পুরো এক মিনিট হাততালি চলল। বুহের তার বাম পাশে দাঁড়ানো পুলিশদের জনতার সাথে তাল মিলিয়ে হাততালি দিতে দেখে অবাক হলো।
‘একটা পতিত জমির জন্যে রাজনৈতিক তর্ক-বিতর্কের কি মানে আছে?’ জিজ্ঞেস করলেন বিকহ্যাম।
‘কোন মানে নেই,’ গর্জে উঠল জনতা।
‘যে গ্রহ ধ্বংস হয়ে যাচ্ছে তার জন্যে বিকল্প সমাজ ব্যবস্থার কথা বলার কতটুকু দরকার আছে?’
আবার গর্জে উঠল জনতা: কোন দরকার নেই।
বুড়ো মানুষটি দুই হাত ওপরে তুললেন, গলার বেল্টে টান পড়ায় উঠে দাঁড়াল কুকুরটা।
‘আপনারা অনেকেই জানেন,’ বললেন বিকহ্যাম, ‘আমি ধর্মভীরু নই। তবু টিমোথিকে বলা পলের দ্বিতীয় চিঠি থেকে কিছু অংশ উদ্ধৃতি করে শোনাচ্ছি,’ আবার গলা খাঁকারি দিলেন তিনি। কুকুরটা তাকাল ভিড়ের দিকে, একটা থাবা দিয়ে প্ল্যাটফর্মে আঁচড় কাটছে।
বুহের লক্ষ করল ছেলেটা এবার ল্যাব্রাডরটার দিকে নজর ফিরিয়েছে, চোখের পলক পড়ছে না।
‘কেয়ামতের দিন,’ শুরু করলেন বিকহ্যাম, ‘ভয়ঙ্কর এক সময় উপস্থিত হইবে। মানুষ হইয়া উঠিবে অহঙ্কারী, অর্থ লোলুপ, ঈশ্বর-নিন্দুক, অকৃতজ্ঞ, পিতা-মাতার অবাধ্য, অপবিত্র, আত্মসংযমহীন, অসচ্চরিত্র, দয়া-মায়াহীন, শাস্তি ভঙ্গকারী, ক্রোধোন্মত্ত, বিশ্বাসঘাতক, সমস্ত ভালর নিন্দাকারী।’
ল্যাব্রাডর এবার পেছনের পায়ে ভর করে দাঁড়াল, সামনের থাবা দুটো আড়াআড়ি রাখল মুখের ওপর, নাক উঁচু করে বাতাসে কিসের যেন গন্ধ শুঁকল। বুহেরের মনে হলো ওটা সরাসরি ছেলেটার দিকে তাকাল।
‘আমি আপনাদের আহ্বান করছি যাদের মনে বিশ্বাস আছে তারা ঈশ্বরের কাছে প্রার্থনা করুন,’ বললেন বিকহ্যাম। ‘আর যাদের বিশ্বাস নেই তারা নিজেদের বিবেক ও বুদ্ধিমত্তার ওপর ভরসা রাখুন।’
পলকহীন চোখে ল্যাব্রাডরের দিকে চেয়ে আছে ছেলেটা। প্ল্যাটফর্মে আঁচড় কাটছে ওটা, মুখ বেয়ে লালা পড়ছে। পর্দায় দেখতে পাচ্ছে ওটাকে জনতা।
‘আমার থীম,’ বলে চললেন বৃদ্ধ, ‘নতুন কিছু নয়। কিন্তু বর্তমান পরিস্থিতিতে…’
লাফ দিল ল্যাব্রাডর, প্রভুর মুখে কামড় বসাল। হোঁচট খেয়ে পেছন দিকে হেলে গেলেন তিনি, মাইক্রোফোনের তার বেঁধে গেল পায়ে, তাঁর পতন-চিৎকার অ্যামপ্লিফায়ারে প্রতিধ্বনি তুলল স্কোয়ারে। কেউ এক চুল নড়ছে না। প্ল্যাটফর্মের পাশে দাঁড়ানো ভলান্টিয়াররা যে যার জায়গায় জমে গেল, নড়তে ভুলে গেছে।
পিছিয়ে এল কুকুরটা, বিকহ্যাম টলমল পায়ে উঠে দাঁড়াবার চেষ্টা করছেন, কুকুর-বাঁধা রশি বা বেল্টটা এখনও তাঁর কব্জিতে বাঁধা।
