কাজ শুরু করলেন ইমাম সাহেব। শুকনো মরিচ পুড়িয়ে, মাটির বাসনে আরও নানা উপকরণ সাজিয়ে মণির মুখের সামনে ধরলেন। জিনিসগুলোর ঝাঁঝাল ধোঁয়া ওর নাকে-মুখে প্রবেশ করতে লাগল। সেই সাথে দরাজ কণ্ঠে জোরে জোরে দোয়া পড়ে ফুঁ দিতে লাগলেন মণির শরীরে। তারপর হুঙ্কার দিয়ে বললেন, কে তুই? এরে ধরলি কোথায়?
বলুম না। কিছু বলুম না।
রেগে গিয়ে দুজন কামলাকে হুকুম দিলেন ইমাম সাহেব, যেন মোটা দুই বাঁশ দিয়ে মারতে শুরু করে।
নিজে দোয়ার জোর আরও বাড়িয়ে দিলেন।
যন্ত্রণায় ছটফট করতে করতে মণিরূপী পিশাচ কাতর স্বরে বলল, আমি কে, জানতে চাইস না। এক আন্ধার রাইতে খোলা ট্রাকে এই ব্যাটারে ধরছি।
ইমাম সাহেব দ্বিগুণ রেগে গিয়ে বললেন, জানি, তুই একটা বদ, হারামি পিশাচ! ট্রাকে তো আরও মানুষ ছিল, ওদের কাউরে ধরলি না ক্যান?
ভয়াল হেসে পিশাচ্ বলল, দূর-দূর, চিমড়া কামলাদের শরীরে আছে নাহি কিছু? এই ব্যাটা হইল দুধ-ঘি খাওয়া টসটসা জিনিস-শরীল ভরা তাজা মিঠা রক্ত, তাই এরেই ধরছি।
ইমাম সাহেব বললেন, অহন এরে ছাড়বি নাকি বল? না ছাড়লে তোর আরও খারাবি আছে, কইয়া দিলাম।
ওরে ছাইড়া কোনও লাভ হইব না, শরীলের সব রক্ত খাইয়া শ্যাষ কইরা, ব্যাটারে তো সেইদিনই মাইরা ফালাইছি। অহন আমি ছাড়লেই লাশ হইয়া যাইব।
শুনে থমকে গেলেন ইমাম সাহেব, দুঃখ হলো তাঁর মণির জন্য। চিৎকার করে উঠলেন, বেশ করছিস, খবিসের পুত। বাইর হইয়া যা জলদি।
গোঁয়ারের মত পিশাচটা বলতে লাগল, কতদিন পর একটা শরীল পাইছি, ছাড়ম না অরে।
ইমাম সাহেব তখন শুকনো একটা গাছের শিকড় বের করে ওটাতে আগুন ধরালেন, তারপর পিশাচটার নাকের কাছে ধরে সমানে দোয়া পড়তে লাগলেন।
এইবার কাবু হলো পিশাচ, চেঁচাতে লাগল সমানে, যাইতাছি, যাইতাছি, সরা ওইটা। ১ গম্ভীর হয়ে বললেন ইমাম সাহেব, দূর হ, হারামজাদা, আর কোনওদিন যেন এই গ্রামে তোরে না দেহি।
তার কথা শেষ হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে মণির নাক-মুখ দিয়ে বের হতে লাগল কালো ঘন ধোয়া।
ইমাম সাহেবের শক্তিশালী দোয়ার জোরে ধোয়াটা দ্রুত সরে যেতে লাগল। তারপর আর দেখাই গেল না। পরিষ্কার নীল আকাশ, কোথাও কোনও কালিমা নেই, অশুভ ছায়ামুক্ত প্রকৃতি।
সবাই স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলল।
নিষ্প্রাণ মণি বাঁশের খুঁটিতে বাঁধা। মাথা ঝুলে পড়েছে। বুকের ওপর। বিশ্রী দুর্গন্ধ বের হচ্ছে। কতদিনের বাসি মড়া।
রতনদের বাড়িতে নেমে এল শোকের ছায়া।
রমিজ আলী মাথায় হাত দিয়ে স্তব্ধ হয়ে বসে রইল। মনে পড়ল কত বকাবকি করেছে ছেলেটাকে। দুচোখ বেয়ে অশ্রু ঝরতে লাগল তার।
মণির মা তো পাগলের মত হয়ে গেল।
এরপর থেকে দিন-রাত কাঁদতে লাগল মণির মা। আকুল হয়ে ডাকত: বাজান, আমার বাজান, কই গেলি? ফিরে আয়, ফিরে আয় রে!
