এক রাতে খাওয়া-দাওয়ার পর কথা-বার্তার মাঝখানেই নবীন জানাল এই বাংলোর কাছেই একটা গোরস্থান আছে। বাংলোর কেয়ারটেকার তাকে জানিয়েছে ওখানে নানান ধরনের অদ্ভুত কাণ্ড-কারখানা হয়। কবরস্থানের দিকে চলে-যাওয়া রাস্তাটা নির্জন। আর রাতে লোকজন সাধারণত ওই রাস্তা এড়িয়ে চলার চেষ্টা করে। কেয়াটেকার নবীনকে বলেছে, সে যেন রাতের বেলা গোরস্থানের দিকটা, না মাড়ানোর জন্য সাবধান করে দেয় অন্যদের। এদিকে ভূত-প্রেত কিংবা অতিপ্রাকৃত ঘটনায় অজয়ের মোটেই বিশ্বাস নেই। তবে বাকিরা কৌতূহলী হয়ে উঠল বিষয়টা নিয়ে। কিন্তু নবীন এর চেয়ে বেশি কিছু জানে না। কেয়ারটেকারও আর কিছু বলতে রাজি হলো না। কাজেই তখনকার মত চাপা পড়ে গেল বিষয়টি।
দেখতে-দেখতে ব্যাঙ্গালুরুতে শেষ দিন এসে গেল তাদের। রাতে নতুন কর্মকর্তাদের সম্মানে এক হোটেলে চমৎকার নৈশভোজের আয়োজন ছিল। তবে সবচেয়ে বেশি উপভোগ করল অজয়। পানটাও বোধহল একটু বেশিই করে ফেলল। বাংলোতে ফিরে গোছগাছ, শুরু করে দিল সবাই। কারণ বেশ সকাল-সকালই ব্যাঙ্গালুরু ছাড়বে তারা।
গোছগাছ শেষে এই কয়েক দিনের স্মৃতিচারণায় মেতে উঠল। এসময়ই আবার পুরানো গোরস্থানটার প্রসঙ্গ টানল নবীন। অজয়কে এটা নিয়েঠাট্টা-মস্করা করতে দেখে বলল, এতই যদি সাহস থাকে তাহলে এই রাতের বেলা এক ঘণ্টা ওখানে থেকে আসতে। অজয়েরও কী হলো! মুহূর্তের মধ্যে চ্যালেঞ্জটা নিয়ে নিল। তারপরই আর কোনো কথা না বলে বাংলো থেকে বেরিয়ে হাঁটা ধরল। এবার অন্যরা তাকে থামানোর চেষ্টা করল। কিন্তু কাজ হলো না একটুও। এদিকে অ্যালকোহলে কখনওই আসক্তি নেই সনজুর। মাথাটাও ঠাণ্ডা। এই রাতে অজয়কে একা ছেড়ে দেওয়া উচিত হবে না মনে করে, সঙ্গী হলো তার।
সমাধির দিকে চলে-যাওয়া রাস্তাটা আসলেই নির্জন। মোটামুটি এক কিলোমিটারের মত হাঁটার পর সেখানে পৌঁছল তারা। তখন ঘড়িতে রাত সাড়ে বারোটা। বেশ পুরানো একটা গোরস্থান এটা। এখন লোকেরা খুব কমই লাশ কবর দেয় এখানে।
বেশ শীত পড়েছে। সময়টা শীতকাল, আর ব্যাঙ্গালুরুতে শীতে যে বেশ ঠাণ্ডা পড়ে যারা সেখানে থাকেন কিংবা ঘুরতে গিয়েছেন তারা ভালই বলতে পারবেন। গোরস্থানের গেটে তাদের আটকালেন এক বুড়ো। বললেন তিনি আবু চাচা, কবরস্থানের কেয়ারটেকার। কৌতূহল নিয়ে এত রাতে এখানে আসার কারণ জানতে চাইলেন আবু চাচা। অজয় যেন এমন একটা প্রশ্নের জন্য প্রস্তুতই ছিল। বলল এখানে তার একজন আত্মীয়কে গোর দেওয়া হয়েছে। অল্প সময়ের জন্য ব্যাঙ্গালুরুতে এসেছে সে। কাল সকালেই আবার লণ্ডনে উড়াল দেবে। তাই রাতে আসা ছাড়া আর কোনো উপায় ছিল না। আবু চাচা সমবেদনা জানিয়ে তাড়াতাড়ি দেখা শেষ করে ফিরতে বললেন।
