‘মানে?’ বিস্মিত দেখাল বুহেরকে। ‘আমরা তো এটাই চাই। বরাবর এরকম কৌশলই আমরা অবলম্বন করে চলেছি। ডিভাইড অ্যান্ড রুল। বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি করে অচলাবস্থা তৈরি করো এবং আবার বিশৃঙ্খলা নিয়ন্ত্রণ করো। এভাবে আমরা আমাদের অবস্থান-’
‘কিন্তু এটাকে অগ্রগতি বলে না,’ তীক্ষ্ণ শোনাল ছেলেটার কণ্ঠ।
‘কিসের অগ্রগতি?’ ক্রুদ্ধ গলায় বলল বুহের।
‘ধ্বংসের পথে, রুহেরের মুখের ওপর কাগজের তাড়াটা ছুঁড়ে মারল ছেলেটা, ঘুরে দাঁড়াল, বেরিয়ে গেল হনহন করে।
দীর্ঘশ্বাস ফেলল বুহের। ফেলে আসা দিনগুলোর কথা মনে পড়ছে। ছেলেটার বাবা কখনও এমন হেঁয়ালি করে কথা বলত না। তার সাথে কাজ করে মজা ছিল।
.
রাতে ভাল ঘুম হয়নি। আজেবাজে স্বপ্ন দেখেছে বুহের। বিছানা থেকে নেমে সোজা বাথরুমে ঢুকল। গোসল করল। চোখ এখনও ফুলে আছে। হাই তুলতে তুলতে বেরিয়ে এল বাথরুম থেকে।
ছেলেটার ঘরের সামনে দিয়ে যাওয়ার সময় টোকা দিল দরজায়। কোন সাড়া নেই। এমনকি কুকুরটার নিশ্বাসের শব্দও শোনা যাচ্ছে না। দরজা খুলল বুহের, উঁকি দিল। ছেলেটা রাতে ঘুমিয়েছে বিছানায় বোঝা গেল। বেডশীট কোঁচকানো, বালিশ মেঝের ওপর। দরজা বন্ধ করতে যাচ্ছে, এমন সময় ছবিগুলো চোখে পড়ল বুহেরের। ভুরু কুঁচকে তাকাল ওদিকে। ছবিগুলো নতুন। অন্যরকম। ভেতরে ঢুকল সে। কেট রেনল্ডসের কবরের ছবির পাশে নতুন, রঙিন ছবিগুলো। প্রথমটাতে দেখা যাচ্ছে তরুণী এক মেয়ে নগ্ন হয়ে শুয়ে আছে চ্যাপেলে, বড় বড় বাদামী চোখে মৃত মানুষের শূন্য দৃষ্টি। পরের ছবিটা ভয়ঙ্কর। মেয়েটাকে টুকরো করে ফেলা হচ্ছে। তারপরেরগুলোতে মেয়েটার কাটা অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ দেখা গেল।
দেয়ালে হেলান দিল বুহের, কাঁপছে। হাত বাড়িয়ে, ছবিগুলো ছুটিয়ে আনল, ফেলে দিল মেঝেতে। তারপর টলতে টলতে বেরিয়ে এল, বমি ঠেকিয়ে রাখতে ঢোক গিলল।
দরজা বুজিয়ে দিল বুহের, করিডর ধরে এগোল। নিজেকে শান্ত রাখার প্রাণপণ চেষ্টা করছে। চ্যাপেলের দরজায় দাঁড়িয়ে ছিল কুকুরটা, ওকে দেখে মুখ তুলে চাইল। দরজায় টোকা দিল বুহের। সাড়া নেই। আস্তে দরজা খুলল সে, ভেতরে ঢুকল। ছেলেটা চেয়ে আছে তার দিকে রাগ নিয়ে। ঘাম গড়াচ্ছে মুখ বেয়ে।
ভয় পাচ্ছিল বুহের এ ঘরে ঢুকে ভয়ানক কিছু একটা দেখতে হবে ভেবে। কিন্তু অশ্লীল বা বীভৎস কোন দৃশ্য চোখে পড়ল না।
‘পল,’ কুকুরটার মত ঘেউ করে উঠল ছেলেটা।
প্রভুভক্ত ভৃত্যের মত পিছিয়ে যেতে শুরু করল বুহের।
‘চলে যান।’
তাই করল বুহের। বেরিয়ে এল সে। বন্ধ করে দিল দরজা।
ড্রইংরুমে এসে গ্লাসে মদ ঢালল পল বুহের। ঢকঢক করে গিলে ফেলল। তারপর বেল বাজাল। বুড়ো টম ঢুকল ঘরে, মাথাটা একদিকে হেলিয়ে আছে, স্প্যানিয়েলের মত।
‘এখানে কেউ এসেছিল, টম? কোন তরুণী মেয়ে?’