রতনের অবস্থা দারুণ শোচনীয়। ছোট ভাইটাকে হারিয়ে সে-ও পাগলের মত হয়ে গেছে।
মণি নেই, এই সত্যিটা মেনে নিতে পারছে না কেউ।
কিন্তু সময় সব কিছু ভুলিয়ে দেয় মানুষকে।
দিন থেমে থাকে না।
প্রকৃতি তার আপন নিয়মে চলতে থাকে।
রাজুর মনের দুঃখও একসময় কমল। ছোট ভাইয়ের মুখটা ভাল করে মনে পড়ত না। আগের চাইতেও বেশি কাজ করতে লাগল সে, যাতে কোনওমতেই তার প্রিয় মানুষটার কথা মনে না পড়ে।
রতনের ফুটফুটে নাদুস-নুদুস বাচ্চাটা রাজুর খুব ন্যাওটা, ওর কাছেই বেশিরভাগ সময় থাকে সে।
রাজুও খুব আদর করে বাচ্চাটাকে।
একদিন সকালে বাচ্চাটাকে আর পাওয়া গেল না।
রতন সেদিন বাসায় ছিল না, মাল নিয়ে শহরে গেছে। বউ একাই ছিল ঘরে। ভোরে ঘুম ভাঙতেই দেখল বাচ্চা নেই। ঘরের দরজা খোলা। তার চিৎকারে ছুটে এল সবাই।
অনেক খোঁজাখুঁজির পর বাঁশঝাড়ের মধ্যে পাওয়া গেল। বাচ্চাটাকে। অক্ষত নয়, রক্তাক্ত মাথাটা শুধু পড়ে আছে। বন্ধ দরজা খুলে বাচ্চাটাকে বাইরে নিয়ে গেল কে, কেউ বুঝল না। আরও একবার শোকের মাতম উঠল গ্রামে।
ভূত-পিশাচ মানুষ নয় যে, তাদের অনুভূতি, বিবেক, নীতি থাকবে।
রাজু যে এখন স্বাভাবিক খাবার খায় না, সেটা কেউ খেয়াল করেনি। রাতের আঁধারে সে যায় কবরস্থানে। কবর থেকে তুলে খায় পচা লাশ। হাঁস-মুরগির কাঁচা মাংস তৃপ্তি করে পেটে পুরছে। এবং সে-ই চিবিয়ে খেয়ে নিয়েছে রতনের তুলতুলে নিষ্পাপ বাচ্চাটাকে।
রাজুর উপর ভর করেছে সেই ভয়ঙ্কর পিশাচ।
ইমাম সাহেবকে দেয়া কথা রাখার প্রয়োজন মনে করেনি, ফিরে এসেছে আবারও।
তা ছাড়া, রাজুর ওপর তার আক্রোশ ছিল।
রাজুকে তো বটেই, পুরো গ্রামকে সে ধ্বংস করবে।
ঠিক করেছে এরপর শেষ করবে ইমাম সাহেবকে।
এক সকালে দেখা গেল, তার ঘরে মরে পড়ে আছেন। ইমাম সাহেব।
কোনও এক অসতর্ক মুহূর্তে পিশাচটা মেরে ফেলেছে। তাঁকে।
গ্রামবাসী জানে না, তাদের জন্য অপেক্ষা করছে কী ভয়ঙ্কর বিপদ।
মসজিদে ইমাম সাহেব না থাকলে কি চলে?
নতুন ইমাম সাহেবের জন্য আহ্বান করা হয়েছে।
গ্রামবাসী তারই অপেক্ষা করছে।
ভয়াবহ অশুভ থেকে গ্রামকে রক্ষা করতে পারবেন নতুন ইমাম সাহেব?
পঞ্চবক্র তান্ত্রিক – আফজাল হোসেন
এক
ঝড়-বৃষ্টির রাত।
জয়নাল হ্যারিকেনের আলোতে বই পড়ছে। তাদের গ্রামে এখনও ইলেকট্রিসিটি এসে পৌঁছয়নি। প্রায় দশ বছর আগে ইলেকট্রিক লাইন টানার খুঁটি পোঁতা হয়েছিল। খুঁটি পোঁতা পর্যন্তই, লাইন টানা আর হয়ে ওঠেনি। গ্রামের মানুষ অপেক্ষায় আছে নিশ্চয়ই কোনও এক দিন খুঁটিতে লাইন টানা হবে, আর তারাও আলোর মুখ দেখতে পাবে।
