অন্যপাশে শিউলি বেশ কিছুক্ষণ চুপচাপ থেকে একটা স্বা নিশ্বাস ফেলে বলল, আমাকে তুমি রাগাতে পারবে না ভাইয়া। আমি ঠিক করেছি জীবনের যত অসুন্দর জিনিস তার থেকে দূরে থাকব। তোমাকে যে জন্য ফোন করেছিলাম-
কী জন্য এই সকালে ঘুম ভাঙিয়েছিস?
আজ সন্ধেবেলা আমার বাসায় আস।
কী ব্যাপার? খাওয়াদাওয়া—
ইস ভাইয়া! শিউলি কেমন যেন নেকু নেকু গলায় বলল, তুমি খাওয়া ছাড়া আর কিছু বোঝ না। খাওয়া হচ্ছে একটা স্কুল ব্যাপার। পৃথিবীতে খাওয়া ছাড়া আরো সুন্দর বিষয় থাকতে পারে।
সেটা কী?
আজকে বাসায় কবি কিংকর চৌধুরী আসবেন–
কী চৌধুরী?
শিউলি স্পষ্ট করে বলার চেষ্টা করল, কিংকর চৌধুরী।
কিংকং চৌধুরীঃ কিংকং গরিলার নাম, মানুষকে কিংকং ডাকছিস কেন? আমি অবাক হয়ে বললাম, বেশি মোটা আর কালো নাকি?
কিংকং না, শিউলি শীতল গলায় বলল, কিংকর। কিংকর চৌধুরী।
কিংকর? কী অদ্ভুত নাম!
মোটেও অদ্ভুত না। কিংকর খুব সুন্দর নাম। তুমি বইপত্র পড় না বলে জান। কিংকর চৌধুরী বাংলাদেশের একজন প্রধান কবি। তার একটা করে কবিতার বই বের হয় সেগুলো হটকেকের মতো বিক্রি হয়। দেশের তরুণ-তরুণীরা তার জন্য পাগল–
চেহারা কেমন?
শিউলি থতমত খেয়ে বলল, চেহারা?
হ্যাঁ। কালো আর মোটা নাকি?
মানুষের চেহারার সাথে তার সৃজনশীলতার কোনো সম্পর্ক নাই।
তার মানে কালো আর মোটা। আমি সবকিছু বুঝে ফেলেছি এরকম গলায় বললাম, স্মাথায় টাক?
মোটেও টাক নাই। শিউলি ঠাণ্ডা গলায় বলল, কপালের ওপর থেকে হুঁবহুঁ রবীন্দ্রনাথ। চোখ দুটো একেবারে জীবনানন্দ দাশের। নাকের নিচের অংশ কাজী নজরুল ইসলাম। আর তোমার হিংসুটে মনকে শান্ত করার জন্য বলছি, কবি কিংকর চৌধুরী মোটেও কালো আর মোটা নন। ফরসা এবং ছিপছিপে! দেবদূতের মতো—
বুঝেছি। আমি চিন্তিত গলায় বললাম, এই কবিই তোর মাথা খেয়েছে। শরীফ কী বলে?
শরীফ হচ্ছে শিউলির স্বামী, সেও শিউলির মতো আধপাগল। কোনো কোনো দিক দিয়ে মনে হয় পুরো পাগল। শিউলি বলল, শরীফ তোমার মতো কাঠখোট্টা না, তোমার মতো হিংসুটেও না। শরীফই কবি কিংকর চৌধুরীকে বাসায় এনেছে–
বাসায় এনেছে মানে? আমি আঁতকে উঠে বললাম, এখন তোদের বাসায় পাকাপাকি উঠে এসেছে নাকি?
না ভাইয়া। শিউলি শান্ত গলায় বলল, তার নিজের বাসা আছে, ফ্যামিলি আছে, সেখানে থাকেন। মাঝে মাঝে আমাদের বাসায় বেড়াতে আসেন।
হ্যাঁ, খুব সাবধান। আমি গম্ভীর হয়ে বললাম, কবি-সাহিত্যিকরা ছ্যাবলা টাইপের হয়। একটু লাই দিলেই কিন্তু মাথায় চড়ে বসবে তার বাসায় পাকাপাকিভাবে ট্রান্সফার হয়ে যাবে।
উঁহ! ভাইয়া–শিউলি কান্না কান্না গলায় বলল, তুমি একজন সম্মানী মানুষ নিয়ে এত বা কৃষ্ণা বলতে পার, ছি!
মোটেও বাজে কথা বলছি না। তুই কী জানিস?