ইতস্তত করছে বুড়ো জবাব দিতে। তারপর বলল, ‘একটা গাড়ি, স্যার। ছোট সাহেব বললেন গাড়িটা কোথাও ফেলে দিয়ে আসতে। আমি তাই করেছি। তবে আমার মনে হয় গাড়িটা কোন মেয়ের হবে।’
‘আমাকে কথাটা বলোনি কেন? অস্বাভাবিক কিছু ঘটলে আমাকে জানাবার কথা, না?’
‘ছোট সাহেব আমাকে নিষেধ করেছিলেন বলতে। বলেছিলেন তাঁর হুকুম মেনে চলেছি কিনা তিনি তা ঠিক জেনে যাবেন।’ বিরতি দিল বুড়ো। তারপর ‘কি আর করা ভঙ্গিতে কাঁধ ঝাঁকাল। ‘আপনাকে যে কথাটা বলেছি উনি ঠিক জেনে যাবেন। কারণ ওনার কাছে কিছুই গোপন থাকে না।’
‘তবে,’ হাসল সে বুহেরের দিকে তাকিয়ে। ‘আমি বেশিদিন আর বাঁচব না। সব সময় বিশ্বস্ততার সাথে কাজ করে এসেছি। এটুকু আশা অন্তত করতে পারি এজন্যে কঠিন কোন শাস্তি তিনি আমাকে দেবেন না।
বুহেরও হাসল। ‘আমারও তাই ধারণা।’
অপেক্ষা করছে বুহের ছেলেটার জন্যে। তাকিয়ে আছে লন আর জঙ্গলের দিকে। জায়গাটা আশ্চর্য শান্ত। স্থির। কিছু নড়ছে না। এমনকি বাতাসও থম্ মেরে আছে। এখানে বসে থাকতে ইচ্ছে করছে না বুহেরের। চলে যেতে ইচ্ছে করছে।
নিজের ভাবনায় বুঁদ ছিল বলে টের পায়নি কখন ছেলেটা ঘরে ঢুকেছে। বুহেরের নাম ধরে ডাকল ছেলেটা। ঘুরল বুহের। ছেলেটার চোখ থেকে বুনো চাউনি অদৃশ্য তবে চেহারায় ক্লান্তির ছাপ স্পষ্ট।
‘তুমি অসুস্থ নাকি?’ জিজ্ঞেস করল বুহের।
মাথা নাড়ল ছেলেটা। ‘না। আমি তাকে নিয়ে দুশ্চিন্তায় আছি। তার উপস্থিতি অনুভব করতে পারছি সবখানে। তার প্রভাব। তার শক্তি। চেয়ারে বসল সে, দীর্ঘশ্বাস ফেলল। বুহের ভাবল দু’একটা সান্ত্বনা বাক্য শোনাবে ছেলেটাকে। হঠাৎ একটা কথা মনে পড়ে গেল। বলল, ‘ছোট্ট একটা সমস্যা হয়েছে।’
ছেলেটা তাকাল তার দিকে।
‘ফ্রেডরিক আর্থারের কথা বোধহয় তোমাকে বলেছি। মনে হচ্ছে সে-’
‘ওকে নিয়ে ভাবতে হবে না,’ মৃদু গলায় বলল ছেলেটা। ‘সে নিজেই নিজেকে ধ্বংস করবে।’
সায় দেয়ার ভঙ্গিতে মাথা দোলাল বুহের। ব্যাপারটা আগেই বোঝা উচিত ছিল। যখনই বিপদে পড়েছে বুহের, ছেলেটা আগে ভাগে জেনে গেছে এবং বুহেরকে রক্ষা ‘ করেছে।
‘ভাল কথা,’ বলল বুহের। ‘মেয়েটা কে? তোমার ঘরের দেয়ালে যার ছবি দেখলাম?’
শ্রাগ করল ছেলেটা। ‘সে ওকে পাঠিয়েছিল। ছলনাময়ী।’
‘লাশটার কি করেছ? বাকি অংশ?’
‘কাটা ছেঁড়া করেছি,’ হাসছে ছেলেটা। ‘তারপর ফেলে দিয়েছি।’ বংশগত অভ্যাস।
