স্কোয়ারে পৌছে দেখল জনতা গাদাগাদি করে স্থির হয়ে দাঁড়িয়ে আছে। ছেলেটা তার কুকুর সঙ্গীকে নিয়ে ভিড় ঠেলে এগুতে লাগল। অনেকেই বিরক্তি প্রকাশ করল। তবে কুকুরটাকে দেখে কেউ কেউ আড়ষ্ট হয়ে গেল। এক লোক রাস্তা ছাড়ছিল না বলে কুকুরটা বিরাট মাথা দিয়ে তাকে ঢুস দিল। রেগেমেগে কিছু বলার জন্যে নিচে তাকিয়েছে লোকটা, তাকে লক্ষ্য করে দাঁত মুখ খিঁচাল কুকুর। সভয়ে একপাশে সরে গেল লোকটা। নেলসন্স কলামের নিচে এসে দাঁড়াল তিনজনের দলটা। পাথরের একটা সিংহাসনের পাশে ঠেলেঠুলে জায়গা করে নিল। তাকাল দশ গজ দূরের প্ল্যাটফর্মের দিকে। মাটি থেকে অন্তত বিশ ফুট উঁচুতে তৈরি করা হয়েছে মঞ্চ। প্ল্যাটফর্মের দু’পাশে, পনেরো ফুট উচ্চতায় দুটি ক্লোজড সার্কিট টেলিভিশন, ক্লোজ- আপে ধরে রেখেছে এক তরুণ, জনপ্রিয় রাজনীতিবিদের মুখ। রাজনীতিবিদটি এ আন্দোলনের অন্যতম এক প্রতিষ্ঠাতার দৌহিত্র। তার কণ্ঠ স্পিকারের মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ছে গোটা স্কোয়ারে।
‘বন, প্যারিস, হেগ, রোম, দিল্লী, ঢাকা সহ আরও অনেক শহরে এই আন্দোলন একই সাথে সূচিত হতে চলেছে।’
জনতা সায় দিল তার কথায় গর্জে উঠে
‘আর পাঁচ ঘণ্টা পর ওয়াশিংটনের উদ্দেশে একটি মার্চ শুরু হবে। কাল পালা দূর প্রাচ্য এবং অস্ট্রেলিয়ার। মস্কো, প্রাগ, বুদাপেস্ট এবং ইউরোপিয়ান ইউনিয়নে আমাদের অন্যান্য বন্ধুরা আমাদের প্রচেষ্টার কথা জানতে পারবে এবং উৎসাহিত হয়ে উঠবে তাদের সংগ্রামে শক্তি সঞ্চয়ের জন্যে…
হাই তুলল বুহের।
‘এবার,’ বলল তরুণ রাজনীতিবিদ, ‘আসছেন জ্যাক বিকহ্যাম।’
জনতার উল্লসিত চিৎকারে কানে তালা লেগে গেল। কানে হাত চাপা দিল বুহের, তাকাল ছেলেটার দিকে। সে নেলসন্স কলামের সিঁড়ির ওপর উঠে বসেছে। চারদিকে চোখ বোলাচ্ছে, কাউকে খুঁজছে বোধহয়। চঞ্চল দৃষ্টি স্থির হলো সাদা চুলো, লম্বা, রোগা এক লোকের ওপর। হেঁটে যাচ্ছেন প্ল্যাটফর্মে, তাঁকে নিয়ে আসছে সোনালি রঙের একটা ল্যাব্রাডর। মাইক্রোফোনের সামনে গিয়ে দাঁড়াল কুকুরটা, যেন সুতোয় বেঁধে টেনে আনা হয়েছে তাকে। তারপর তাকাল বুড়ো লোকটির দিকে। নাক দিয়ে ধাক্কা মারল হাতে; বুড়োকে বুঝিয়ে দিল মাইকের অবস্থান। তিনি দু’হাত তুললেন জনতার উদ্দেশে, তাঁর বাম হাতে বাঁধা কুকুরটার বেল্ট।
ভিড়ের ওপর নজর বোলাল বুহের। হাততালি দিচ্ছে জনতা, চিৎকার চেঁচামেচি করছে। কেউ কেউ শিসও দিল। ডেমিয়েন থর্নের কথা মনে পড়ল বুহেরের। নিজের শিষ্যদের ওপর এরকম প্রভাব ছিল তার। তবে পার্থক্য একটাই- তার শিষ্যরা ছিল এদের চেয়ে সৎ। এই লোকগুলো জ্যাক বিকহ্যামের জন্যে জীবন দিতে পারবে? তারচে’ও বড় কথা তারা তাদের নেতার জন্যে মানুষ খুন করতে পারবে? বুহেরের সন্দেহ হলো পারবে না।