অন্তত এইটুকু জানি কবি কিংকর চৌধুরী বাংলাদেশের একজন শ্রেষ্ঠ মানুষ। বিখ্যাত মানুষ। সম্মানী মানুষ। তার সাথে কথা বলে আমরাও চেষ্টা করছি তার মতো হতে–
সর্বনাশ! আচমকা ঘাড় ঘোরাতে গিয়ে আবার রগে টান পড়ল, আমি আবার বললাম, আউক।
শিউলি না শোনার ভান করে বলল, যদি একজন সত্যিকারের মানুষের সাথে দেখা করতে চাও, কথা বলতে চাও তা হলে সন্ধেবেলা এসো। কবি কিংকর চৌধুরী থাকবেন।
খাবারের মেনটা কী জিজ্ঞেস করার আগেই শিউলি টেলিফোন রেখে দিল। মনে হয় আমার ওপর রাগ করেছে। টেলিফোন রেখে দেবার পর আমার মনে হল, কবি কিংকর চৌধুরীকে দেখে বিলু আর মিলি কী বলছে সেটা জিজ্ঞেস করা হল না। বিলু আর মিলি হচ্ছে আমার ভাগ্নে-ভাগ্নি, একজনের বয়স আট অন্যজনের দশ, ঐ বাসায় এই দুইজন এখনো স্বাভাবিক মানুষ—বড় হলে কী হবে কে জানে! শিউলি-শরীফের পাল্লায় পড়ে কবিসাহিত্যিকের পেছনে যে ঘোরাঘুরি শুরু করবে না কেউ তার গারান্টি দিতে পারবে না। পাগলা-আধপাগলা মানুষ নিয়ে যে কী মুশকিল!
শিউলি ঘুমের বারোটা বাজিয়ে দিয়েছে, তাই আর বিছানায় ফেরত গিয়ে লাভ নেই। ঘাড়ের ব্যথাটাও মনে হয় ভালোভাবেই ধরেছে। সঁত ব্রাশ করা, শেভ করা, এই কাজগুলো করতে গিয়েও মাঝে মাঝে আউক শব্দ করতে হল। বেলা বারোটার দিকে ঘর থেকে বের হয়েছি। বাসার বাইরে একজন দারোয়ান থাকে, আমাকে দেখেই দাঁত বের করে হি হি করে হেসে বলল, স্যার, ঘাড়ে ব্যথা?
আমি ঘাড় ঘুরিয়ে তার দিকে তাকাতে গিয়ে উক করে শব্দ করলাম। পুরো শরীর ঘুরিয়ে তার দিকে তাকাতে হল, তাকে জিজ্ঞেস করলাম, তুমি কেমন করে বুঝতে পারলে আমার ঘাড়ে ব্যথা?
দশ মাইল দূর থেকে আপনাকে দেখে বোঝা যায় স্যার। দুইটা জিনিস মানুষের কাছে লুকানো যায় না। একটা হচ্ছে ঘাড়ে ব্যথা আরেকটা–
আরেকটা কী?
সেটা শরমের ব্যাপার, আপনাকে বলা যাবে না।
ও। শরমের ব্যাপারটা আমি আর জানার চেষ্টা করলাম না। আমি হেঁটে যাচ্ছিলাম, দারোয়ান আমাকে থামাল, বলল, স্যার। ঘাড়ের ব্যথার জন্য কী ওষুধ খাচ্ছেন?
এখনো কোনো ওষুধ খাচ্ছি না।
ওষুধে কোনো কাজ হয় না স্যার, যেটা দরকার সেটা হচ্ছে মালিশ।
মালিশ?
জে স্যার। সরিষার তেল গরম করে দুই কোয়া রশুন ছেড়ে দিবেন স্যার। সকালে এক মালিশ বিকালে আরেক মালিশ। দেখবেন ঘাড়ের ব্যথা কই যায়।
ঠিক আছে। আমি ঘাড়ের ব্যথার ওষুধ জেনে বের হলাম। মোড়ের রাস্তায় যাবার সময় শুনলাম পানের দোকান থেকে কে যেন জিজ্ঞেস করল, ঘাড়ে ব্যথা?
ঘাড় ঘুরিয়ে তাকাতে গিয়ে যন্ত্রণায় আউক শব্দ করলাম। পুরো শরীর ঘুরিয়ে তাকাতে হল, পানের দোকানের ছেলেটা আমার দিকে তাকিয়ে হাসছে। একজনের ঘাড়ে কথা হলে অন্যকে কেন হাসতে হবে? আমি বললাম, । ঘাড়ে ব্যথা।
