বিলকিস বলল, “আপনি এখনই থানায় ফোন করেন। ফোন করে সবকিছু বলেন।”
শামীম যখন থানায় ফোন করছে তখন বাকী তিনজন তাকে ঘিরে দাঁড়িয়ে রইল। শামীম ফোনে কথা বলতে শুরু করতেই টের পেয়ে গেল এখানে অন্য কোনো ব্যাপার ঘটে গেছে, ফোনে কথা বলে লাভ নেই। তারা তার কথা শুনতেই চায় না, বেশ কিছুক্ষণ চেষ্টা করার পর বলল, তারা একজনকে তার বাসায় পাঠাচ্ছে। শামীম যেন বাসায় অপেক্ষা করে।
বিলকিস তখন নিচু গলায় গৌরী আর ললিতাকে ডেকে বলল, “এই তোরা শোন।”
“কী হয়েছে?”
“এইভাবে হবে না।”
“তাহলে কী করবি?”
বিলকিস ফিসফিস করে বলল, “চল, তাড়াতাড়ি স্কুলে যাই।”
“স্কুলে গিয়ে কী করবি?”
“সবাইকে বলি। তারপর সবাই মিলে আমরা ঐ এনজিও অফিসটা আক্রমণ করি।”
গৌরী বলল, “আক্রমণ করি?”
“হ্যাঁ। তা না হলে সেরিনাকে বাঁচাবি কেমন করে?”
শান্তশিষ্ট ললিতা মাথা নাড়ল, বলল, “ঠিকই বলেছিস। চল যাই।”
তাই শামীম যখন অস্থির হয়ে তার ঘরে ছটফট করছে তখন বিলকিস, গৌরী আর ললিতা তাদের স্কুলের দিকে ছুটছে। তারা যখন স্কুলে পৌঁছেছে। তখন মাত্র এসেম্বলী শুরু হয়েছে। বড় আপা সব মেয়েদেরকে বিজ্ঞানী মাদাম কুরীর গল্প বলছেন তার মাঝে দৌড়াতে দৌড়াতে তিনজন এসেম্বলীর সামনে হাজির হল। বড় আপা চোখ কপালে তুলে বললেন, “কী হল? তোমরা এতো দেরী করে এখানে?”
বিলকিস বলল, “বড় আপা, সর্বনাশ হয়ে গেছে।”
বড় আপা ভয় পেয়ে বললেন, “কী সর্বনাশ?”
“সেরিনাকে ধরে নিয়ে গেছে।”
পুকুরের তলা থেকে একজনকে উদ্ধার করার পর, স্কুলের জন্যে। সাঁতার প্রতিযোগিতায় জাতীয় পুরস্কার আনার পর থেকে সবাই সেরিনাকে চিনে। কাজেই এসেম্বলীতে দাঁড়িয়ে থাকা সব মেয়ে এক ধরনের আর্ত চিৎকার করল। বড় আপা জিজ্ঞেস করলেন, “কে সেরিনাকে ধরে নিয়ে গেছে?”
বিলকিস বলল, “একজন বিদেশী। তাদের একটা এনজিও অফিস আছে।”
“তোমরা কেমন করে জান?”
গৌরী বলল, “আমরা সেরিনার বাসায় গিয়েছিলাম। সেরিনার আব্বুকে বাসায় দড়ি দিয়ে বেঁধে রেখেছিল, আমরা গিয়ে ছুটিয়েছি।”
“পুলিশে খবর দেওয়া হয়েছে?”
গৌরী বলল, “লাভ নাই।”
বড় আপা ভুরু কুঁচকে বললেন, “লাভ নাই?”
“না, পুলিশ কোনো পাত্তা দিচ্ছে না।”
“কী বল পাত্তা দিচ্ছে না–আমি এক্ষুণি ফোন করছি।”
বিলকিস মাথা নেড়ে বলল, “বড় আপা আমাদের সময় নাই।”
“কীসের সময় নাই?”
“সেরিনাকে বাঁচানোর। ওরা সেরিনাকে মেরে ফেলবে–”
“কী বলছ তুমি? কেন সেরিনাকে মেরে ফেলবে?”
গৌরী কাঁদো কাঁদো হয়ে বলল, “সেরিনার একটা বিশেষ ক্ষমতা আছে–সেই ক্ষমতার জন্যে তাকে ধরে নিতে আসছে, ধরে কেটে কুটে ফেলবে। আমাদের এক্ষুণি যেতে হবে।”
“কোথায় যেতে হবে?”