পর্দায় বুড়ো লোকটার চেহারা ফুটে উঠল। চোখে গাঢ় রঙের চশমা। মানুষটা অন্ধ। ল্যাব্রাডরটা তাঁর সার্বক্ষণিক সঙ্গী। জ্যাক বিকহ্যামকে বলা হয় বারট্রান্ড রাসেলের যোগ্য উত্তরসুরি। তিনি একজন দার্শনিক, একজন মানবতাবাদী, রাজনীতিবিদদের চেয়ে তাঁর জ্ঞান প্রখর, অসাধারণ বাগ্মীতার কারণে বুদ্ধিজীবী এবং শ্রমিক শ্রেণীকে একই ছাতের তলায় নিয়ে আসা সম্ভব হয়েছে তাঁর পক্ষে।
আবার ছেলেটার দিকে ফিরল বুহের। সে স্থির দৃষ্টিতে তাকিয়ে আছে জ্যাক বিকহ্যামের দিকে। পাথুরে স্তম্ভের ওপর বসে কুকুরটাও সম্মোহিতের মত চেয়ে রয়েছে প্ল্যাটফর্মের দিকে।
জ্যাক বিকহ্যাম হাত নামালেন। সাথে সাথে থেমে গেল জনতার চেঁচামেচি, যেন হঠাৎ সুইচ অফ করে দেয়া হয়েছে। গলা খাঁকারি দিলেন তিনি, বজ্রের মত শোনাল শব্দটা। ল্যাব্রাডর কান খাড়া করে তাকাল প্রভুর দিকে, যেন সব ঠিক আছে কি না দেখছে।
‘বন্ধুগণ,’ বৃদ্ধের কণ্ঠ গভীর এবং জোরাল। শুনেছি আজকের মত জন সমাবেশ এই শহরে আগে কোনদিন হয়নি।
জনতা আবার চিৎকার করে তাঁকে সায় দিতে যাচ্ছিল, এক হাত তুলে তাদেরকে থামালেন বিকহ্যাম।
‘এক, মহান ব্যক্তি, সাংবাদিক মেন্ডাল জনসন, যিনি আমাদের আন্দোলনের অন্যতম প্রতিষ্ঠাতা, আমাদের মত একটি প্রতিষ্ঠানের স্বপ্ন দেখেছিলেন। বলেছিলেন ঈশ্বরের কাছে প্রার্থনা করি, অক্সফ্যাম বলে কোন কিছুর যেন অস্তিত্ব না থাকে।’ বিরতি দিলেন তিনি। তারপর শুরু করলেন, ‘আমিও তাঁর কথার প্রতিধ্বনি তুলে বলতে চাই, পারমাণবিক নিরস্ত্রীকরণ আন্দোলনের যেন আর প্রয়োজন না হয়, ঈশ্বর।’
সাগরের ঢেউ’র মত গর্জন উঠল এবার, থামতেই চায় না। বিকহ্যাম ডান থেকে বামে একবার মাথা ঘোরালেন, যেন জনতার প্রতিক্রিয়া দেখতে চাইছেন।
আবার একটা হাত তুললেন তিনি। আবার নীরব হয়ে গেল জনতা।
‘আজ বিকেলে, অনুমান করি প্রায় এক মাইল লম্বা লাইন সৃষ্টি হয়েছে আপনাদের আগমনে। আপনারা এসেছেন এমন একটি সমস্যার বিরুদ্ধে প্রতিবাদ জানাতে যেটি গত পঞ্চাশ বছর ধরে গোটা বিশ্বে হুমকির সৃষ্টি করে চলেছে। ঠাণ্ডা লড়াইয়ের দিন কাগজে-কলমে শেষ হলেও পারমাণবিক অস্ত্র প্রতিযোগিতা কিন্তু থেমে নেই। অর্ধেক পৃথিবী আজও যুদ্ধের উন্মাদনায় অস্থির। কিন্তু আমাদের রাজনীতিবিদরা, আমাদের সামরিক শাসকরা তা দেখেও না দেখার ভান করছেন। আমরা রাজনীতির নামে অস্ত্র প্রতিযোগিতা, সন্ত্রাস এবং ভণ্ডামি চাই না। আমরা চাই সারল্য, জবাবদিহিতা। দলগত রাজনীতির এখন কোন প্রয়োজন নেই। এখন প্রয়োজন নিজেদেরকে, বিশ্ব মানবতাকে বাঁচানোর প্রশ্নে একত্র হওয়া। আমরা চাই অস্ত্র মুক্ত, হানাহানি মুক্ত একটি বিশ্ব।
