বাইবেল আর নোটবুক নিয়ে বসল ওয়াল্টার। গোটা ব্যাপারটাকে ফালতু বলে উড়িয়ে দিতে চাইলেও মন পুরোপুরি সায় দিচ্ছে না। সারাজীবন বাইবেল নিয়ে গবেষণা করেছে সে। বাইবেলের প্রতি তার অগাধ বিশ্বাস। সে বাইবেলের পাতা ওল্টাতে শুরু করল। মাঝে মাঝে বিড়বিড় করে কি যেন বলছে। পাশের সীটের মহিলা উদ্বেগ নিয়ে তাকাল তার দিকে। ওয়াল্টারকে অসুস্থ মনে হচ্ছে তাঁর। ওয়াল্টার আপন মনে নিউ টেস্টামেন্টের পৃষ্ঠা উল্টে চলেছে, মাঝে মাঝে নোটবুকে কি যেন লিখছে।
‘জাতি যুদ্ধ ঘোষণা করিবে জাতির বিরুদ্ধে, রাজ্য রাজ্যের বিরুদ্ধে…শেষ দিনে,’ কথাটা নিজেকেই যেন শোনাল ওয়াল্টার। আবার ঝুঁকে পড়ল বই’র ওপর। ‘ওই ঘটনাগুলো না ঘটা পর্যন্ত এই জেনারেশনের কেউ রক্ষা পাইব না।’
পেন্সিল রেখে দিল ওয়াল্টার, চোখ বুজল। যৌবনের কথা মনে পড়ে যাচ্ছে। যৌবনকাল তার কেটেছে ঐতিহাসিক গবেষণায়। বিজ্ঞানীর কৌতূহলসহ ধর্মীয় বিশ্বাস প্রবল তার, দুটো উপাদানের মধ্যে কখনও বিভেদ খুঁজতে যায়নি। আজ ঘুমিয়ে পড়ার পর সেই ভয়টা আবার তাকে তাড়া করে ফিরতে লাগল। পৃথিবী ধ্বংস হয়ে যাচ্ছে এমন দুঃস্বপ্ন সে প্রায়ই দেখে। আজও দেখল।
অ্যান্টিক্রাইস্ট বেঁচে আছে। বুড়ো সন্ন্যাসী যীশুকে আবার জন্মাতে দেখেছেন। ডি কার্লোর উক্তি যদি পাগলের প্রলাপ না হয় তাহলে ধরে নিতে হবে আরমাগেড্ডন বা কেয়ামতের আর দেরি নেই।
.
কাস্টমস এবং ইমিগ্রেশনের ঝামেলা পার হবার সময় ওয়াল্টার ভাবছিল সে ট্যাক্সি নেবে নাকি মাটিরতলার রেলে চড়বে। কোন্ হোটেলে উঠবে? কাকে প্রথম ফোন করবে? ব্যাগ নিয়ে কংকর্স হল ধরে হাঁটছে, একটা নিউজপেপার স্ট্যান্ডের সামনে দাঁড়িয়ে পড়ল। পকেটে হাত ঢোকাল ইংলিশ কয়েনের জন্যে।
ডিসপ্লেতে ঝোলানো ইন্টারন্যাশনাল হেরাল্ড-ট্রিবিউনের পাতায় চোখ আটকে গেল ওয়াল্টারের। ঝুঁকল, পত্রিকাটি নেবে, হঠাৎ জমে গেল পাথরের মত, তারপর ধীর গতিতে শেলফ থেকে পত্রিকাটি নামিয়ে সিধে হলো। বিড়বিড় করছে ওয়াল্টার, লোকজনের পথ আটকে দাঁড়িয়েছে সেদিকে খেয়াল নেই।
পত্রিকার প্রথম পাতায় খবরটা ছাপা হয়েছে। এক পুলিশ লেফটেন্যান্ট বলছে এমন ভয়ানক হত্যাকাণ্ড সে জীবনে দেখেনি। তার নাকি মাথাতেই ঢুকছে না একজন মানুষ কিভাবে আরেকজনকে এভাবে জ্যান্ত কবর দিতে পারে। তবে প্যাথলজিস্ট বলেছে, গর্তে পড়ে গিয়ে লোকটার ঘাড় ভেঙে যায় এবং সম্ভবত সে প্যারালাইজ্ড্ হয়ে পড়েছিল।
‘ওহ্, মাই গড,’ ফিসফিস করল ওয়াল্টার, পড়ে গেল হাঁটু ভেঙে। লোকজন ঘিরে ধরল তাকে। সবাই জিজ্ঞেস করছে সে ঠিক আছে কিনা কিংবা ডাক্তার ডাকার প্রয়োজন আছে কিনা।
পিকাডিলিতে, ছোট একটা হোটেলে উঠল ওয়াল্টার। বাড়িতে, স্ত্রীকে ফোন করে জানাল সে ভাল আছে।
ঘরকুনো ওয়াল্টার নতুন কোন শহরে এলে সাধারণত ঘোরাঘুরি করতে পছন্দ করে। সে বিকেলে হাঁটতে বেরুল। লক্ষ করল লন্ডনের কোন কিছুই তাকে আকর্ষণ করতে পারছে না। বারবার টমাস ডুলানের চেহারাটা ভেসে উঠছে চোখে। কণ্ঠ বাজছে কানে। কাল রাতে যখন ফোন করল সে, উত্তেজিত শোনাচ্ছিল কণ্ঠ।
গাল বেয়ে পানি পড়ছে ওয়াল্টারের, হাতের চেটো দিয়ে অশ্রু মুছল। ডুলানের মৃত্যুর জন্যে নিজেকে দায়ী মনে হচ্ছে তার। ড়ি কার্লোর অনুরোধে থর্নের কবর খুঁড়ে দেখতে ডুলানকে অনুরোধ করেছিল ওয়াল্টার। কিন্তু তার এমন নির্মম পরিণতি ঘটবে কে জানত?
