সুমি এক সেকেণ্ড চেয়ে রইল জাফরের দিকে, তারপর ঢলে পড়ে গেল মেঝেতে। রক্ত ভর্তি হৃৎপিণ্ড কামড়ে খেতে শুরু করেছে জাফর। আহ্, কী স্বাদ! আনন্দে বুজে এল তার চোখ। খাওয়া শেষ করে সুমির পোশাক ছিঁড়ে ফেলল জাফর। দেহের নরম অংশগুলো খেতে শুরু করেছে। এক ঘণ্টার মধ্যে সুমির শরীরের অর্ধেকটা খেয়ে ফেলল জাফর। হাড়গুলো অবশ্য খেল না। হাড় তার পছন্দ নয়। খাওয়া শেষে তৃপ্তির ঢেকুর তুলল। এমন সময় রুমের দরজা ধাক্কাতে লাগল রিমি।
‘মামণি, মামণি? কোথায় তুমি?’
বেড়ে গেল জাফরের চোখের উজ্জ্বলতা। আরও একটা শিকার। ছোট বাচ্চার দেহ। অনেক বেশি মজার। রুমের দরজাটা খুলে দিল জাফর। ওর শরীরে রক্ত দেখে চিৎকার করে উঠল রিমি। কিন্তু ওর মাথাটা সর্বশক্তি দিয়ে নিজের দিকে টেনে নিল জাফর। চার বছরের বাচ্চা এত প্রচণ্ড আঘাত সহ্য করতে পারল না। শরীর থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে গেল মাথাটা। কিন্তু তখনও কয়েক সেকেণ্ড নানাদিকে তাকাল রিমির চোখ। মাকে খুঁজছিল বেচারি।
এখন কিছুক্ষণ ঘুমাবে জাফর। সাড়ে পাঁচ ঘণ্টার টানা ঘুম। আগেই সুজানাকে ঘুম পাড়িয়ে রেখেছে সে। তার ঘুম ভাঙতে কমপক্ষে সাত ঘণ্টা লাগবে।
তাই পুরোপুরি নিশ্চিন্ত হয়ে ঘুমাতে গেল জাফর।
তিন
সাত ঘণ্টা পর…
ঘোরটা আস্তে-আস্তে কেটে যেতে থাকল সুজানার। কেমন যেন দুর্বল লাগছে শরীর, ঘুরছে মাথাটাও। চারদিকে যেন উড়ছে ধোঁয়া। চোখ মেলে তাকাল সে। দেখল জাফরের ভয়ঙ্কর মুখ। তার শরীরের বিভিন্ন জায়গায় জমাট রক্ত।
ঠিক সাড়ে পাঁচ ঘণ্টা পর ঘুম ভেঙেছে জাফরের। ঘুম ভাঙার পর থেকে সুজানার ঘুমন্ত শরীরের পাশে বসে আছে। তার বারবার মনে হয়েছে, সুজানাকে মেরে ফেলবে, নাকি বাঁচিয়ে রাখবে। শেষ পর্যন্ত বাঁচিয়ে রাখার সিদ্ধান্তই নিয়েছে। কারণ সুজানা তাকে আরও শিকার ধরতে সাহায্য করতে পারবে। জাফরের শরীর নিয়ে কোনও ঝুঁকি নিতে চাইছে না ফ্যাফ্যাস। নিজে শিকার ধরতে গেলে যে- কোনও আঘাতে ক্ষতি হতে পারে জাফরের শরীরের। আর তার মানেই সন্তানের ক্ষতি। সেটা সে হতে দেবে না।
জাফরকে দেখে লাফিয়ে উঠে বসল সুজানা। ওড়নাটা ভাল করে জড়িয়ে নিল গায়ে। জাফরের দিকে তাকিয়ে বলল, ‘কী-কী-কী…চাই?’
‘তরল খাবার খাব। পুষ্টিকর তরল। চাই। অনেক চাই।’
‘কী পুষ্টিকর তরল?’
‘রাত হয়েছে। পুষ্টিকর তরল চাই। রাতে পুষ্টিকর তরল খাব।’
‘পানি চাও?’
‘নাহ্!’ রেগে উত্তর দিল জাফর।
‘তা হলে দুধ?’
