফেরা করা পথচারী, ভবঘুরে আর রিভার পুলিসদের এ ধরনের অভিজ্ঞতা হয়। এদের কাছ থেকেই ওখানকার অশরীরীদের সম্পর্কে জানতে পারি আমি
জীবন সম্পর্কে হতাশ এক ভবঘুরে আমাকে বলল এক রাতে ওয়াটার লু সেতুর ওপর দিয়ে নদীর দিকে ঝুঁকে ছিল, লাফ দেয়ার সাহস সঞ্চয় করার জন্য। এসময় টলতে টলতে এক সুবেশী যুবক তাকে পাশ কাটাল। মনে হচ্ছে আকণ্ঠ মদ খেয়েছে। যুবকের সঙ্গের সোনার ঘড়ি আর হারটা ওই ভবঘুরেকে লোভী করে তুলল। আত্মহত্যার চিন্তা বাদ দিয়ে তাকে অনুসরণ শুরু করল সে। একপর্যায়ে সেতুর পাশে পাঁচিলে ঠেস দিয়ে দাঁড়িয়ে ছেলেটাকে ভারসাম্য রক্ষা করতে দেখে খুশি হয়ে উঠল ভবঘুরে। চমৎকার একটা সুযোগ চলে এসেছে। চুপিসারে তার পেছনে এসে হাত বাড়াল ঘড়িটা টান দেয়ার জন্য। কিন্তু হাত কিছুই পেল না। পরমুহূর্তে ভারসাম্য হারিয়ে জোরে বাড়ি খেল দেয়ালের সঙ্গে। কিন্তু তার শিকারের কোন দেখা নেই। যেন বা সেতুটা হঠাৎ ফাঁক হয়ে তাকে অতলে টেনে নিয়েছে।
ওয়েস্টমিনস্টার ব্রিজে ভুতুড়ে এক অভিজ্ঞতার কথা আমাকে বলে এক পুলিস সদস্য। অ্যাবির দিক থেকে রাত দুটোর দিকে সেতু পেরোচ্ছিল সে। এসময়ই মনে হলো তার পেছনে কেউ দৌড়চ্ছে। ঘুরতেই সুন্দরী, দামি পোশাক পরা এক মেয়ের মুখোমুখি হয়ে গেল।
‘দয়া করে আমার সঙ্গে এসো। এই মাত্র এমন একজনকে রেখে এসেছি, যে খুব বিপদে আছে।’ আর্তি জানাল মেয়েটা।
সার্জেন্টকে তখনই রিপোর্ট করার কথা থাকায় পুলিসটা দ্বিধা করছিল। তবে মেয়েটা এমন করুণ দৃষ্টিতে তাকিয়ে ছিল যে সে তাকে অনুসরণ করতে বাধ্য হলো। বাঁধের কোনায় আসতেই দেখল একটা মেয়ে নদীতে লাফ দিয়ে আত্মহত্যা করতে যাচ্ছে। বেশ জোর-জবরদস্তি করে মেয়েটাকে নিচে নামাতে পারল। তার মুখের দিকে তাকাতেই ধাক্কা খেল। যে মেয়েটা তাকে ডেকে নিয়ে এসেছে সে দেখতে অবিকল তারই মত। একটা ব্যাখ্যা পাওয়ার আশায় পেছনে তাকাতেই দেখল পথ প্রদর্শক মেয়েটি গায়ের হয়েছে।
‘তোমার বোন, আরও পরিষ্কারভাবে বললে যমজ বোনটি ‘গেল কই?’ আত্মহত্যার চেষ্টাকারীর দিকে চেয়ে চিৎকার করে
বলল পুলিসটি। চারপাশে খুঁজছে সে ওই মেয়েটিকে।
‘কার কথা বলছ?’ প্রাণ দিতে যাওয়া মেয়েটা বলল।
‘কেন, তোমার যমজ বোন। যে আমাকে ডেকে এনেছে তোমার আত্মহত্যা ঠেকাতে।’
