দেবমূর্তির কাছ থেকে ক্রমে দূরে সরে যেতে লাগলেন ডুলান, এগোচ্ছেন গেটের দিকে। এদিকে শুধু কবর আর কবর। প্রার্থনার শ্লোক আওড়াতে আওড়াতে কবরগুলোর মাঝ দিয়ে হোঁচট খেতে খেতে ছুটছেন তিনি। যন্ত্রটা ধরে আছেন দু’হাতে। দুটো সমাধি ফলকের গায়ে আটকে গেল ওটা। ডিটেকটরের ওপর হেলান দিয়ে হাঁপাতে লাগলেন ফাদার। সমাধি ফলকে লেখা:
জোনাথন এবং মারিয়া ফোরসাইথ;
এঁরা এক সাথে, শান্তিতে আছেন অনন্তকালের জন্যে।
পর্দায় লাশ দুটোকে দেখা গেল। পাঁজরের হাড়ের ভেতর কিলবিল করছে পোকা, মাছি উড়ছে মুখের ওপর। পাশাপাশি শুয়ে আছে দু’জনে। ডুলান বিস্ফারিত দৃষ্টিতে দেখলেন মারিয়া ফোরসাইথের ফাঁক হয়ে যাওয়া খুলি তার স্বামীর কাঁধের ওপর থেকে বিকট ভঙ্গিতে তাকিয়ে আছে তাঁর দিকে। মারিয়ার মুখের গর্ত থেকে বেরিয়ে এসেছে জিভ, লকলক করছে। গলা চিরে তীক্ষ্ণ, ভয়ার্ত আর্তনাদ বেরিয়ে এল ফাদারের, পড়িমরি করে দৌড় দিলেন। এখনও মেশিনটা ধরে আছেন মুঠিতে। অন্ধের মত ছুটছেন। বার কয়েক পড়ে গেলেন আছাড় খেয়ে। তবে ভয়ের চোটে ব্যথা টের পেলেন না।
দৌড়াচ্ছেন, হোঁচট খাচ্ছেন আর চিৎকার করে একটা শব্দ বারবার আউড়ে চলেছেন: ‘অপবিত্রকরণ!’ শব্দটা প্রতিধ্বনি তুলছে যেন গাছের ফাঁকে। মাথাটা বারবার দু’পাশে নাড়াচ্ছেন ফাদার, ভুলে থাকতে চাইছেন ফাঁক হয়ে যাওয়া খুলির কথা। কিন্তু মগজের সাথে আঠা দিয়ে যেন সেঁটে দেয়া হয়েছে দৃশ্যটা, ভুলতে পারছেন না। আতঙ্কে দিশেহারা হয়ে পড়েছিলেন বলে খোলা কবরটা খেয়াল করেননি ডুলান। ডিগবাজি খেয়ে দড়াম করে ওটার মধ্যে পড়ে গেলেন তিনি।
প্রচণ্ড ব্যথায় চোখে অন্ধকার দেখলেন ডুলান। মাথা তোলার চেষ্টা করলেন, পারলেন না। থুথু ফেললেন। মুখ দিয়ে কাদা বেরিয়ে এল। পা-ও নড়াতে পারছেন না। গোটা শরীর অসাড়। প্রচণ্ড ভয় গ্রাস করল তাঁকে। প্রাণপণে চেষ্টা করলেন ভয় তাড়াতে। হাতে সবচে’ ব্যথা পেয়েছেন ফাদার। মনে হচ্ছে প্যারালাইজ্ড় হয়ে গেছে হাত। তবে অসাড় ভাবটা বেশিক্ষণ থাকবে না, নিজেকে সান্ত্বনা দিলেন তিনি। একটু পরে পায়েও সাড়া ফিরে পাবেন। হাতটা অদ্ভুত ভঙ্গিতে বেঁকে আছে। এর আগে কোনদিন শরীরের হাড়-টাড় ভাঙেনি ডুলানের। আবার ব্যথার ঢেউ উঠল, চোখ বুজে ফেললেন তিনি। বিড়বিড় করে প্রার্থনা করতে লাগলেন। চোখ মেলে তাকাতেই কবরের ওপর একটা কাঠামো দেখতে পেলেন তিনি। চোখ কুঁচকে আরও ভালভাবে দেখার চেষ্টা করলেন ওটাকে। একটা কুকুর, প্রকাণ্ড মাথা, হলুদ চোখে চেয়ে আছে তাঁর দিকে। শিউরে উঠলেন তিনি। থর্ন সমাধিতে নাইট গার্ড নেই কেন ভাবছিলেন ফাদার। এবার জবাবটা পেয়ে গেছেন। এরকম বিশালদেহী কুকুররাই হয়তো নাইট গার্ডের কাজ করে।
