কোনো সমস্যা নাই। শিউলি হঠাৎ দাঁড়িয়ে ইতস্তত করে বলল, শুধু একটা সমস্যা।
অনিক অবাক হয়ে বলল, কী সমস্যা?
এখন ইন্দুরের কোনো উৎপাত নাই কিন্তু বিলাইয়ের উৎপাত বাড়ছে।
বিড়ালের উৎপাত বেড়েছে?
অনিক অবাক হয়ে বলল, বিড়াল কোথা থেকে এসেছে?
সেটা জানি না। তয় নানু বিড়ালরে একদম ডরায় না, সেই জন্যে নানু কিছু বলে না। উন্টা প্লেটে করে প্রত্যেক দিন খাবার দেয়।
অনিক ভুরু কুঁচকে বলল, কী রকম বিড়াল?
সেইটা দেখি নাই। রাত্রিবেলা আসে তাই দেখা যায় না।
রাত্রিবেলা আসে?
জে।
ডাকাডাকি করে?
শিউলি মাথা চুলকে বলল, জে না ডাকাডাকি করে না।
তা হলে কেমন করে বুঝলে এটা বিড়াল। দেখতেও পাও না ডাকও শোন না—
পপর থেকে নিচে তাকালে দেখা যায়। আবছা অন্ধকারে দৌড়াদৌড়ি করে। বিলাইয়ের সাইজ।
অনিক হঠাৎ কেমন জানি চিন্তিত হয়ে গেল। শিউলি চলে যাবার পরও সে গম্ভীর মুখে হাঁটাহাঁটি করে। আমি ভয়ে ভয়ে জিজ্ঞেস করলাম, কী হয়েছে অনিক?
শুনলে না—ইঁদুরের উৎপাত কমেছে, কিন্তু বিড়ালের উৎপাত বেড়েছে।
বিড়ালকে যদি উৎপাত মনে না করে—
না-না-না অনিক দ্রুত মাথা নাড়ে, তুমি কিছু বুঝতে পারছ না।
আমি অবাক হয়ে বললাম, কী বুঝতে পারছি না?
এগুলো বিড়াল না।
তা হলে এগুলো কী?
এগুলো ইঁদুর। আমার গ্রোথ হরমোন খাবার খেয়ে বড় হয়ে গেছে।
কত বড় হয়েছে?
শুনলে না শিউলি বলল, বিড়ালের সাইজ!
আমি চোখ কপালে তুলে বললাম, একেকটা ইঁদুরের সাইজ বিড়ালের মতো? সর্বনাশ!
হ্যাঁ। ঠিকই বলেছ, সর্বনাশ। ডজন খানেক এই ইঁদুর যদি কাউকে ধরে তা হলে তার খবর আছে।
আমি অনিকের দিকে তাকিয়ে বললাম, তুমি এগুলোকে এতকড় তৈরি করেছ কেন?
বুঝতে পারি নাই। ভেবেছিলাম, মোটাসোটা হবে, হৃষ্টপুষ্ট হবে। বড় হবে বুঝতে পারি নাই।
এখন?
অনিক মাথা চুলকিয়ে বলল, আগে দেখতে হবে নিজের চোখে।
কীভাবে দেখবে? অন্ধকার না হলে বের হবে না।
অন্ধকারে দেখার স্পেশাল চশমা আছে, নাইট ভিশন গগলস। সেগুলো চোখে দিয়ে দেখা যেতে পারে।
আমি খানিকক্ষণ চিন্তা করে বললাম, এক কাজ করলে কেমন হয়?
কী কাজ?
বিল্লাল মাস্তান আর কাদির মাস্তানের ঘরে কিছু এসে হাজির হলে আমরা সেটা দেখতে পাই।
হ্যাঁ।
ওদের ঘরের সেই যন্ত্রটায় ইঁদুর দূর করার শব্দটা বন্ধ করে দাও। তা হলে হয়তো এক দুইটা ভিতরে ঢুকবে, আমরা তখন দেখতে পাব।
অনিক হাতে কিল দিয়ে বলল, গ্রেট আইডিয়া। সত্যি কথা বলতে কি আমরা আরো একটা কাজ করতে পারি।
কী কাজ?
ইঁদুরকে ঘরে ঢোকার জন্য স্পেশাল সাউন্ড দিতে পারি।
আছে সে রকম শব্দ?
হ্যাঁ, আছে। ইঁদুরের সঙ্গীত বলতে পার।
সঙ্গীত? ব্যান্ড সঙ্গীত?
