কাদিরও একটা কিরিচ হাতে নেয়। বলে, ঠিকই বলেছেন বিল্লাল ভাই, দরজা বন্ধ ছিল। ভিতরেই আছে।
দুইজন তখন ঘরের ভিতর খুঁজতে থাকে। খুব বেশি সময় খুঁজতে হল না। বিছানার নিচে উঁকি দিয়েই বিল্লাল একটা গগনবিদারী চিৎকার দেয়। তারপর যা একটা ব্যাপার শুরু হল সেটা বলার মতো নয়। ইঁদুরগুলো একসাথে বিল্লাল আর কাদিরের ওপর লাফিয়ে পড়ল। ভয়ে আতঙ্কে বিল্লাল দুই একটা গুলি করে কিন্তু তাতে অবস্থা আরো খারাপ হয়ে যায়। ভিতরে ইঁদুরের সাথে মস্তিানদের একটা ভয়ংকর খণ্ডযুদ্ধ শুরু হতে থাকে। দুইজন মাটিতে লুটিয়ে পড়ে গড়াগড়ি খায় আর বিশাল বিশাল লোমশ ইঁদুর তাদেরকে কামড়াতে থাকে। দেখে মনে হয় কিছুক্ষণের মাঝে দুজনকেই খেয়ে ফেলবে।
অনিক বলল, সর্বনাশ।
আমি বললাম, তাড়াতাড়ি তোমার সুইচ অন করে ইঁদুর তাড়িয়ে দাও!
অনিক দৌড়াদৌড়ি করে সুইচ অন করার চেষ্টা করে। সুইচ খুঁজে বের করে সেগুলো অন অফ করে নব ঘুরিয়ে যখন ইঁদুরগুলোকে দূর করল ততক্ষণে দুইজনের অবস্থা শোচনীয়। তাদের হইচই চিৎকার শুনে বাইরে মানুষজন দরজা ভেঙে ভিতরে ঢুকতে শুরু করেছে। তার ভিতরে কয়েকজন পুলিশকেও দেখতে পেলাম।
অনিক বলল, চলো। সরজমিনে দেখে আসি।
আমি বললাম, চলো।
আমরা যখন গিয়েছি তখন পুলিশ দুইজনকে হ্যান্ডকাফ লাগাচ্ছে। ঘরের ভেতরে কয়েক শ ফেনসিডিলের বোতল, মদ, গাঁজা, হেরোইনের সাপ্লাই। নানারকম অস্ত্র গোলাগুলি–হাতেনাতে এরকম মাস্তানদের ধরা সোজা কথা নয়। বিল্লাল আর কাদিরকে চেনা যায় না। সারা শরীর কেটেকুটে রক্তাক্ত অবস্থা।
পুলিশের একজন জিজ্ঞেস করল, কী হয়েছে? তোমাদের এই অবস্থা কেন?
বিল্লাল ফ্যালফ্যাল করে তাকিয়ে বলল, এই এত বড় বড়—
এত বড়-বড় কী?
ইঁদুরের মতো—
পুলিশ অফিসার হা হা করে হাসলেন। বললেন, এত বড় কখনো ইঁদুর হয় নাকি?
উপস্থিত মানুষদের একজন বলল, মদ গাজা খেয়ে কী দেখতে কী দেখেছে!
নিজেরাই নিজের সাথে মারামারি করেছে।
কাদির মাথা নেড়ে বলল, জি না! আমরা মারামারি করি নাই।
পুলিশ অফিসার দুইজনকে গাড়িতে তুলতে তুলতে বলল, রিমান্ডে নিয়ে একটা রগড়া দিলেই সব খবর বের হবে।
সব লোকজন চলে যাবার পর শিউলি আমাদের কাছে এসে দাঁড়ায়। দাঁত বের করে হেসে বলল, এক নম্বুরি কাজ!
আমি অবাক হয়ে বললাম, কী কাজ এক নম্বুরি?
এই যে মাস্তানদের দূর করলেন?
কে দূর করেছে?
আপনারা দুইজন।
অনিক অবাক হয়ে বলল, তুমি কেমন করে জান?
শিউলি খুক খুক করে হাসতে হাসতে বলল, আমি সব জানি। খালি একটা কথা–
কী কথা?
