কোথাও ভাল খবর নেই, শুধুই দুঃসংবাদ। অসংখ্য সমস্যা চারদিকে, কোন সমাধান নেই। গ্রসভেনর স্কোয়ারে তাকাল আর্থার। একদল বিক্ষোভকারী হাতে প্ল্যাকার্ড নিয়ে বৃত্তাকারে মিছিল করছে। প্রতিদিনই কেউ না কেউ বিক্ষোভ করে চলেছে। স্কোয়ারটাকে কখনও ফাঁকা দেখেছে কিনা মনে করতে পারল না আর্থার।
এবারের বিক্ষোভকারীদের পরনে কালো আলখেল্লা, তাতে নরকঙ্কালের ছবি আঁকা। ওদের দিকে চোখ ফেরাতে একজন ঘুরে দাঁড়াল। কঙ্কালটা যেন সরাসরি তাকাল আর্থারের দিকে। শ’খানেক গজ দূরে এক লোক ঘুষি পাকিয়ে দেখাল আর্থারকে।
ফোঁস করে আবার দীর্ঘশ্বাস ফেলল আর্থার, সরে এল জানালার সামনে থেকে। চিৎকার-চেঁচামেচি শুনে শুনে সে অসুস্থ বোধ করছে। ভাল কিছু শুনতে চায় সে। কিন্তু সে আশা বৃথা।
ডায়েরী দেখল আর্থার: হিলটনে অ্যাংলো-আমেরিকান ট্রেড অ্যাসোসিয়েশনের সাথে ককটেল পার্টি আছে। পার্টি তাড়াতাড়ি শেষ হলে সে রাত ন’টার মধ্যে বাড়ি ফিরে ডিনার করতে পারবে।
বাথরুমে ঢুকল আর্থার, শাওয়ার কার্টেন টেনে দিল, হতাশ ভাবটা দূর করে দিতে চাইছে জোর করে। চিন্তা করছে ব্যবসায়ীদের কি ভাষণ দেবে। তবে প্রথাগত বক্তৃতা দিতে হবে না। কিভাবে বিশেষ সম্পর্কের খাতিরে শান্তির সাথে ব্যবসা-বাণিজ্য চালানো যায় তা নিয়ে দু’একটা কথা বললেই চলবে।
.
কনফারেন্স রুম সাজানো হয়েছে আমেরিকান এবং ব্রিটিশ পতাকা দিয়ে। আধঘণ্টা গেল সবার সাথে পরিচয় হবার সুবাদে হ্যান্ডশেক করে। তারপর একটা সময় কৌশলে ভিড় থেকে নিজেকে বিচ্ছিন্ন করে ফেলল ফ্রেডরিক আর্থার। একা মদের গ্লাসে চুমুক দিচ্ছে, টের পেল কেউ পেছনে এসে দাঁড়িয়েছে। ঘুরল আর্থার, দেখল বেঁটেখাট এক লোক, নার্ভাস ভঙ্গিতে হাত বাড়িয়ে দিয়েছে ওর দিকে।
‘মি. অ্যামব্যাসাডর, আমি নিকোলাস ওয়াল্টার। এক মিনিট কথা বলতে পারি আপনার সাথে?’ লোকটার উচ্চারণ ইলিনয়ের মানুষদের মত, ধরে ফেলল আর্থার। লক্ষ করল এর বুকে ব্যবসায়ীদের মত ল্যাপেল ব্যাজ নেই।
আর্থারের মনের কথা যেন বুঝে ফেলল ওয়াল্টার। ক্ষমাপ্রার্থনার সুরে বলল, ‘আমি এ প্রতিষ্ঠানের সদস্য নই। আমি এখানে আসতে পারতাম না। আমার এক বন্ধুর বন্ধু আমাকে নিয়ে এসেছে।’ আর্থারের কপালে ভাঁজ পড়ল। ‘আপনার সিকিউরিটি আমাকে চেক করেছে,’ বলে চলল ওয়াল্টার। ‘আমি একজন ইতিহাসবিদ, সেই সাথে অ্যান্টিকস ডিলারও। শিকাগোতে থাকি।’
‘আচ্ছা,’ বলল আর্থার।
‘আপনার সাথে সাক্ষাৎ করার সুযোগ খুঁজছিলাম। কিন্তু আপনার অফিস আমাকে সে অনুমতি দেয়নি।’
‘আমি দুঃখিত, মি. ওয়াল্টার। কিন্তু সবার সাথে যদি আমাকে দেখা করতে—’
‘তা সম্ভব নয় আমি জানি। কিন্তু আমি আপনার সময় নষ্ট করব না,’ রাষ্ট্রদূতের হাত ধরে দেয়ালের এক কোণে নিয়ে গেল ওয়াল্টার। ‘আমাকে একটা প্যাকেজ দেয়া হয়েছে আপনার জন্যে। আমি ওটা আপনার বাসায় রেখে এসেছি। আমার অনুরোধ, আপনি ওটা খুলে পড়ন।
‘আচ্ছা, হাই উঠছিল আর্থারের, মুখে হাত চাপা দিয়ে ঠেকাল। ‘দয়া করে সবগুলো লেখাই পড়বেন। ফালতু বলে ফেলে দেবেন না প্লীজ।’
ভুরু কুঁচকে উঠল আর্থারের। ঠিক এরকম সুরে কে যেন ওর সাথে কথা বলছিল এর আগে?