ব্যান্ড সঙ্গীত না উচ্চাঙ্গ সঙ্গীত সেটা জানি না, কিন্তু ইঁদুরেরা এই শব্দ শুনতে পছন্দ করে। শব্দ শুনলে কাছে এগিয়ে যায়।
আমি বললাম, লাগাও দেখি।
অনিক তার যন্ত্রপাতির প্যানেলে চোখ বুলিয়ে কয়েকটা সুইচ অন করে, কয়েকটা অফ করে। বড় বড় কয়েকটা নব ঘুরিয়ে কিছু একটা দেখে বলল, এখন ইঁদুরদের ঘরের ভেতরে আসার কথা!
ইঁদুরের সঙ্গীত লাগিয়ে দিয়েছ?
হ্যাঁ, দিয়েছি। তবে ইঁদুর আসবে কিনা জানি না। হাজার হলেও দিনের বেলা, দিনের বেলা ইঁদুর গর্ত থেকে বের হতে চায় না।
আমরা বেশ কিছুক্ষণ বসে যখন প্রায় হাল ছেড়ে দিচ্ছিলাম তখন দেখতে পেলাম মোটাসোটা একটা ইঁদুর গন্ধ শুকতে শুকতে আসছে। টেলিভিশনের স্ক্রিনে ঠিক কত বড় বোঝা যায় না, কিন্তু তারপরেও আমরা অনুমান করে হতবাক হয়ে গেলাম। সেগুলো কমপক্ষে এক হাত লম্বা লেজ নিয়ে প্রায় দুই হাত। ওজন পাঁচ কেজির কম না। এই বিশাল ইঁদুর ঘরের ভিতরে হাটতে লাগল। ঘরের ভিতর জিনিসপত্র শুকতে লাগল।
আমি কিছুক্ষণ নিশ্বাস বন্ধ করে বুক থেকে একটা লম্বা শ্বাস বের করে বললাম, সর্বনাশ! এ যে রাক্ষুসে ইঁদুর!
হ্যাঁ। অনিক মাথা নাড়ল।
ইঁদুর বলে ইঁদুর–একেবারে মেগা ইঁদুর।
ঠিকই বলেছ। অনিক মাথা নাড়ল, একেবারে মেগা ইঁদুর।
কিছুক্ষণের মাঝেই আরো কয়েকটা মেগা ইঁদুর ঘরের ভেতর এসে ঢুকল। বিল্লাল আর কাদির এমনিতেই খবিশ ধরনের মানুষ। ঘরের ভেতর উচ্ছিষ্ট খাবার থেকে শুরু করে নানা কিছু পুড়ানো ছিটানো রয়েছে। বিশাল বিশাল উঁদুরগুলো সেগুলো খেতে লাগল, উঁত দিয়ে কাটাকাটি তে লাগল। ঘরের ভেতর এই বিশাল ইঁদুরগুলো কিলবিল কিলবিল করে ঘুরে বেড়াতে লাগল। ঘরের যাবতীয় জিনিসপত্র দাঁত দিয়ে কেটে কিছুক্ষণের মাঝে সবকিছু তছনছ করে দিল।
বিল্লাল মস্তান আর কাদির মাস্তান যখন তাদের বাসায় ফিরে এসেছে তখন রাত প্রায় দশটা। তালা খুলে ভিতরে ঢোকার শব্দ পেয়েই ইঁদুরগুলি সোফার নিচে, খাটের তলায়, দরজার কোনায় লুকিয়ে গেল। বিল্লাল আর কাদির ভিতরে ঢুকেই ইতস্তত তাকায়, তাদের চোখে প্রথমে বিস্ময় তারপর ক্রোধের ছায়া পড়ল। বিশাল মেগা ইঁদুরগুলো ঘরটা তছনছ করে রেখেছে।
বিল্লাল বলল, কে ঢুকেছে ঘরে?
কাদির বলল, আমি জানি না।
ঘরটার বারোটা বাজিয়ে দিয়েছে—
কাদির মাথা নাড়ল, হ্যাঁ। আর কী রকম একটা আঁশটে গন্ধ দেখেছ?
বিল্লাল ইঁদুরে কেটে কুটিকুটি করে রাখা তার একটা শার্ট তুলে হুংকার দিয়ে বলল, আমার শার্টটা কে কেটেছে?
কাদির তার পান্টটায় হাত দিয়ে বলল, আমার প্যান্ট।
বিল্লাল বলল, আমার বালিশ।
কাদির বলল, আমার সোফা।
বিল্লাল হঠাৎ শার্টের নিচে হাত দিয়ে একটা রিভলবার বের করল। সেটা হাতে নিয়ে বলল, যেই ঢুকে থাকুক, সে এই ঘরে আছে।