বিলাইয়ের সাইজের ইন্দুরগুলো কিন্তু দূর করতে হবে।
অনিক হাসল। বলল, মাস্তান দূর করে দিতে যখন পেরেছি—তখন তোমার এই ইঁদুরও দূর করে দেব।
শিউলি তার সব কয়টি দাঁত বের করে বলল, এই জনেই তো আপনাদের ইন্দুরওয়ালা ডাকি।
০৪. কবি কিংকর চৌধুরী
টেলিফোনের শব্দে সকালবেলা ঘুম ভাঙল। বাংলাদেশে ঘুমের ব্যাপারে আমার চাইতে বড় এক্সপার্ট কেউ আছে বলে আমার মনে হয় না। যদি ঘুমের ওপর কোনো অলিম্পিক প্রতিযোগিতা থাকত সোনা না হলেও নির্ঘাত একটা রুপা কিংবা ব্রোঞ্জ পদক আনতে পারতাম। এরকম একটা এক্সপার্ট হিসেবে আমি জানি সকালের ঘুমটা হচ্ছে ঘুমের রাজা এইসময় কেউ যদি ঘুমের ডিস্টার্ব করে তার দশ বছরের জেল হয়ে যাওয়া উচিত। কিন্তু দেশে এখনো সেই আইন হয় নি। কাজেই আমাকে বিছানা থেকে উঠতে হল। উঠতে গিয়ে আমি আউক বলে নিজের অজান্তেই একটা শব্দ করে ফেললাম। বেকায়দায় ঘুমাতে গিয়ে ঘাড়ে প্রচণ্ড ব্যথা।
কোনোমতে ব্যথা সহ্য করে গিয়ে টেলিফোন ধরে বললাম, হ্যালো।
ভাইয়া! এতক্ষণ থেকে ফোন বাজছে, ধরছ না, ব্যাপারটা কী?
গলা শুনে বুঝতে পারলাম ছোট বোন শিউলি, আমাদের পরিরারের সবচেয়ে বিপজ্জনক সদস্য। সবকিছু নিয়ে তার কৌতূহল এবং সবকিছু নিয়ে তার এক্সপেরিমেন্ট করার একটা বাতিক আছে। বিশেষ করে নতুন নতুন যে রান্নাগুলি সে আবিষ্কার করে, সেগুলিকে আমি সবচেয়ে ভয় পাই। আমি ভয়ে ভয়ে বললাম, কী হয়েছে? এত সকালে ফোন করছিস?
সকাল? কয়টা বাজে তুমি জান?
কয়টা?
সাড়ে দশটা।
সাড়ে দশটা অবশ্যই সকাল। আমি হাই তুলে বললাম, কী হয়েছে তাড়াতাড়ি বল। বাকি ঘুমটা শেষ করতে হবে।
তাড়াতাড়ি-তাড়াতাড়ি সব সময় তোমার শুধু তাড়াতাড়ি। ছোট বোন শিউলি বলল, কোনো কিছু যে ধীরে ধীরে সুন্দর করে করার একটা ব্যাপার আছে সেটা তুমি জান?
আমার ঘুম চটকে গেল, সে যে কথাগুলি বলেছে সেগুলি মোটেও তার কথা না। শিউলি সব সময়েই ছটফট করে হইচই করে চিৎকার করে ছোটাছুটি করে! আমাকে উপদেশ দিচ্ছে ধীরে-সুস্থে কাজ করতে, সুন্দর করে কাজ করতে—ব্যাপারটা কী? আমি বললাম, তোর হয়েছে কী? এভাবে কথা বলছিস কেন?
কীভাবে কথা বলছি?
বুড়ো মানুষের মতো। ধীরে ধীরে কাজ করা সুন্দর করে কাজ করা, এগুলো আবার কী রকম কথা?
শিউলি বলল, মানুষের জীবন ক্ষণিকের হতে পারে কিন্তু সেটা খুব মূল্যবান। সেটা তাড়াহুড়ো করে অপচয় করা ঠিক না। সেটা সুন্দর হতে হবে, পবিত্র হতে হবে, কোমল পেলব হতে হবে
আমার ঘুম পুরোপুরি ছুটে গেল, উত্তেজনায় ঘাড় ঘোরাতে গিয়ে আবার প্রচণ্ড ব্যথায় ককিয়ে উঠে বললাম, আউক!
আউক? শিউলি প্রায় আর্তনাদ করে বলল, ভাইয়া, তুমি এসব কী অশালীন অসুন্দর কথা বলছ? ছি ছি ছি —
আমি এবারে পুরোপুরি রেগে আগুন হয়ে উঠে বললাম, আমার ইচ্ছে হলে আউক বলব, ইচ্ছে হলে ঘাউক বলব, তোর তাতে এত মাথাব্যথা কিসের?
