পরদিন সকালে আগে ভাগে অফিসে গেল ফ্রেডরিক আর্থার। তবে কাজে তেমন মন দিতে পারল না। আগের রাতে ভয়ানক এক দুঃস্বপ্ন দেখেছে। ওটা তার মগজ যেন কুড়ে কুড়ে খাচ্ছে।
সারাটা সকাল তার গেল কাজের ভান করে, কয়েকটা ফোন করে আর কারণে- অকারণে সেক্রেটারিকে ধমকে। দুপুরে লাঞ্চ করল পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের তরুণ এক ডিপ্লোম্যাটের সাথে। আসন্ন মীটিং নিয়ে কথা বলল দু’জনে। আসলে কথা বলল তরুণ, আর্থার শুধু হুঁ হাঁ করে গেল।
ডেস্কে ফিরে প্যাকেজটার কথা আবার মনে পড় গেল আর্থারের। স্টাডিরুমে তালা মেরে রেখেছে ওটা। হঠাৎ একটা নাম ঝিলিক দিল মনে। ইন্টারকমের সুইচ টিপল আর্থার।
‘মার্টিন কেইডিনকে দাও।’
এক মুহূর্ত পর চীফ প্রেস অ্যাটাচের কণ্ঠ ভেসে এল।
‘মার্টিন, শ্যারন ফেয়ারচাইল্ড নামে একটা মেয়ে কিছুদিন আগে আমার ইন্টারভ্যু নিতে চেয়েছিল না?’
‘এক মিনিট স্যার,’ চীফ প্রেস অ্যাটাচে দ্রুত তার ফাইল দেখল। তারপর বলল, ‘জ্বী, স্যার। মেয়েটা ড্যাগার, ছোরা ইত্যাদি নিয়ে কথা বলতে চেয়েছিল।’
‘ওকে জানাও আমি ইন্টারভ্যু দেব।’
‘কিন্তু, স্যার। মেয়েটা এমন বিশেষ কেউ নয় যে-’
‘ওর সাথে যোগাযোগ করো।’
‘আপনি যা বলবেন, স্যার।’
চেয়ারে গা এলিয়ে দিল আর্থার। কিছুক্ষণ পর বেজে উঠল ইন্টারকম।
‘কেইডিন বলছি, স্যার। আপনার রিপোর্টারের কোন হদিশ পাওয়া যাচ্ছে না। হঠাৎ যেন হাওয়ায় মিলিয়ে গেছে। আপনার সাথে যেদিন দেখা করতে চেয়েছিল সেদিন থেকে সে নিখোঁজ।’
‘ওহ্, ক্রাইস্ট,’ বলে চেয়ারে এলিয়ে পড়ল আর্থার।
‘এনিথিং রং, স্যার।
‘না, ঠিক আছে।’
‘আমি কি ইন্টারভ্যুর বিষয়টা ফাইলে তুলে রাখব? আবার যদি মেয়েটা আসে…’
‘রাখো। তবে আমার মনে হয় না…’ ম্লান, অস্পষ্ট শোনাল আর্থারের কণ্ঠ।
‘স্যার?’
‘হ্যাঁ, ফাইল করো।’
আরও একজন, ভাবল আর্থার। কড় গুনতে লাগল:
রেনল্ডস, সিনথিয়া, ডি কার্লো, ওয়াল্টার, ডুলান আর এখন শ্যারন, এরা প্রায় সবাই মারা গেছে, দু’একজনের খোঁজ পাওয়া যাচ্ছে না। হয়তো নিখোঁজ মেয়েটাও মরে গেছে।
বেঁচে আছেন শুধু ডি কার্লো। আর্থারের ধারণা উনি একটা পাগল। সত্যি কি তাই?
আবার ইন্টারকম বেজে উঠল। সেক্রেটারি জানাল স্টেট ডিপার্টমেন্ট থেকে ফোন এসেছে। ফোন করেছে বিল ওয়ালেস, আর্থারের ঘনিষ্ঠ বন্ধু। স্টেট ডিপার্টমেন্ট মূলত সে-ই চালায়। পররাষ্ট্র সচিবের মীটিং নিয়ে কথা বলল বিল।
‘চোখ-কান খোলা রাখতে হবে তোমাকে,’ বলল বিল।
‘ওই কাজের জন্যেই আমাকে বেতন দেয়া হয়।’
‘ভাল কথা, আর্থার। দেখলাম আগামী মাসে তুমি ছুটি চেয়েছ। আমি দুঃখিত, ভাই। তবে মনে হয় ছুটিটা তোমার ক্যান্সেল করতে হবে। জানোই তো, সময়টা খুব খারাপ যাচ্ছে।’
‘ঠিক আছে। অসুবিধে নেই।’
‘পরের ফল-এ ছুটি নিয়ো।’
‘বললাম তো অসুবিধে নেই।’ ফোন রাখতে যাচ্ছিল আর্থার, হঠাৎ একটা কথা মনে পড়ে গেল। বিল লোক ভাল। ওকে এরকম অনুরোধ করা যায়।
‘বিল, সরকারী এক কর্মকর্তার নতুন করে কবর খোঁড়া যাবে?’
