সুজানা দরজা ধাক্কাতে ধাক্কাতে বলল, ‘জাফর, অ্যাই, জাফর!’
জাফর উঠে দরজা খুলল, চোখ-মুখ অন্যরকম। তাকিয়ে থাকলে কেমন যেন
আতঙ্ক লাগে। সুজানা বলল, ‘কী হয়েছে, জাফর, তোমার?’
জাফর কিছু না বলে স্থির দৃষ্টিতে তাকিয়ে থাকল।
জাফরের হাত ধরে কেঁপে উঠল সুজানা।
জাফরের হাতটা বরফের মত ঠাণ্ডা। ‘জ-জ-জাফর!’
এবার হাত বাড়িয়ে দিল জাফর। বড় হতে লাগল ওর নখগুলো। বিচিত্র ভাষায় কিছু বলতে লাগল জাফর। প্রাচীন গ্রীক ভাষা? সুজানাকে ধাক্কা দিয়ে ফেলে দিল জাফর।
মেঝেতে ছিটকে পড়ে গেছে সুজানা, ঠোঁট কেটে গড়িয়ে পড়ল কয়েক ফোঁটা রক্ত।
‘কে তুমি?’ সুজানার গলায় শঙ্কা এবং আতঙ্ক।
‘থাকব, আমি থাকব,’ গলায় শ্লেষ নিয়ে বলল জাফর। বেশ বোঝা গেল তার হিংস্রতা। বাংলা কথাগুলো তেমন গুছিয়ে বলতে পারছে না। তবে কথাগুলোর মূল ইঙ্গিতটা বুঝতে সমস্যা হলো না।
সুজানা কাঁপা গলায় জানতে চাইল, ‘তোমার কী হয়েছে, জাফর?’
কিন্তু জাফরের উত্তর একই: সে থাকবে। তাকে থাকতেই হবে।
ইঙ্গিতটা পরিষ্কার, সুজানা তাকে না ঘাঁটালে সে-ও ঘাঁটাবে না সুজানাকে।
সুজানা বুঝল, অশুভ কিছু ভর করেছে জাফরের উপর। ঠাণ্ডা মাথায় চিন্তা করতে থাকল, কী করবে।
ঠিক করল, ওখান থেকে সরে এসে মাকে ফোনে সব খুলে বলবে। কিন্তু মোবাইল ফোন কানে তুলে বুঝল সিগনাল নেই। জাফরের শরীর থেকে বেরোচ্ছে নীল রঙের আভা। সুজানার কেন জানি মনে হচ্ছে, জাফরের কারণেই এই ঘরে মোবাইল নেটওঅর্ক কাজ করছে না। বাসা থেকে বেরোনোর চেষ্টা করল সুজানা। কিন্তু জাফর পথ আগলে দাঁড়াল। মাথা নাড়িয়ে বুঝিয়ে দিল ও বের হতে পারবে না।
দু’ সপ্তাহের জন্য ফ্যাফ্যাসের কাছে বন্দি সুজানা। কোনও ভুল বা চালাকি করলে ওকে মেরে ফেলবে ফ্যাফ্যাস।
জাফর ইঙ্গিতে বোঝাল, সে ক্ষুধার্ত। নিজের পেট এবং সুজানার পেটের দিকে ইঙ্গিত করে বলল, ‘তোমার পেটে বাচ্চা। আমার পেটে বাচ্চা বেঁচে থাকবে। অবশ্যই বেঁচে থাকবে। আমার বাচ্চা মারা গেলে তোমার বাচ্চাও মারা যাবে।’
মাথা কাজ করছে না সুজানার। আতঙ্কে ওর শরীর ভারী হয়ে আসছে। চোখের সামনে সবকিছু কেমন যেন ঝাপসা।
সুজানা বলল, ‘কী খেতে চাও?’
একটু হাসল জাফর। বলল, ‘মানুষ চাই। মানুষ নিয়ে আসো।
‘কী? মানুষ!’
‘হ্যাঁ। ডেকে আনো। ওটা দিয়ে ডেকে আনো।’ মোবাইলের দিকে আঙুল তুলে দেখাল জাফর।
‘কাকে ডেকে আনব? এসব কী বলছ?’