হাঁটতে হাঁটতে একটা চার্চের সামনে চলে এসেছে ওয়াল্টার। চার্চের দরজা খোলা। কিছু না ভেবে ভেতরে ঢুকে পড়ল সে।
চার্চে অনেকক্ষণ বসে রইল ওয়াল্টার। মনে পড়ল ডি কার্লোর কথা: ‘জাগ্ৰত যীশু আপনাকে সাহায্য করবেন।’
নিখোঁজ সাংবাদিক মেয়েটির জন্যে প্রার্থনা করল ওয়াল্টার, টমাস ডুলানের আত্মার মাগফেরাত কামনা করল, সবশেষে প্রার্থনা করল নিজের জন্যেও। যখন বেরিয়ে এল চার্চ ছেড়ে, মনে মনে সিদ্ধান্ত নিয়ে ফেলেছে আগামী করণীয় কর্তব্য সম্বন্ধে।
‘মি. অ্যামব্যাসাডর।’
সেক্রেটারির ডাকে ঘুম ভেঙে গেল আর্থারের। লজ্জা পেল। এ হপ্তায় এ নিয়ে অন্তত তিনবার ডেস্কে ঘুমিয়ে পড়েছে সে। অবশ্য রাত জাগলে এমন হওয়াটাই স্বাভাবিক। ইদানীং শীলার যৌন ক্ষুধা খুব বেড়ে গেছে। সারা রাত জাগিয়ে রাখে। এ ব্যাপারে কিছু একটা করা দরকার। মুচকি হেসে ভাবল সে।
ইন্টারকমের বোতামে চাপ দিল আর্থার। জানতে চাইল সেক্রেটারি কেন ডাকছে।
‘ব্রিফিং পেপার, স্যার।’
‘ধন্যবাদ,’ ঘুম জড়ানো গলায় বলল সিনেটর। ‘ওগুলো পাঠিয়ে দাও, কেমন?’
হাই তুলল আর্থার, তারপর রওনা হয়ে গেল বাথরুমের দিকে।
ব্রিফিং পেপারগুলো স্টেট ডিপার্টমেন্টের তৈরি। সেই একই গৎ বাঁধা বুলি। পড়তে বিরক্তি লাগে। তবু সাবধানে পেপারগুলোতে চোখ বুলাল আর্থার। ক্লান্ত লাগছে খুব। ক’টা দিন ছুটি নেয়া দরকার। কিন্তু যাবেটা কোথায়? পৃথিবীর কোথাও শান্তি আছে নাকি?
আরব দেশগুলোর কোন উন্নতি নেই। হয় মৌলবাদী সংস্কৃতি চর্চা করছে নয়তো মধ্যযুগের অন্ধকারে পড়ে আছে। ইরাকে না খেতে পেয়ে হাজার হাজার শিশু মারা যাচ্ছে। সাদ্দাম হোসেন তবু সুযোগ পেলেই কুয়েতকে হুমকি-ধামকি দিচ্ছেন। আফগানিস্তানের অবস্থা আক্ষরিক অর্থেই ভয়াবহ। তালেবানেরা বারোটা বাজিয়ে দিয়েছে দেশটার। আফ্রিকান দেশগুলোতে যুদ্ধ বিগ্রহ লেগেই আছে। ক্যারিবিয়ান এবং ভারত মহাসাগরের দ্বীপ রাষ্ট্রগুলোতে চলছে একনায়কতন্ত্র অথবা শাসন করছে গুণ্ডা সর্দাররা। এশিয়ার দেশগুলোতেও শান্তি নেই। ইন্দোনেশিয়া, মালয়েশিয়া, ফিলিপাইন, শ্রীলঙ্কা সবখানেই বিশৃঙ্খল অবস্থা। শান্ত ইউরোপে এখন প্রধান সমস্যা হয়ে দাঁড়িয়েছে রক্তপিপাসু তরুণরা। এরা নির্বিচারে ছিনতাই, রাহাজানি, খুন-খারাবী করে চলেছে। একজন আমেরিকান ডিপ্লোম্যাট হয়েও দিন-রাত প্রহরীবেষ্টিত হয়ে চলতে হচ্ছে তাকে। দীর্ঘশ্বাস ফেলল আর্থার। যেখানে মানুষ আছে সে জায়গাটাই যেন দূষিত হয়ে উঠছে।