‘নির্ভর করছে লোকটা কে তার ওপর।’
‘ডেমিয়েন থর্ন।’
‘কি! তোমার হলোটা কি, আর্থার?’
‘থর্নের লাশ কবরে আছে কিনা দেখার উপায় কি বলো?’
‘জেসাস, আর্থার।’
‘জানি পাগলের মত শোনাচ্ছে কথাগুলো। কিন্তু কাজটা করা সম্ভব?’
‘জানি না।’
‘তুমি পারবে কি না বলো।’
‘পারব হয়তো। কিন্তু কেন বলো তো?’
‘বলতে পারি যদি কথা দাও কথাটা গোপন রাখবে।’
কলেজ জীবনের মত অট্টহাসিতে ফেটে পড়ল দুই বন্ধু। হাসতে হাসতে ফোন রেখে দিল আর্থার। এখন ভাল লাগতে শুরু করেছে ওর। যেন কারও বোঝার খানিকটা ভার বইতে পেরে সন্তুষ্ট।
ওয়াশিংটনে, বিল ওয়ালেস তার সেক্রেটারিকে ডেকে বলল, ‘থর্ন কর্পোরেশনে ফোন লাগাও। জলদি।’
আবার অশুভ সঙ্কেত – ১১
এগারো
মাঝরাতে পেরিফোর্ডে এসে পৌছল পল বুহের। লিমোজিনের দরজা খুলে নামল। দোরগোড়ায় বাটলার টম, আগের মত হাসি মুখে দাঁড়িয়ে আছে।
‘কেমন আছ, টম?’ কোটটা তার হাতে তুলে দিল বুহের।
‘ভাল, স্যার।’ জবাব দিল টম। তবে চেহারা দেখে মনে হলো না ভাল আছে।
‘সত্যি ভাল আছ?’
‘অবশ্যই, স্যার।’ টমের চেহারা সামান্য লালচে হয়ে উঠল, বুহেরকে নিয়ে গেল ড্রইংরুমে। ‘উনি চলে আসবেন এখুনি।’
‘এখনও জেগে আছে?’
‘জ্বী। আপনার জন্যে অপেক্ষা করছেন।’ চলে গেল টম।
সোফায় হাত-পা ছড়িয়ে বসে চোখ বুজল পল বুহের। উড়োজাহাজ ভ্রমণ ওকে বরাবরই ক্লান্ত করে দেয়। আর আটলান্টিক পার হতে সময়ও লাগে প্রচুর। তবু এতদূর ছুটে এসেছে ছেলেটাকে মীটিং-এর রিপোর্ট দিতে।
চোখ মেলল বুহের। ছেলেটা দাঁড়িয়ে আছে পাশে, কৌতূহলী চোখে দেখছে তাকে।
‘আপনাকে বিধ্বস্ত লাগছে,’ বলল ছেলেটা।
‘বয়স, বন্ধু, সবাইকেই শেষ পর্যন্ত কাবু করে ফেলে।’
‘হুম,’ বুহেরের মন্তব্যকে সমর্থন করল কিনা বোঝা গেল না।
‘মীটিং নিয়ে কথা বলতে পারবেন নাকি…’
‘অবশ্যই পারব,’ উঠে বসল বুহের, ব্রীফকেস খুলে একতাড়া কাগজ ধরিয়ে দিল ছেলেটাকে। মনোযোগ দিয়ে রিপোর্ট পড়ল সে, তারপর তাকাল বুহেরের দিকে।
‘ইহুদ বারাক তাহলে সমঝোতায় আসতে চাইছে না?’
মাথা ঝাঁকাল বহের।
‘তার মানে মীটিং স্থগিত?’
‘হ্যাঁ।’
‘কিন্তু এতে তো আমাদের অবস্থানের কোন পরিবর্তন হবে না।’ স্পষ্ট বিরক্তি ছেলেটির কণ্ঠে।