ধীরে-ধীরে সমাধির ভিতর দিয়ে এগিয়ে চলল দুজনে। সাধারণ গোরস্থানের মতই মনে হচ্ছে। সিমেন্ট বাঁধানো পথের দুপাশে সারবেঁধে সমাধি। চারপাশে ভুতুড়ে নীরবতা। অবশ্য কখনও-সখনও নির্ভয়ে ঘুরে বেড়ানো পাখি, শিয়াল কিংবা অন্য কোনো বন্যপ্রাণীর ডাক শোনা যাচ্ছে। সামনেই বসার একটা আসন। অজয় বলল এখানে কিছুক্ষণ বসে নীরবতাটা উপভোগ করতে চায়।
একটু অস্বস্তিবোধ করলেও অজয়ের পীড়াপীড়িতে না করতে পারল না সনজু। একটু পরেই পকেট থেকে একটা সিগারেট বের করে ধরাল অজয়। জায়গাটার পবিত্রতা নষ্ট হবে এই ভেবে, তাকে বিরত রাখার চেষ্টা করল সনজু। কিন্তু তার কথায় কান না দিয়ে কাজ চালিয়ে গেল অজয়। আরও কয়েকটা মনিট পার হলো। সনজুর কাছে মনে হলো যেন অনন্তকাল ধরে এখানে বসে আছে। তারপরই অজয় বলল আরও সামনে এগিয়ে গোটা জায়গাটা দেখতে চায়। কয়েক কদম এগিয়েই সনজুকে অবাক করে দিয়ে জানাল তার হঠাৎই দারুণ প্রস্রাব চেপেছে। এখানে এ ধরনের কিছু না করার জন্য পইপই করে তাকে নিষেধ করল সনজু। তারপর বলল তাদের দেরি না করে গোরস্থান ছাড়া উচিত। কিন্তু একগুঁয়ে স্বভাবের অজয় কর্ণপাতই করল না তার কথায়। চোখ দিয়ে একটা ইশারা করে, একটু দূরের একটা ঝোপে ঢুকে পড়ল। বেশ ঘন ঝোপটা। যেখানে আছে সেখান থেকে তাই আর অজয়কে এখন দেখতে পাচ্ছে না সনজু। হঠাৎই খুব দুর্বল মনে হতে লাগল নিজেকে তার। শ্বাস নিতে ভীষণ কষ্ট হচ্ছে। মনে হলো যেন কেউ চেপে ধরে দম বন্ধ করে মারতে চাইছে তাকে। হাঁটুর ওপর ভর দিয়ে রাস্তার ওপর বসে পড়ল সে। পথের সামনে যখন চোখ গেল তখন দেখল একটা ছায়ার মত জিনিস আস্তে আস্তে দূরে সরে যাচ্ছে। এক মুহূর্তের জন্য দাঁড়াল ওটা। সনজু কেঁপে উঠল, মনে হলো তার দিকে একবার ভুতুড়ে দৃষ্টিতে তাকিয়েছে ওটা। তারপরই অদৃশ্য হয়ে গেল।
সনজুর মাথা ঘুরছে। ভয়ের একটা শীতল স্রোত ছড়িয়ে পড়েছে শরীরে। পরিষ্কারভাবে চিন্তা করতে পারছে না কিছুই। নিজের ওপর জোর খাটিয়ে একটু সুস্থির হলো। তারপরই মনে পড়ল অজয় এখনও ফেরেনি। নাম ধরে ডাকল। কিন্তু কোনো জবাব পেল না অপর তরফ থেকে। একটু আগে যে ঝোপটার ভিতর অদৃশ্য হয়েছে সে শরীর টেনে-টেনে সেদিকে এগুল। সেখানে পৌঁছেই আঁতকে উঠল। মাটিতে অজ্ঞান হয়ে পড়ে আছে অজয়। কী মনে করে নিচু হয়ে জোরে-জোরে ঝাকাতে লাগল তাকে। ভাগ্য ভাল এটা কাজে লাগল। আস্তে-আস্তে জ্ঞান ফিরে আসতে লাগল অজয়ের।