কুকুরটার চোখে চোখ রেখে মৃগী রোগীর মত হেসে উঠলেন ডুলান। নিজেকে তাঁর হিমবাহের কবলে পড়া পর্বতারোহীর মত লাগছে। আবার চোয়া ঢেকুর উঠল। থুথু ফেলার চেষ্টা করলেন, ঠোঁটের কোনা গড়িয়ে পড়ল কষ। বিশ্রী গন্ধ। মাথা হেলিয়ে গন্ধটার হাত থেকে রক্ষা পাবার চেষ্টা করলেন খামোকাই। মস্তিষ্ক তাঁর নির্দেশ শুনছে না। মাথা হেলানো গেল না।
ডুলান দেখলেন কুকুরটা মাথা নিচু করছে, নাক দিয়ে কবরের পাশে উঁচু হয়ে থাকা মাটির স্তূপে ধাক্কা মারল। একরাশ মাটি ঝুরঝুর করে পড়ল ডুলানের নাকে- মুখে। একটা নুড়ি ঠকাশ করে বাড়ি মারল ভুরুতে। ‘হেই,’ গুঙিয়ে উঠলেন তিনি।
কুকুরটা আবার মাটির স্তূপে নাক দিয়ে ধাক্কা মারল। ‘না…’ চেঁচিয়ে উঠলেন ফাদার, হাঁ করা গলার মধ্যে ঢুকে গেল এক দলা কাদা। আর কথা বলতে পারলেন না। শুনতে পেলেন একটা ঘোঁৎ ঘোঁৎ আওয়াজ, তারপর দ্বিতীয় কুকুরটাকে দেখা গেল কবরের পাশে। এরপর আরও একটা। কবরের মুখে ভিড় করে দাঁড়িয়েছে সবাই। ওদের বিশাল শরীরের পেছনে তারাজ্বলা আকাশটাকে দেখা গেল এক মুহূর্তের জন্যে। তারপর অদৃশ্য হয়ে গেল আকাশ তার ওপর মাটি-বৃষ্টি শুরু হতে। কুকুরগুলো নখ দিয়ে খামচে মাটি তুলছে, ছুঁড়ে ফেলছে কবরে।
একটা পাথরের টুকরো ঢুকে গেল ডুলানের নাকে, রক্ত বেরিয়ে এল। মুখ হাঁ করে চিৎকার দিলেন, গাঁক গাঁক আওয়াজের সাথে মাটি বেরুল শুধু। শক্ত করে চোখ বুজে থাকলেন তিনি, পাপড়ির ওপর মাটি পড়ছে। নীরবে প্রার্থনা করে চলেছেন ডুলান, মুখের ওপর মাটির স্তূপ বেড়েই চলেছে, একসময় বুজে গেল নাকের ফুটো।
.
পরদিন সকালে, কবর খননকারী লোকটা দৃশ্যটা দেখে প্রথমে ভাবল নতুন কবরটার ভেতরে বুঝি গোলাপী রঙের ঝোপ গজিয়েছে। সে কৌতূহলী হয়ে এগিয়ে গেল ওদিকে, হাত বাড়াল-ছোঁবে। সাথে সাথে ঝাঁকি খেয়ে পিছিয়ে গেল, গুঙিয়ে উঠল। ডিগবাজি খেয়ে আরেকটু হলে পড়ে যাচ্ছিল সে ঘাস নিড়ানির মত যন্ত্রটার গায়ে। কবরের পাশে পড়ে আছে যন্ত্রটা, মোটর ঘুরছে, পর্দায় ফুটে আছে চোখ বোজা টমাস ডুলানের কাদা মাখা মুখ।
আবার অশুভ সঙ্কেত – ৮
আট
রোম টু লন্ডনের প্লেনে, জানালার ধারে বসেছে নিকোলাস ওয়াল্টার। প্রীস্টের সাথে আলাপের কথাগুলো মনে পড়ে যাচ্ছে। হাত বাড়িয়ে ব্রীফকেসটা টেনে নিল সে, ডি কার্লোর নোটগুলোতে আবার চোখ বোলাল। ওর অবচেতন মন চাইছে ব্রীফকেসটা ফেলে দিয়ে সব ভুলে গিয়ে বাড়ি ফিরতে। কিন্তু সন্ন্যাসীর কাছে বাইবেল ছুঁয়ে শপথ করেছে ওয়াল্টার। দীর্ঘশ্বাস ফেলল সে, শূন্য দৃষ্টিতে চেয়ে রইল চিঠি দুটোর দিকে। সিনথিয়া অ্যাবট নামের বুড়িটা নির্ঘাত পাগল, আর অপরজন তো ভয়ানক অসুস্থ ছিল। মৃত্যুপথ যাত্রী মানুষ উল্টোপাল্টা কত কথাই তো বলে। ডি কার্লোর তিন কাল গিয়ে এক কালে ঠেকেছে। ডেমিয়েন থর্নের লাশ কবরে পাওয়া যায়নি। তো এ ব্যাপারে অনুসন্ধান চালালেই হয়।