‘ওহ্, মাই গড,’ ফুঁপিয়ে উঠলেন তিনি, গোঙানির শব্দ ছড়িয়ে পড়ল জনারণ্যে। এক হাতে মুখ চাপা দিলেন বিকহ্যাম। কাছের লোকজন পরিষ্কার দেখতে পেল তাঁর আঙুলের ফাঁক দিয়ে গড়িয়ে পড়ছে রক্ত। টেলিভিশন পরিচালক চট করে ক্লোজ-আপে ধরল মুখটা, জনতা বিকহ্যামের রক্তাক্ত চেহারা পর্দায় দেখে শিউরে উঠল। চশমাটা ঝুলে আছে এক কানের ওপর, চোখের শূন্য কোটর রক্তাক্ত হাতে চেপে ধরে আছেন তিনি। ভলান্টিয়াররা এবার ছুটল তাঁর দিকে; কুকুরটা ঘুরে দেখল তাদেরকে, তারপর ফিরল ভিড়ের দিকে, এগোল প্ল্যাটফর্মের শেষ মাথায়, বুড়ো মানুষটাকে পেছনে টানতে টানতে।
কুকুরটার মতলব বুঝতে পেরে চিৎকার দিল এক মহিলা। ঠিক সেই সময় শূন্যে লাফ দিল ল্যাব্রাডর জ্যাক বিকহ্যামকে নিয়ে। বাতাস খামচালেন বৃদ্ধ বৃথা অবলম্বনের আশায়। ডিগবাজি খেয়ে পড়ে যাচ্ছেন, ক্যামেরা অনুসরণ করল তাঁকে, মাইক্রোফোনে ধরা পড়ল তাঁর অন্তিম চিৎকার, সাউন্ড সিস্টেম নিখুঁতভাবে কাজ করল, বিশ ফুট নিচে কুকুরটা ছিটকে পড়ল; তার হাড় ভাঙার আওয়াজ সেই সাথে জ্যাক বিকহ্যামের খুলি ফেটে যাবার শব্দও স্পষ্ট শোনা গেল। তাঁর মরণ আর্তনাদ শুনে গায়ের রোম খাড়া হয়ে গেল সবার।
ছুটে আসা ভলান্টিয়ারদের চিৎকারও শোনা গেল মাইক্রোফোনে। বিস্ময়ে স্তম্ভিত জনতার বিড়বিড়ানিও পরিষ্কার তুলে ধরল মাইক্রোফোন। ওটার তার প্ল্যাটফর্মের মাথায় ঝুলে আছে।
সবার আগে প্রতিক্রিয়া ঘটল ছেলেটার মধ্যে। ঘুরল সে, তাকাল ত্রিশ গজ দূরে চেস্টনাট পুলিশ-ঘোড়ার দিকে। ওদিকে দু’ভাগে বিভক্ত হয়ে মোট দশজন অশ্বারোহী পুলিশ দাঁড়িয়ে ছিল হোয়াইট হল-এ যাবার রাস্তা পরিষ্কার রাখতে। মাথা ঘোরাল ঘোড়া, আরোহী তার আকস্মিক চাঞ্চল্যে অবাক হলো। বলগা ধরে টান দিল সে। কিন্তু ঘোড়াটা চোখ বড় বড় করে তাকিয়েই থাকল ছেলেটার দিকে। ওটার নাকের পাটা ফুলে উঠেছে, ঠোঁট কাঁপছে, বেরিয়ে পড়ল দাঁত, মৃদু গোঙানি বেরিয়ে এল গলা দিয়ে। শব্দ শুনে অন্য ঘোড়াগুলো ফিরল তার দিকে। তারপর দৃষ্টি অনুসরণ করে নেলসন’স কলামে দাঁড়ানো ছেলেটার দিকে তাকাল এক সাথে।
প্রকাণ্ড ঘোড়াটা এক মুহূর্ত দাঁড়িয়ে রইল স্থির হয়ে, শুধু চোখ জোড়া বিস্ফোরিত হলো আতঙ্কে, তারপর পেছনের পায়ে ভর দিয়ে খাড়া হলো, ঝাঁকি খেল মাথা, পরক্ষণে সবেগে সামনের দিকে ছুটল দলের অন্যান্য সদস্যদের নিয়ে। ঝাঁকির চোটে তিন পুলিশ পড়ে গেল ঘোড়ার পিঠ থেকে, অন্যরা কোনমতে ঝুলে রইল বলগা ধরে। বলগায় টান মেরেও ঘোড়াগুলোকে থামাতে সম্পূর্ণ ব্যর্থ হলো তারা। ব্যানার হাতে এক তরুণ দম্পতি হঠাৎ খেপে ওঠা ঘোড়াদের শিকার হলো প্রথমে। বিশালদেহী চেস্টনাটের খুরের নিচে পড়ে নিমিষে রক্তাক্ত হয়ে গেল তারা। তাদের আর্তনাদ শোনা গেল অ্যামপ্লিফায়ারে।