‘যা পড়বেন বেশিরভাগই হয়তো পাগলামি বলে মনে হবে। তবে আমি এটুকুই বলব এর সাথে যে দু’জন জড়িত ছিল-বিরতি দিল ওয়াল্টার, তারপর শান্ত গলায় শেষ করল-’এদের একজন, আমার প্রীস্ট মারা গেছেন।’
‘আচ্ছা, বুঝলাম…’ আর্থার চলে যেতে চাইল, ওয়াল্টার ছাড়ল না হাত।
‘আমার প্রীস্ট আবিষ্কার করেছে, মি. আর্থার, আপনার এক পূর্বসুরির লাশ তার কবরে নেই।’
হাসল আর্থার, আবার ছাড়িয়ে নিতে চাইল হাত। আর সেই পূর্বসুরি হলো ডেমিয়েন থর্ন,’ ফিসফিস করল ওয়াল্টার।
আর্থার টান মেরে হাত ছাড়িয়ে নিল।
‘নিজেকে প্রশ্ন করুন, ডেমিয়েন থর্নের কফিনে লাশের বদলে পাথর পোরা কেন।’
ঘুরে দাঁড়াল আর্থার, তার পেছন পেছন চলল ওয়াল্টার। ‘আমি পাগল বা উন্মাদ নই, মি. আর্থার। এসব বলে আমি লাভবানও হব না। আমি ভীতু একজন মানুষ, ধর্মপ্রাণ এক কাপুরুষ।’
ওয়াল্টার রাষ্ট্রদূতকে বিরক্ত করছে দেখে এক এইড এগিয়ে গেল ওদিকে।
‘আমি যা বললাম তা করবেন তো, মি. আর্থার? শুধু লেখাগুলো পুরোটা পড়ে ফেলবেন।’
আর্থার উদ্বেগে আকুল, মিনতিভরা মুখখানার দিকে তাকাল। ‘আচ্ছা, পড়ব,’ বলল সে। লোকটার হাত থেকে রেহাই পেলে বাঁচে সে।
হাসল ওয়াল্টার। ‘ধন্যবাদ, মি. অ্যামব্যাসাডর।’
এইড কিছু বলতে যাচ্ছিল, তাকে কাঁধ ঝাঁকিয়ে পাশ কাটাল। হাসছে সে, যেন দায়িত্বের বিরাট একটা বোঝা কাঁধ থেকে নেমে যাওয়াতে দারুণ খুশি।
আবার অশুভ সঙ্কেত – ৯
নয়
প্রকাণ্ড বোয়িং ৭৭৭ জাম্বো হিথ্রো এয়ারপোর্ট থেকে লম্বা দৌড় শেষ করে উঠে পড়ল শূন্যে, উড়াল দিল পশ্চিমে। নিকোলাস ওয়াল্টার স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলে সেঁধিয়ে গেল নরম সীটের ভেতরে। প্রীস্টকে দেয়া কথা সে রেখেছে। দেখা করেছে মার্কিন রাষ্ট্রদূতের সাথে। তবে ওয়াল্টারের সন্দেহ হচ্ছে অ্যামব্যাসাডর আদৌ তার পাঠানো প্যাকেজটাকে গুরুত্ব দেবেন কিনা। অবশ্য সে এ ব্যাপারে সাংবাদিকদের সাথেও কথা বলতে পারে। দু’একজন সাংবাদিকের সাথে তার পরিচয় আছে। এরা কিভাবে গপপো বানায় ভালই জানে ওয়াল্টার। থর্ন সাম্রাজ্য নিয়ে সাংবাদিকদের যথেষ্ট কৌতূহল আছে শুনেছে সে। আর এ ব্যাপারটা নিয়ে যদি সাড়া পড়ে যায় তাহলে বেচারা টমাস ডুলানের অপঘাত মৃত্যু অন্তত বৃথা যায়নি ভেবে সান্ত্বনা পাবে ওয়াল্টার।
