রাগে তালু জ্বলে গেল পল বুহেরের। মুঠো পাকিয়ে উঠে দাঁড়াল, গনগনে চোখে তাকাল ছেলেটার দিকে।
‘অন্যায় করেছ,’ বলল সে। ‘এটা…এটা…’ শব্দ হাতড়ে বেড়াল বুহের। ….এতে তোমার বাবার প্রতি অসম্মান করা হয়েছে। তোমার বাবা এত নিচে নামতে পারতেন না, এভাবে নিজের হাত নোংরা করতেন না।’ লাল টকটকে হয়ে গেছে বুহেরের চেহারা। ‘তোমার বাবা-’
ঝট করে উঠে দাঁড়াল ছেলেটা। ‘খবরদার।’ ধাক্কা মারল সে বুহেরকে, পড়ে গেল বুহের সোফার ওপর। ‘আমার কাছে আমার বাবা সম্পর্কে কোন কথা বলতে আসবেন না।’
‘তিনি কক্ষনো এমন কাজ করতে পারতেন না,’ বুহেরের রাগ কমেনি। ‘যা কিছু তিনি করেছেন প্রতিটির পেছনে কারণ ছিল। ছিল শৃঙ্খলা। তুমি ধ্বংসের কথা বলো। তোমার বাবা বলতেন নিয়ন্ত্রণ করার কথা। তিনি চেয়েছিলেন সবকিছু নিয়ন্ত্রণে এনে…’
‘যথেষ্ট হয়েছে,’ দাবড়ে উঠল ছেলেটা। ‘এখন চুপ করুন। আমি ধ্বংস চাই। আর ধ্বংসের মাঝে আছে প্রতিশোধ নেয়ার সুখ।’ হাসল সে। তারপর বেরিয়ে গেল গটগট করে।
ছেলেটার পায়ের শব্দ মিলিয়ে যাওয়া পর্যন্ত অপেক্ষা করল বুহের। তারপর হলঘরে ঢুকল, সিঁড়ি বেয়ে উঠে এল দোতলায়। ছেলেটার ঘরের সামনে দিয়ে পা টিপে টিপে এগোল। ছেলেটা ঘরেই আছে, কুকুরটার গায়ের গন্ধও পেল বুহের করিডর পার হয়ে চ্যাপেলে ঢুকল সে। এক মুহূর্ত দাঁড়িয়ে রইল চুপচাপ, তারপর লাশটার দিকে পা বাড়াল।
হাঁটু গেড়ে বসল বুহের লাশের সামনে, হাত ধরল। মনে পড়ে গেল স্কুল জীবনের কথা। এক সাথে কত খেলা করেছে দু’জনে। ‘ডেমিয়েন,’ ফিসফিস করল সে। ‘তোমার দলে যোগ দিয়েছিলাম তোমার পিতার রাজ্যে প্রবেশ করার জন্যে। আমি এতদিন বিশ্বস্ততার সাথে কাজ করে এসেছি। তোমার শরীরী জীবন ধ্বংস হলেও তোমার আত্মার উদ্দেশে যতবার প্রার্থনা করেছি, ততবার তুমি সাড়া দিয়েছ। বলেছ হতাশ না হতে। কারণ, তোমার সময় এখনও আসেনি। আমার প্রার্থনার জবাব দিয়েছ তুমি। বলেছ তোমার পুনর্জন্মের ওপর বিশ্বাস রাখতে। আবার তোমার পাশে বসার সৌভাগ্য হবে আমার, বলেছ তুমি।
‘তুমি আবার বলো, আমরা যা করেছি সব নিয়ন্ত্রণের জন্যে, ধ্বংসের জন্যে নয়। বলো ডেমিয়েন?’