‘কী বলছ এসব,’ এবার অবাক হবার পালা মেয়েটির, ‘পাগল নাকি? আমার যমজ বোন তো দূরে থাক কোন বোনই নেই। আমার কোন বন্ধু নেই, স্বজন নেই, আমি একেবারেই একা। এখানে আসার পর কোন মেয়েকে দেখিনি, এ ব্যাপারে নিশ্চয়তা দিতে পারি।’
বেলেচিনের প্রেতাত্মারা
স্কটল্যাণ্ডের বেলেচিন হাউসের অবস্থান ছিল লজিয়েরেট থেকে কয়েক মাইল দূরে পাহাড়ি এলাকায়। টে নদীর উপত্যকার ওপর ঝুলে ছিল অনেকটা। বিচিত্র সব স্পিরিটের কারখানা হিসাবে পরিচিতি পাওয়া ডানকেলডও ওখান থেকে খুব দূরে নয়।
স্টুয়ার্ট পরিবার ষোলো শতক থেকেই এস্টেটটার মালিক। রাজা দ্বিতীয় রবার্টের বংশধর ছিল স্টুয়ার্টরা। পুরানো ম্যানর হাউসের বদলে বেলেচিন হাউস তৈরি হয় ১৮০৬ সালে।
যাঁর মাধ্যমে বেলেচিন হাউসে ভুতুড়ে কাণ্ড-কারখানার সূচনা তিনি রবার্ট স্টুয়ার্ট। বেলেচিন হাউসটা যখন বানানো হয় তখনই তাঁর জন্ম। ১৮২৫ সালে উনিশ বছর বয়সে ভারত যান রবার্ট, সেখানে ইস্ট ইণ্ডিয়া কোম্পানির সেনাবাহিনীর একজন অফিসার হিসাবে যোগ দেন। পঁচিশ বছর পর মেজর হিসাবে অবসরে যান। বাবার মৃত্যুর পর ১৮৩৪ সালে বেলেচিনের উত্তরাধিকারী হন তিনি। ১৮৫০ সালে যখন ভারত থেকে ফেরেন আবিষ্কার করেন তাঁর বাড়িটায় ভাড়াটেরা থাকছে। বেলেচিন কটেজ নামে এস্টেটের সীমানার মধ্যে ছোট্ট এক কটেজ তৈরি করান তিনি। সেখানে ভাড়াটেদের চুক্তির মেয়াদ শেষ হওয়া পর্যন্ত থাকেন। তারপর মূল বাড়িতে ওঠেন।
মেজর স্টুয়ার্ট ছিলেন একটু খোঁড়া। ধারণা করা হয় ভারতে দায়িত্ব পালনকালীন সময়ে কোন এক দুর্ঘটনায় জখম হন তিনি। অবিবাহিত ছিলেন। তবে তরুণী এক হাউসকিপার সবসময় সঙ্গ দিত তাঁকে। দু’জনের সম্পর্ক নিয়ে নানান কানাঘুষা শোনা যায়। তাঁর ছিল দুই ভাই এবং ছয় বোন। বোনদের একজন ইসাবেলা সন্ন্যাস জীবন বেছে নেন। বাড়ির অশরীরী কাজ-কারবারের অন্যতম কেন্দ্রীয় চরিত্রে পরিণত হন পরে এই নারী। ১৮৮০ সালের ২৩ ফেব্রুয়ারি এক আশ্রমে মৃত্যু হয় তাঁর।
১৮৭৬ সালে মারা যাওয়া মেজর স্টুয়ার্ট ছিলেন খুব খামখেয়ালি মানুষ। ভারতে অতিপ্রাকৃত বিষয়ের প্রতি আগ্রহ জাগে তাঁর। তিনি মনেপ্রাণে বিশ্বাস করতেন মারা যাওয়ার পর আত্মা অন্য কিছুতে ভর করে ফিরে আসতে পারে। বেলেচিনে যে পঁচিশ বছর বাস করেন অদ্ভুত আচার- আচরণের জন্য গোটা জেলায় রীতিমত পরিচিত হয়ে যান।
