আরোহীবিহীন ঘোড়াগুলো ভিড়ের মাঝে আরও সেঁধিয়ে গেল। বাকিগুলো ভয়ে এবং মৃত্যুর গন্ধ পেয়ে আক্ষরিক অর্থেই উন্মাদ হয়ে উঠল। কলামের সাথে সেঁটে গেল বুহের একটা ঘোড়াকে তার দিকে ছুটে আসতে দেখে। ওটার পায়ের নিচে চাপা পড়ে যাচ্ছে পুরুষ আর নারীরা। হঠাৎ দাঁড়িয়ে পড়ল ঘোড়াটা, ঘুরল, এক লাফে পার হলো একটা ব্যারিয়ার, ছুটল এক দল তরুণকে লক্ষ্য করে। চারটে খুরের আওয়াজ যেন বুলেটের শব্দ তুলল কংক্রিটের রাস্তায়।
ঘোড়াগুলোর হামলায় দিশেহারা লোকজন দিগ্বিদিক শূন্য হয়ে ছোটাছুটি করছে। ধাক্কাধাক্কিতে অনেকেই ছিটকে পড়ছে রাস্তার ওপর, তাদেরকে পায়ে মাড়িয়ে অন্যরা ছুটছে। চিৎকার-চেঁচামেচি-কান্নায় নরক হয়ে উঠল জায়গাটা। বুহের দেখল একটা ঘোড়া তার আরোহীকে পিঠ ঝাঁকিয়ে দড়াম করে ফেলে দিল। কাঁধে কার যেন হাতের কঠিন চাপ অনুভব করে ঘুরল সে। ছেলেটা। তার কাঁধে হাত রেখে নারকীয় দৃশ্যটা দেখছে। জ্বলজ্বল করছে চোখ, জিভ বোলাচ্ছে ঠোঁটে।
ক্যামেরা আগের মতই কাজ করে চলেছে। বিশাল পর্দায় রাস্তার নারকীয় দৃশ্য পরিষ্কার দেখা যাচ্ছে। এক মহিলা তার বাচ্চাকে নিয়ে উঠে দাঁড়াতে চেষ্টা করছে, দেখল বুহের। বাচ্চাটাকে দু’হাতে শূন্যে তুলে ধরল সে। ঠিক তখন একটা ঘোড়া ছুটে এসে বাচ্চা এবং তার মাকে শক্ত খুরের আঘাতে ছিন্নভিন্ন করে দিয়ে চলে গেল। বুহের শুনল ছেলেটা চাপা উল্লাসে বিড়বিড় করছে, বিশুদ্ধ নৈরাজ্য নেমে এসেছে পৃথিবীর বুকে।
শিউরে উঠল বুহের, পাথরের সিংহের গায়ে গা লাগিয়ে দাঁড়িয়ে থাকল।
লোকজনের চিৎকার আর আর্তনাদ ক্রমে চড়া হয়ে উঠল, তারপর হঠাৎ করেই থেমে গেল। যেন কেউ পর্দায় ফ্রিজ করে দিয়েছে দৃশ্যটা, নড়াচড়া বন্ধ হয়ে গেছে। স্কোয়ারের দক্ষিণ-পুব কোণে, হোয়াইট হলের সেফটি ব্যারিয়ার ভেঙে সবাই ওদিকে সরে গেছে, পেছনে ফেলে রেখে গেছে আহতদের। স্কোয়ার প্রায় ফাঁকা। শুধু নিহতদের লাশ আর আহতরা পড়ে আছে রাস্তায়। তারা যন্ত্রণায় গোঙাচ্ছে, কাঁদছে।
কলাম বা খিলানের নিচ থেকে বেরিয়ে এল পল বুহের। তার সামনে, কয়েক গজ দূরে একটা ঘোড়া মরে পড়ে আছে, নিচে তার আরোহীর বিধ্বস্ত লাশ।
পাথরের সিংহগুলোর একটার বেদির নিচে স্তূপ হয়ে আছে আরও কতগুলো লাশ। ছুটন্ত মানুষের পায়ের নিচে পড়ে ভর্তা হয়ে গেছে তারা। ইতিমধ্যে এসে . পড়েছে অ্যাম্বুলেন্স। তারা লাশ সরাচ্ছে, গাড়িতে তুলছে আহতদের। সাংবাদিকরা ছবি তুলছেন।
কঙ্কালের জামা পরা এক তরুণকে দেখা গেল নিশ্চল পড়ে আছে। বুকের পাঁজর ভেঙে বেরিয়ে গেছে তার। আরেকটা ঘোড়া একাকী ঘুরে বেড়াচ্ছিল লাশের দঙ্গলের মাঝে। আহতরা ঘোড়াটাকে দেখে আতঙ্কিত হয়ে পড়ল। ভয়ের চোটে কান্না থেমে গেল অনেকের।
ছেলেটা খিলান থেকে লাফিয়ে নামল। বুহেরের হাত ধরে জিজ্ঞেস করল, ‘আমাদের গাড়ি কোথায় থাকবে?’