‘হ্যাঁ, দুধ। দুধ চাই। চারপেয়ে জন্তুর।’
ফ্রিজ থেকে দুধের পাতিল বের করল সুজানা। এক লিটার দুধ আছে সেখানে। পিছন-পিছন এসেছে জাফরও। সুজানার হাত থেকে ছিনিয়ে নিল পাতিলটা। ঢক-ঢক করে পুরোটা দুধ খেয়ে ফেলল। এক লিটার দুধ খেতে তার লাগল চার মিনিট। ডিমের ভিতর থাকা তার সন্তানের চাই প্রচুর পুষ্টি। তাদের দিতে হবে উপযুক্ত খাবার, নইলে দুর্বল রয়ে যাবে।
একটা ঢেকুর তুলল জাফর। হঠাৎ বিশ্রী গন্ধে ভরে গেল ঘরটা। সুজানা ভাবছে, সুমি কি এসেছিল? জাফরের সারা শরীরে এই রক্ত কার? সুমির নয়তো? ভয়ের শিহরণ বয়ে গেল ওর সারা শরীরে। জাফর যে রুমে সুমি-রিমিকে মেরেছে, সেই রুমে ঢুকল সুজানা। আর্তচিৎকার দিয়ে উঠল ভয়ে। সুমি আর রিমির শরীরের অংশবিশেষ এদিক-ওদিক ছড়িয়ে ছিটিয়ে রয়েছে। কোথাও হাড়, কোথাও ফুসফুস, কোথাও কিছু মাংস। ওগুলো ঘিরে ধরেছে রাজ্যের পিঁপড়া।
জাফরের আর ওই বাকি খাবারের প্রতি আগ্রহ নেই। কাল সকালে চাই তার নতুন খাবার। আর প্রতি রাতে চাই পুষ্টিকর তরল: দুধ।
সুজানার চিৎকার শুনে দৌড়ে এসেছে জাফর, চেপে ধরল সুজানার গলা। হিসহিসে গলায় বলল, ‘মেরে ফেলব! একদম মেরে ফেলব!’
মুহূর্তেই চুপ হয়ে গেল সুজানা। কিন্তু অনিয়ন্ত্রিতভাবে কাঁপতে থাকল তার শরীর। সুজানাকে ধাক্কা দিয়ে সরিয়ে দিল জাফর।
সোফায় গিয়ে বসে পড়ল সুজানা। আর শক্তি নেই দাঁড়াবার। বারবার সুজানার মনে হতে থাকল, এটা কি কোনও দুঃস্বপ্ন? ঘুম ভেঙে সে কি দেখবে তার পাশে ঘুমিয়ে আছে জাফর?
কিন্তু সুজানা বুঝতে পারছে, এটা আসলে মোটেও দুঃস্বপ্ন নয়। তার থেকেও অনেক বেশি কিছু। সে-রাতটা না ঘুমিয়ে কাটাল জাফররূপী ফ্যাফ্যাস আর সুজানা।
সুজানা বুঝল, যে-কোনও জিনিস খুব দ্রুত শিখতে পারে প্রাণীটা। ও জানতে চাইল, ‘কী চাও তুমি?’
‘আমি আমার সন্তানের জন্ম দিতে চাই।’
‘জাফরকে ছেড়ে দাও।’
‘না। না। এই শরীর এখন আমার। আমার সন্তানরা এখানেই জন্ম নেবে। এই শরীরের কোনও ক্ষতি হতে দেব না।’
‘তা হলে আমাকে ছেড়ে দাও। আমিও আমার সন্তানকে বাঁচাতে চাই। আমাকে মেরে ফেলো না।’
হেসে উঠল জাফর। বলল, ‘আমার বাচ্চা জন্ম নেয়ার পর তোমাকে ছাড়ব। এই কয়েকদিন আমার খাবার চাই। শিকার চাই। তুমি শিকার এনে আমাকে দেবে। তোমাকে আমি মারব না।’
‘আমি পারব না। আমি আর কাউকে আনতে পারব না।’
‘তা হলে তুমি আর তোমার সন্তান আমার খাবার আর পিপাসা মেটাবে।’
‘না-না! এমন কোরো না, আমার সন্তানকে বাঁচতে দাও।’
‘আমার সন্তানকে বাঁচতে দিলে আমিও তোমার সন্তানকে বাঁচতে দেব।’
‘তুমি কে?’
‘ফ্যাফ্যাস।’
‘তুমি কোথা থেকে এসেছ?’
‘অন্ধকার জগৎ থেকে।’
‘কে তোমাকে পাঠিয়েছে?’
