গোরস্থানে ঢুকতেই অস্বস্তি বাড়ল। এইডেনের মনে হলো তার ঘাড়ের পিছনে কেউ নিঃশ্বাস ফেলছে। যদিও পিছন ফিরে কাউকে দেখা গেল না। মিনিট বিশেক থাকার পরই এখান থেকে বেরিয়ে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নিল দুজনে। ভয়ের হিমশীতল একটা অনুভূতি ছড়িয়ে পড়ছে শরীরে। এদিকে গোরস্থান আর এর আশপাশের এলাকায় একটা জনপ্রাণীকেও দেখা যাচ্ছে না। গোরস্থান থেকে বের হওয়ার আগ পর্যন্ত রেকর্ডারটা চালুই রাখল। গাড়িতে ঢুকেই রেকর্ডারটা প্রথম থেকে চালু করে দিল এইডেন। আর তখনই প্রচণ্ড একটা ধাক্কা খেল। মনে হলো যেন কেউ ফিসফিস করে বলছে এখান থেকে বিদায় হও। আসল সমস্যা শুরু হলো বাড়িতে পৌঁছার পর। হঠাৎ করেই প্রচণ্ড কাশি হয়ে গেল এইডেনের, সেই সঙ্গে গলায় প্রচণ্ড ব্যথা। তার স্বাস্থ্য এমনিতে বেশ ভাল, আর ঠাণ্ডায় বের হওয়ার মত পোশাকও ছিল পরনে। মাত্র বিশ মিনিট গোরস্থানে থেকে শরীরের এই হাল হলো কেন ভেবে কূলকিনারা পেল না। পরদিন সকালে যখন বান্ধবী এল তখন তার কাহিল অবস্থা। গায়ে জ্বর, সেই সঙ্গে পেট খারাপ। নড়াচড়াও করতে পারছে না ঠিকমত। তার বান্ধবী ল্যাপটপ নিয়ে এলে দুজন দেখতে বসল। কোনো কোনো ছবিতে সাদা ধোয়ার মত দেখা গেল। আবার কয়েকটা ছবিতে অস্পষ্ট মানুষের মুখও দেখা যাচ্ছে।
এক মাস পর একসঙ্গে একটা ফ্ল্যাটে উঠল দুজন। এর দুই মাস পর গাড়ি দুর্ঘটনায় পড়ল তারা। গাড়ি দুর্ঘটনার এক মাস পর কোনো কারণ ছাড়াই চাকরি হারাল এইডেনের বান্ধবী। তারপর চাকরি যাবার পালা এইডেনের। দুজনে কতগুলো ইন্টারভিউ যে দিল তার ইয়ত্তা নেই। কিন্তু চাকরি যেন সোনার হরিণ হয়ে গেল। পুরো বছরটাই খারাপ গেল। জ্বর, সর্দি-কাশি লেগেই থাকল। আর অ্যাপার্টমেন্টেও একটার পর একটা সমস্যা তৈরি হলো। এক বছরের মধ্যে অ্যাপার্টমেন্টে ছাড়তে বাধ্য হলো তারা। আবার এইডেনের বাবা-মার কাছে গিয়ে উঠল। তবে এবার শনির দশা কাটল। কয়েক মাসের মধ্যে চাকরি পেল দুজনেই। এরপর আর বড় কোনো সমস্যায় পড়তে হলো না। এইডেনের নিশ্চিত ধারণা এই গোরস্থানে ব্যাখ্যার অতীত কোনো একটা সমস্যা আছে। কারণ সেখানে যাবার আগে তারা দুজনেই ছিল সুস্থ-সবল। কিন্তু ফেরার সঙ্গে-সঙ্গেই একটার পর একটা সমস্যা শুরু হয়ে গেল। আর তাই এইডেন নিজে পণ করেছে আর কখনও এই অশুভ গোরস্থান না মাড়ানোর। তেমনি বন্ধুবান্ধবদেরও পরামর্শ দেয় ওদিকে যাওয়ার দুঃসাহস না দেখানোর। তবে, পাঠক কখনও যদি শিকাগো চলেই যান, অবিবাহিতদের এই গোরস্থানে যাবেন কিনা তা আপনার সিদ্ধান্ত। তবে গেলে যেতে হবে মনটাকে শক্ত করে, সব ধরনের অঘটনের জন্য প্রস্তুত হয়েই।
সব ভুতুড়ে