মাথা নাড়ল বুহের। মনে করতে পারছে না।
ছেলেটা এক মুহূর্ত দাঁড়িয়ে রইল একগাদা লাশের পাশে, কুকুরটা তার সাথেই আছে, নাক উঁচু করে বাতাস টানল, তারপর ঘুরে দেখল বুহেরকে।
‘বেচারা শান্তি রক্ষাকারীদের আত্মা শান্তি পাক,’ মুচকি হাসল ছেলেটা। তারপর বুহেরের হাত ধরে ভিড়ের মাঝ থেকে পথ করে হাঁটা শুরু করল।
আবার অশুভ সঙ্কেত – ১৩
তেরো
জ্যাক বিকহ্যামের মৃত্যুর খবর শুনে মর্মাহত হলো ফ্রেডরিক আর্থার। বিকেলেই খবরটা পেয়েছে সে। আটত্রিশ জন মারা গেছে, শতাধিক আহত।
জ্যাক বিকহ্যামকে পছন্দ করত আর্থার। স্কুলে পড়ার সময় থেকে সে এ লোকটির ভক্ত। বয়স বাড়ার সাথে সাথে লোকটির প্রতি শ্রদ্ধাও বেড়ে যাচ্ছিল আর্থারের। অনেকেই বিকহ্যামের সমালোচনা করত। দু’বার মানুষটার সাথে দেখা হয়েছে আর্থারের। তাঁর রসবোধ এবং বিশ্ব রাজনীতি সম্পর্কে অগাধ জ্ঞান মুগ্ধ করেছে তাকে। অনেকে বিকহ্যামকে সোভিয়েত চর বলতেও দ্বিধা করেনি। কিন্তু তাঁকে তাঁর অবস্থান থেকে এক চুল নড়াতে পারেনি। আর্থারের কাছে বিকহ্যাম ছিলেন সন্ন্যাসীর মত। সূক্ষ্ম রসবোধ সম্পন্ন মজার মানুষ।
রাতে স্টাডি রুমে বসে টেপ করা টিভি নিউজ দেখছিল আর্থার। সন্ধ্যার খবরে করুণ ঘটনাটা সম্পর্কে বিস্তারিত বলা হয়েছে। কুকুরটা বিকহ্যামের গায়ে ঝাঁপিয়ে পড়ছে, বুড়ো মানুষটা ডিগবাজি খেয়ে পড়ে যাচ্ছেন প্ল্যাটফর্ম থেকে, এই দৃশ্যে চোখ বুজে ফেলল আর্থার।
ঘোড়াগুলো উন্মত্ত হয়ে ওঠার দৃশ্যে খবর-পাঠক বলল, মেট্রোপলিটান পুলিশের ইতিহাসে এমন ঘটনা এই প্রথম। ঘোড়াগুলোকে এমনভাবে ট্রেনিং দেয়া, কোন অবস্থাতেই তাদের উত্তেজিত হয়ে ওঠার কথা ছিল না। তদন্তের ব্যবস্থা করা হচ্ছে কেন এ ধরনের ঘটনা ঘটল জানার জন্যে।
ভিডিও টেপটা মিনিট বিশেক দেখল আর্থার। শীলা সন্ধ্যার খবরটা তার অনুরোধে রেকর্ড করে রেখেছে। নতুন করে আবার প্রোগ্রামটা চালাল আর্থার। ভিড়টাকে কাভার করছে ক্যামেরা, একজনকে দেখে চোখ পিটপিট করল ও। নেলসন্স কলামের নিচে দাঁড়িয়ে আছে পল বুহের। কিন্তু ও ওখানে কি করছে?
টেপটা আবার চালাল আর্থার। একটা ছেলে লাফিয়ে নামছে বেদি থেকে, বুহেরের হাতটা ধরল। ক্লোজ-আপে মুখটাকে পর্দায় নিয়ে এল ও। চেনা চেনা লাগছে মুখটা। কোথায় যেন দেখেছে? হঠাৎ মনে পড়ে গেল আর্থারের… ডেমিয়েন থর্নের মুখ ওটা। এমব্যাসীতে ডেমিয়েনের যে ছবি আছে সেটার বয়স পনেরো বছর কমিয়ে দিলে ঠিক অমনই লাগবে দেখতে।