লাশটাকে কুর্নিশ করল বুহের, হাঁটু গেড়ে চুপচাপ বসে রইল, যেন নির্দেশের জন্যে অপেক্ষা করছে। হঠাৎ মুখ তুলে চাইল। একটা আলোক রেখা এসে পড়েছে ডেমিয়েনের মুখে, চোখ দুটো মনে হলো ফিরে পেয়েছে জীবন। চোখ পিটপিট করল বুহের। তারপর সচকিত হয়ে উঠল মৃদু গরগর শুনে। ঘুরল। আলোটা এসেছে খোলা দরজা দিয়ে। ওখানে দাঁড়িয়ে আছে ছেলেটা, সাথে তার কুকুর। কটমট করে তাকিয়ে রইল সে বুহেরের দিকে।
‘এখানে কি করছেন?’ কণ্ঠ শান্ত আর আবেগশূন্য শোনাল।
‘পথ নির্দেশ খুঁজছি।’
‘অন্য কোথাও খুঁজুন গিয়ে। আমার বাবাকে একা থাকতে দিন।’
উঠে দাঁড়াল বুহের, হাঁটু কাঁপছে। ছেলেটা একপাশে সরে দাঁড়াল ওকে যাবার রাস্তা করে দিয়ে। যে পথে এসেছে সে দিকে ধীরে ধীরে এগোল বুহের। নিজেকে হতবুদ্ধি, পরাজিত এবং অশীতিপর বৃদ্ধ মনে হলো তার।
আবার অশুভ সঙ্কেত – ১২
বারো
শত শত, হাজারে হাজারে দল বেঁধে ওরা এল র্যালিতে যোগ দিতে। লন্ডনের পুব থেকে পশ্চিমে স্লোন স্কোয়ার পর্যন্ত জ্যাম বেঁধে গেল। অক্সফোর্ড স্ট্রীটের দক্ষিণ থেকে এমব্যাঙ্কমেন্ট এবং সবগুলোর কেন্দ্র বিন্দু, ট্রাফালগার স্কোয়ারে সব যেন স্থির হয়ে রইল। জনসভায় যোগ দিতে কত লোক এসেছে প্রেস এবং মিডিয়া দু’পক্ষই অনুধাবন করতে ব্যর্থ হয়েছে। যত দূর চোখ যায় শুধু মানুষের মাথা। স্কোয়ারের দিকে এগোচ্ছে সবাই, প্রতি মিনিটে বেড়ে চলেছে লোকসংখ্যা। ঘোড়ার পিঠে এবং রাস্তার ওপর দাঁড়িয়ে পুলিশ নীরবে দেখছে তাদেরকে।
বক্তৃতা শুরু হবার কথা দুপুর তিনটায়। কিন্তু দেড়টার সময়ই পিমলিবোতে পল বুহেরের লিমোজিন জ্যামে আটকা পড়ে গেল। ঘাড় ঘুরিয়ে দেখল পিঁপড়ের মত পিলপিল করে লোকজন তাদের গন্তব্যে চলেছে। বেশিরভাগের পরনে কঙ্কালের ছবি আঁকা আলখেল্লা, অনেকে কাফনও পরে আছে।
বুহের কনসোলের একটা বোতাম টিপল।
‘কি ব্যাপার?’
ভেসে এল ড্রাইভারের কণ্ঠ, ‘জ্যাম, স্যার। পুলিশ বলছে এখান থেকে আর গাড়ি যাবে না।’
‘ধ্যাত্তেরি, বেজায় বিরক্ত হলো বুহের। বেশি রাগ লাগছে ছেলেটার ওপর। ওর জন্যেই এই র্যালিতে আসা। মাঝে মাঝে কি যে বাই চাপে ছেলেটার মাথায়। অথচ ব্যাপারটা তাকে মানায় না। খুব কম ব্যাপারেই সে কৌতূহল প্রকাশ করে।
‘চলুন, নেমে পড়ি,’ বলল ছেলেটা।
‘কিন্তু অনেকটা পথ হাঁটতে হবে,’ আপত্তি জানাল বুহের।
ছেলেটা কিছু না বলে দরজা খুলে নেমে পড়ল। তার পিছু পিছু কুকুরটাও। অগত্যা বুহেরকেও উঠতে হলো। নামার আগে ড্রাইভারকে বলল কোথায় গাড়ি পার্ক করতে হবে। ওখানে থাকবে ওরা।
ভিড়ের সাথে তাল মিলিয়ে হাঁটতে শুরু করল ওরা। একটা জার্মান শেফার্ড ওদের আগে আগে যাচ্ছিল, হঠাৎ ঘুরে দাঁড়াল, ছেলেটা আর কুকুরটাকে দেখে বিস্ফারিত হয়ে উঠল চাউনি, দ্রুত ফুটপাথে উঠে পড়ল সে, কান দুটো সেঁটে গেছে মাথার সাথে।
খুব গরম পড়েছে। ঘামছে জনতা। ঘামের গন্ধে নাক কোঁচকাল ছেলেটা কুকুরটার মাথায় আলতো হাত রাখল। বুহের ওদের ঠিক পেছনে। বারবার ঘড়ি দেখছে সে। হোয়াইট হল-এ মীটিং শুরু হবার কথা এখন। তার কর্মচারীরা ঘণ্টাখানেকের মধ্যে রিপোর্ট পাঠিয়ে দেবে হেডকোয়ার্টারে। তার অফিসে থাকা দরকার ছিল। এ সব গোঁয়ার্তুমির কোন মানে হয় না। মুখ অন্ধকার করে সে ছেলেটার পেছন পেছন হাঁটতে লাগল। ভিক্টোরিয়া পার হয়ে, মল ধরে ট্রাফালগার স্কোয়ারের কাছাকাছি এসে পড়ল ওরা। লাউড স্পিকারের কর্কশ আওয়াজ আর জনতার চেঁচামেচি শোনা গেল পরিষ্কার। মাথার ওপর পুলিশের হেলিকপ্টার উড়ছে। রোটর ব্লেডের গর্জনে জনতার চিৎকার চাপা পড়ে যাচ্ছে মাঝে মাঝে।