“এনজিও অফিসে। গিয়ে ঘেরাও করতে হবে। আমরা যদি না। ছোটাই কেউ সেরিনাকে বাঁচাতে পারবে না। আমাদের হাতে একটুও সময় নাই। প্লীজ বড় আপা। প্লীজ।”
বড় আপা কিছুই বুঝতে পারছিলেন না, খানিকটা অসহায়ভাবে মাথা নেড়ে বললেন, “তোমরা কী বলছ আমি কিছুই বুঝতে পারছি না! তোমরা এখানে কী করবে?”
ললিতা বলল, “স্কুলের সব মেয়ে নিয়ে এনজিও অফিস ঘেরাও করে ভেতর থেকে সেরিনাকে ছুটিয়ে আনব।”
বড় আপা চোখ কপালে তুলে বললেন, “কী বলছ তোমরা পাগলের মতো?”
“সত্যি বলছি বড় আপা। এ ছাড়া কোনো উপায় নাই।”
বিলকিস তখন এসেম্বলীতে দাঁড়িয়ে থাকা হাজার খানেক মেয়ের দিকে তাকিয়ে চিৎকার করে জিজ্ঞেস করল, “তোমরা আমাদের সাথে সেরিনাকে বাঁচানোর জন্যে যাবে?”
সব মেয়ে এক সাথে চিৎকার করে বলল, “যাব।”
বিলকিস বলল, “তাহলে চল।”
সব মেয়ে তখন চিষ্কার করতে করতে বের হতে শুরু করল, বড় আপা বললেন, “দাঁড়াও দাঁড়াও। আগেই যেও না—”
কিন্তু ততক্ষণে সবাই স্কুল থেকে বের হয়ে বিলকিস গৌরী আর ললিতার পিছু পিছু ছুটতে শুরু করেছে। দেখতে দেখতে শহরের রাস্তাঘাটের যত গাড়ী, টেম্পো, রিক্সা, স্কুটার আছে সব থেমে গেল আর তার ভেতর দিয়ে শত শত মেয়ে ছুটতে লাগল।
.
সেরিনাকে একটা কমলা রংয়ের জাম্পস্যুট পরানো হয়েছে। তার কপালের দুই পাশে দুইটা মনিটর লাগানো। সাদা এপ্রন পরা একজন মানুষ হাতে একটা সিরিঞ্জ নিয়ে সেরিনার কাছে এগিয়ে এল। সেরিনা ক্লান্ত গলায় জিজ্ঞেস করল, “এটা কী?”
“তোমাকে ঘুম পাড়িয়ে দেওয়ার জন্যে একটা ইনজেকশান।”
“কেন আমাকে ঘুম পাড়িয়ে দিচ্ছেন?”
“তোমাকে ঘুম পাড়িয়ে তোমার শরীরটা শীতল করে ফেলা হবে তুমি কিছু টের পাবে না।”
সেরিনা স্থির চোখে সাদা এপ্রন পরা মানুষটার চোখের দিকে তাকিয়ে বলল, “আপনাকে এই কাজ করার জন্যে কতো টাকা দিয়েছে?”
মানুষটির মুখের মাংশপেশী শক্ত হয়ে গেল, বলল, “তুমি নড়বে না।”
সেরিনা বলল, “আপনার ছেলে মেয়ে আছে? আমাকে শেষ করে দেওয়ার জন্যে আপনাকে যে টাকা দিবে সেই টাকা দিয়ে আপনি আপনার ছেলে মেয়েদের খেলনা কিনে দেবেন? তাদেরকে শিশুমেলা নিয়ে যাবেন?”
মানুষটা কঠিন গলায় বলল, “তুমি বেশী কথা বলবে না মেয়ে।”
ঠিক তখন জানালার কাঁচ ভেঙ্গে ঘরের ভেতরে প্রথম একটা ঢিল এসে পড়ল। তারপর একটার পর একটা ঢিল পড়তে লাগল। এবং সাথে সাথে অসংখ্য মেয়ে কন্ঠের চিৎকার শোনা যেতে লাগল।
বিদেশী মানুষটা দৌড়ে ঘরে এসে ঢুকল, ইংরেজীতে জিজ্ঞেস করল, “কী হয়েছে?”
