কমলার রস খাবেন। দিনে তিনবার। দেখবেন বাধা বাপ বাপ করে পালাবে।
আচ্ছা। ঠিক আছে।
আমি দশ পাও সামনে যাই নি, একজন আমাকে থামাল, জাফর ইকবাল সাহেব না?
জি।
ঘাড়ে ব্যথা?
মানুষটা কে চেনার চেষ্টা করতে করতে বললাম, জি। সকাল থেকে উঠেই ঘাড়ে বাধা।
ঘাড়ে ব্যথার একটাই চিকিৎসা, ঠাণ্ডা-গরম চিকিৎসা।
ঠাণ্ডা-গরম?
জি। আইসব্যাগ আর হট ওয়াটার ব্যাগ নিবেন। দুই মিনিট আইসব্যাগ দুই মিনিট হট ওয়াটার ব্যাগ। ব্লাড সারকুলেশান বাড়বে আর ব্লাড সারকুলেশান হচ্ছে সব সমস্যার সমাধান। দুই দিনে সেরে যাবে।
ও আচ্ছা। আমি মানুষটার দিকে তাকিয়ে তার পরিচয় জানতে চাচ্ছিলাম, তার আগেই সে দ্রুত পা চালিয়ে চলে গেল। আমাদের দেশের মানুষের মনে হয় রোগের চিকিৎসা নিয়ে উপদেশ দেওয়া ছাড়া আর কোনো কিছুর জন্য সময় নেই।
সারা দিন অন্তত শ খানেক পরিচিত এবং অপরিচিত মানুষ আমার ঘাড়ের ব্যথা কেমনভাবে সারানো যায় সেটা নিয়ে উপদেশ দিল। সবচেয়ে সহজটি ছিল তিনবার কুলহুঁ আল্লাহ পড়ে কুঁ দেওয়া। সবচেয়ে কঠিনটি হচ্ছে জ্যান্ত দাঁড়াশ সাপ ধরে এনে শক্ত করে তার লেজ এবং মাথা টিপে ধরে শরীরটা ঘাড়ে ভালো করে ডলে নেওয়া। আশ্চর্যের ব্যাপার, এই শখানেক মানুষের মাঝে একজনও আমাকে ডাক্তারের কাছে যেতে বলল না। বিকালবেলা আমি তাই ঠিক করলাম ডাক্তারের কাছেই যাব।
কোন ডাক্তারের কাছে যাওয়া যায় সেটা নিয়ে একটু সমস্যার মাঝে ছিলাম, তখন সুব্রতের কথা মনে পড়ল। আমি কাছাকাছি একটা ফোন-ফ্যাক্সের দোকান থেকে সুব্রতকে ফোন করতেই সে উদ্বিগ্ন গলায় বলল, কৈ, জাফর ইকবাল?
হ্যাঁ।
কী হয়েছে তোর? এইরকম সময়ে ফোন করেছিস? কোনো সমস্যা?
না-না, কোনো সমস্যা না। আমি তাকে আশ্বস্ত করার চেষ্টা করলাম, একটা ডাক্তারের খাজ করছিলাম।
ডাক্তার? সুব্রত প্রায় চিৎকার করে বলল, কেন? কার জন্য ডাক্তার? কী হয়েছে? সর্বনাশ!
সেরকম কিছু হয় নাই। আমার নিজের জন্য।
তোর নিজের জন্য? কেন? কী হয়েছে তোর?
ঘাড়ে ব্যথা।
ঘাড়ে ব্যথা? সুব্রত হঠাৎ একেবারে চুপ করে গেল, আমার মনে হল আমি যেন ঘাড়ে ব্যথা না বলে ভুল করে লিভার ক্যান্সার বলে ফেলেছি। সুব্রত থমথমে গলায় বলল, কোন ঘাড়ে?
দুই ঘাড়েই। বামদিকে একটু বেশি।
সুব্রত আর্তনাদ করে বলল, বামদিকে একটু বেশি? সর্বনাশ!
এর মাঝে সর্বনাশের কী আছে?
হার্ট অ্যাটাকের আগে এভাবে ব্যাখা হয়। ঘাড়ে হাতে ছড়িয়ে পড়ে। আমার আপন ভায়রার ছোট শালার এরকম হয়েছিল। হাসপাতালে নেবার আগে শেষ।
এবারে আমি বললাম, সর্বনাশ!
তুই কোনো চিন্তা করিস না। আমি আসছি।
আয় তা হলে।
কোথায় আছিস তুই?
আমি রাস্তার ঠিকানাটা দিলাম। সুব্রত টেলিফোন রাখার আগে জিজ্ঞেস করল, তোর কি শরীর ঘামছে?
না।
বুকের মাঝে কি চিনচিনে ব্যথা আছে? মনে হয় কিছু একটা চেপে বসে আছে?