মুহূর্তেই রক্ত হিম হয়ে গেল জাফরের চোখ। স্পষ্ট বোঝা গেল রাগ। ফুঁসে উঠে জাফর বলল, ‘ডেকে আনো। ডেকে আনো। না হলে তোমাকে…’
এবার জাফর বুঝিয়ে দিল কাউকে ফোন করে ডেকে না আনলে, সে ক্ষুধা মেটাবে সুজানাকে দিয়েই। সুজানার মোবাইলের নেটওঅর্ক ফিরে এসেছে। বুঝে উঠতে পারল না, কাকে ফোন দেবে সে? কাকে মেরে ফেলার জন্য আমন্ত্রণ জানাবে? কিন্তু ও জানে, জাফরের কথা না শুনলে মারা পড়বে।
সুজানা তার বান্ধবী সুমিকে ফোন দিল। চোখের পানি বাঁধ মানতে চাইছে না। তবু গলা যথাসম্ভব স্বাভাবিক রেখে ও বলল, ‘হ্যালো, সুমি।’
‘হ্যালো, সুজ। কী খবর তোর?’
‘ভাল। আমার বাসায় একটু আসতে পারবি? খুব দরকার।’
‘অবশ্যই। জাফর ভাইয়া বাসায় নেই?’
‘আছে। তোকে খুব মনে পড়ছে।’
‘আচ্ছা, আমি এক ঘণ্টার মধ্যে আসছি। রিমিকেও নিয়ে আসছি।’
‘রিমিকে না আনলে হয় না?’
‘আমার বাসায় কেউ নেই রে। বাচ্চা মেয়ে একা-একা কী করে থাকবে?’
‘আচ্ছা, নিয়ে আয় তা হলে।’
‘ওকে।’
‘আর একটা কথা, আমার বাসায় আসার কথা কাউকে বলার দরকার নেই।’
‘মানে?’
‘একটু ব্যক্তিগত ব্যাপারে তোর সাথে কথা বলব। তাই আমার বাসায় আসার ব্যাপারটা কাউকে বলিস না। দুলাভাইকেও না।’
‘আচ্ছা, ঠিক আছে। আমি আসছি। তুই ঠিক আছিস তো, সুজ?’
‘হ্যাঁ। ঠিক আছি।’
মোবাইলের লাইন কেটে গেল। সুজানার খুব ঘুম আসছে। জাফরের শরীর থেকে হঠাৎ এক ধরনের গ্যাস বেরোচ্ছে। সেই গ্যাসের প্রভাবে কেমন শরীর এলিয়ে আসছে সুজানার। চোখের পাতা ভারী হয়ে এল। সুজানা ঘুমিয়ে পড়ার পর ওর দেহটা কাঁধে তুলে নিল জাফর। বিছানায় নিয়ে শুইয়ে দিল ওকে।
জাফর অপেক্ষা করছে শিকারের জন্য।
.
এক ঘণ্টার মাঝেই সুজানার বাসায় পৌছে গেল সুমি আর তার মেয়ে রিমি। একবার ডোরবেল বাজতেই দরজা খুলে দিল জাফর। ওকে দেখে সপ্রতিভ হাসি হেসে সুজানা বলল, ‘জাফর ভাই, কেমন আছেন? সুজানা হঠাৎ জরুরি তলব করল। তাই চলে এলাম।’
জাফর কিছু বলল না। শুধু নাক দিয়ে ঘোঁৎ করে একটা শব্দ করল। ‘কী, আপনি কিছু বলছেন না যে? সুজানার সাথে ঝগড়া হয়েছে নাকি?’ জিজ্ঞেস করল সুমি।
জাফর এবারও জবাব দিল না। ওর দিকে তাকিয়ে অবাক হলো সুমি। বরফের মত শীতল চোখ। যেন তীব্রভাবে ফুটে উঠেছে কপালের রগ। গা থেকে আসছে কেমন একটা বাজে গন্ধ।
সুমিকে তার পিছন-পিছন আসতে ইঙ্গিত করল জাফর।
সুমি এগিয়ে গেল।
রিমি অবশ্য মায়ের দিকে লক্ষ করছে না, মন দিয়ে টিভিতে কার্টুন দেখছে।
সুমিকে পাশের রুমে নিয়ে গেল জাফর। পিছনে বন্ধ করল ঘরের দরজাটা।
একটু চমকে উঠে বলল সুমি, ‘দরজা বন্ধ করছেন কেন, জাফর ভাই?’
হাসল জাফর। সে হাসি ভয়ঙ্কর।
সুমি কিছু বোঝার আগে ওর বুক চিরে হাতটা ঢুকিয়ে দিল জাফর। এক ঝটকায় বের করে আনল হৃৎপিণ্ডটা।