এমন অনেক ঘটনা আছে যেগুলো আগের নয়টি অধ্যায়ের কোনোটির মধ্যেই ফেলা যাচ্ছে না। কিন্তু তাই বলে এগুলো পড়ার আনন্দ থেকে তো পাঠকদের বঞ্চিত করতে পারি না। তাই এ ধরনের কিছু অশুভ, ব্যাখ্যার অতীত ঘটনাকে আমরা একসূত্রে গেঁথেছি, ‘সব ভুতুড়ে’ নামে।
সেই বুড়ো লোকটা
এবারের কাহিনিটি ভারতীয় এক তরুণের। চলুন এটা শুনি তার মুখ থেকেই।
১৯৮৮-৮৯ সালের ঘটনা। বাবা তখন মুম্বাই থেকে লনাভালা বদলি হলেন। মুম্বাই থেকে মোটামুটি ১২০ কিলোমিটার দূরের পাহাড়ি একটা স্টেশন এই নাভালা। তখন আমি পড়ি ক্লাস নাইনে। গ্রীষ্মের ছুটিতে মা, বড় ভাই আর আমি বাবার কাছে চলে যেতাম।
আমার চাচাতো ভাই পরাগ, যে আমার থেকে কয়েক বছরের বড়, থাকত লনাভালাতেই। সেখানে গেলেই তাই একসঙ্গে প্রচুর ঘোরাফেরা আর আড্ডাবাজি হত। তবে আমাদের অবসর বিনোদনের সবচেয়ে পছন্দের জায়গা ছিল কাছের একটা পাহাড়। একটা স্কুলের পাশেই ছিল ওটা। সাইকেলে চেপে ফ্লাস্ক ভর্তি কফি নিয়ে চলে যেতাম পাহাড়টায়। ঠাণ্ডা হাওয়া খেতে-খেতে গল্প চলত, আর তাকিয়ে থাকতাম তারার দিকে। পরাগের দু-জন বন্ধুও সাধারণত সাইকেল নিয়ে আসত আমাদের সঙ্গ দিতে।
এক রাতের ঘটনা। প্রিয় জায়গাটায় বসে কফি পান আর নানান আলাপে মশগুল আমরা। এসময়ই একজন মানুষকে আসতে দেখলাম এদিকে। কাছাকাছি হতেই দেখলাম রোগা, বুড়ো একজন মানুষ। এত রাতে এমন একজন লোককে এখানে দেখে অবাক হলাম সবাই। কৌতূহল নিয়ে জিজ্ঞেস করলাম তিনি এখানে কী করছেন আর তার কোনো সাহায্য লাগবে কিনা। বুড়ো জানালেন কাছের একটা গ্রামে থাকেন। আর মুম্বাইয়ের দিকে যাওয়া রাতের শেষ ট্রেনটা ধরবেন। মুম্বাইয়ে ছেলের কাছে যাবেন। লোকটার দুর্বল শরীর দেখে এমনিতেই মায়া হচ্ছে। তারপর আবার মনে হলো হেঁটে গেলে নির্ঘাত ট্রেনটা মিস করবেন। আর এসময় এদিক থেকে রেলস্টেশনে পৌঁছনোর কোনো যান পাওয়ারও সুযোগ নেই। কাজেই পরাগ তাকে তার বাই সাইকেলে করে স্টেশনে পৌঁছে দিতে চাইল। পরাগের বন্ধুর সাইকেলে চেপে আমি আর আমার ভাইও ওদের সঙ্গী হলাম। তঁকে স্টেশনে নামিয়ে দিয়ে এসে আবারও গল্পে মেতে উঠলাম।
তারপরই যেটা ঘটল এটা মনে করে আজও শরীরে কাঁটা দিয়ে ওঠে আমার। লোকটাকে নামিয়ে দিয়ে আসার পর আধ ঘণ্টাও পার হয়নি। সবারই ঘুম-ঘুম আসছে। বাসায় ফিরে যাওয়ার কথা ভাবতে শুরু করলাম। এসময়ই অন্ধকারে একটা কাঠামোকে আসতে দেখলাম, একটু আগের লোকটা যেদিক থেকে এসেছেন সেদিক থেকেই। তারপরই অবাক বিস্ময়ে আবিষ্কার করলাম সেই পলকা দেহের বুড়ো লোকটাই এগিয়ে এল আমাদের দিকে,যাকে অল্প আগে স্টেশনে নামিয়ে দিয়ে এসেছি। বুড়ো কাছে এসে স্টেশনে পৌঁছে দেওয়ার অনুরোধ করলেন।