আমি দুর্বল গলায় বললাম, না, সেরকম কিছু নেই।
ঠিক আছে। তুই বস, আমি আসছি। কোনো চিন্তা করবি না।
আমি ফোন-ফ্যাক্সের দোকানে বসে রইলাম। দোকানের মালিক খুব বিরক্ত চোখে আমার দিকে তাকাতে লাগল, আমি বেশি গা করলাম না। সত্যি যদি হার্ট অ্যাটাক হতেই হয় এখানে হোক, সুব্রত তা হলে খুঁজে পাবে। রাস্তাঘাটে হার্ট অ্যাটাক হলে উপায় আছে!
বসে থাকতে থাকতে আমার মনে হতে লাগল, ঘাড়ের ব্যথাটা আস্তে আস্তে ঘাড় থেকে হাতে ছড়িয়ে পড়ছে। একটু পরে মনে হল, বুকে ব্যাথা করতে শুরু করেছে। মনে হতে লাগল হাত ঘামতে শুরু করেছে, খানিকক্ষণ পর মনে হল শুধু হাত না শরীরও ঘামছে। আমার শরীর দুর্বল লাগতে থাকে, মাথা ঘুরতে থাকে এবং হাত-পা কেমন জানি অবশ হয়ে আসতে থাকে। জীবনের আশা যখন প্রায় ছেড়েই দিয়েছি তখন সুব্রত এসে হাজির। আমাকে দেখে উদ্বিগ্ন মুখে জিজ্ঞেস করল, কী হয়েছে?
আমি চিঁ চিঁ করে বললাম, বেশি ভালো না!
তুই কোনো চিন্তা করিস না। ডাক্তারকে ফোন করে দিয়েছি। আয়।
ডাক্তার নাম কী?
সুব্রত আমাকে ধমক দিয়ে বলল, তুই ডাক্তারের নাম দিয়ে কী করবি?
কোথায় বসে?
সেটা জেনে তোর কী লাভ? আয় আমার সাথে।
আমাকে একটা সিএনজিতে তুলে সুব্রত ধানমণ্ডিতে এক জায়গায় নিয়ে এল। ডাক্তারের চেম্বারের বাইরে অনেক মানুষজন কিন্তু সুব্রত কীভাবে কীভাবে জানি সব মানুষকে পাশ কাটিয়ে ডাক্তারের কাছে নিয়ে গেল।
ডাক্তারের বয়স হয়েছে, চুল পাকা। চশমার ফাঁক দিয়ে আমাকে একবার মাথা থেকে পা পর্যন্ত দেখে জিজ্ঞেস করলেন, কী সমস্যা?
আমি চিঁ চিঁ করে বললাম, ঘাড়ে ব্যথা।
ঘাড় থাকলেই ঘাড় ব্যথা হবে। যাদের ঘাড় নেই, তাদের ঘাড়ের ব্যথাও নেই।
আমি জিজ্ঞেস করলাম, কাদের ঘাড় নেই?
ব্যাঙদের। তাদের গলা-ঘাড় কিছু নেই। মাথার পরেই ধড়।
সুব্রত আমার পাশে বসে ছিল, আমার দিকে বিষদৃষ্টিতে তাকিয়ে বলল, তোর ব্যাঙ হয়েই জন্ম নেওয়া উচিত ছিল।
ডাক্তার সাহেব অবাক হয়ে বললেন, কেন?
সুব্রত বলল, দেখছেন না ব্যাঙের মতন মোটা হয়েছে। এ শুধু খায় আর ঘুমায়।
ডাক্তার সাহেব আমার দিকে তাকিয়ে জিজ্ঞেস করলেন, সত্যি নাকি?
আমি মাথা নেড়ে সম্মতি দিতে গিয়ে যন্ত্রণার কারণে বললাম, আউক।
সুব্রত বলল, আউক মানে হচ্ছে ইয়েস।
ডাক্তার সাহেব কিছুক্ষণ অবাক হয়ে আমাদের দুজনের দিকে তাকিয়ে রইলেন, তারপর ফোঁস করে একটা নিশ্বাস ফেলে বললেন, আসেন, কাছে আসেন।
আমি ভয়ে ভয়ে ডাক্তারের কাছে গেলাম। ডাক্তার আমার ঘাড় ধরে খানিকক্ষণ টেপাটেপি করলেন, ব্লাড প্রেসার মাপলেন, স্টেথিস্কোপ কানে লাগিয়ে কিছুক্ষণ বুকের ভেতরে কিছু একটা শুনলেন তারপর মুখ সুচালো করে আমার দিকে তাকিয়ে রইলেন। আমি ভয়ে ভয়ে জিজ্ঞেস করলাম, কী হয়েছে?
