কোথা থেকে আনলেন?
উপর তলার বুড়িরে দুই বেকুব দিয়ে গেছে।
আমি অনিকের দিকে তাকিয়ে বললাম, দেখেছ কত বড় সাহস? আমাদের বেকুব বলে?
বলতে দাও। দেখা যাক কে বেকুব। আমরা না তারা।
আমরা দেখলাম বিল্লাল মাস্তান সোফায় বসে সোফার নিচে থেকে একটা বোতল বের করে সেটা কি ঢক করে যেতে থাকে। আমি জিজ্ঞেস করলাম, কী খাচ্ছে?
ফেনসিডিল।
কত বড় বদমাইশ দেখেছ?
হ্যাঁ।
এখন পুলিশকে খবর দিলে কেমন হয়?
অনিক বলল, এত তাড়াহুড়া কিসের? দেখি শেষ পর্যন্ত কী হয়!
টেলিভিশন স্ক্রিনে আমরা দুই মাস্তানের দিকে তাকিয়ে রইলাম। বিল্লাল কান চুলকাতে চুলকাতে বলল, এই বুড়ি খুব তাড়াতাড়ি মরবে বলে তো মনে হয় না।
কাদির বলল, সিড়ির ওপর থেকে ধাক্কা দিয়া ফালাইয়া দেই একদিন?
উঁহু। বিল্লাল আরেক ঢোক ফেনসিডিল খেয়ে বলল, এমনভাবে মার্ডার করতে হবে যেন কে পর না করে। কোনো তাড়াহুড়া নাই।
অনিক হা হা করে হেসে বলল, দেখেছ? আমাদের যে রকম তাড়াহুড়া নাই, তাদেরও কোনো তাড়াহুড়া নাই।
ঠিক এরকম সময় দরজায় শব্দ হল। অনিক টেলিভিশনের ভলিউমটা কমিয়ে বলল, নিশ্চয়ই শিউলি এসেছে।
দরজা খুলে পেখি আসলেই তাই। আমাদের দেখে কাঁদো কাঁদো হয়ে বলল, সর্বনাশ হইছে চাচা–
কী হয়েছে?
নিচের তলার মাস্তান আপনার যন্ত্র জোর করে নিয়ে গেছে।
আমি এবং অনিক অবাক এবং রাগ হবার অভিনয় করতে থাকি। শিউলি পুরো ঘটনাটা বর্ণনা করে এবং আমরা যেখানে যতটুকু দরকার সেখানে ততটুকু মাথা নাড়তে থাকি।
শিউলির কথা শেষ হবার পর অনিক বলল, তোমার ঘাবড়ানোর কোনো কারণ নেই। আমার কাছে আরো ইঁদুর দূর করার যন্ত্র আছে।
অনিক একটা ব্যাগে চৌকোনা প্লাস্টিকের বাক্সগুলো ভরে শিউলির হাতে দিয়ে বলল, এগুলো সব ঘরে একটা করে রেখে দিও ইঁদুর আর আসবে না।
শিউলি খুশি খুশি মুখে বলল, সত্যি!
হ্যাঁ। অনিক গলা নামিয়ে বলল, সাবধান, বিল্লাল মাস্তান যেন এগুলোর খোঁজ না পায়।
পাবে না চাচা। আমি লুকিয়ে নিয়ে যাব।
গুড। অনিক টেবিল থেকে আরেকটা প্যাকেট বের করে দিয়ে বলল, এইটাও সাথে রাখবে।
এইটা কী?
ইঁদুরের খাবার। বাসার বাইরে যেখানে ইঁদুর থাকে সেখানে এইগুলো রাখবে।
শিউলি বলল, এইটা কি বিষ?
অনিক সরাসরি উত্তর না দিয়ে বলল, অনেকটা সে রকম। সাবধান, হাত দিয়ে ধরো না। হাতে লাগলে সাবান দিয়ে হাত ধুয়ে ফেলবে।
ঠিক আছে। আমি এখন যাই।
যাও শিউলি।
শিউলি চলে যাবার পর আমি বললাম, এইটুকুন ছোট একটা বাচ্চার হাতে ইঁদুর মারার বিষ দেওয়া কি ঠিক হল?
অনিক আমার দিকে তাকিয়ে বলল, আমি মোটেও ওর হাতে বিষ দেই নাই।
তা হলে কী দিয়েছ?
গ্রোথ হরমোন মেশানো খাবার!
মানে?
মানে বারো নম্বর বাসায় যত উঁদুর আছে সেগুলিকে মোটাতাজা করছি!
মোটাতাজা?।
হ্যাঁ। ইনফ্রাসোনিক বিপারের কারণে এখন বাসার ভেতরে কোনো ইঁদুর ঢুকবে না, কিন্তু সেগুলো আস্তে আস্তে খাসির মতো মোটা হবে। তারপর যখন সময় হবে —
তখন কী?
তখন বিল্লাল মাস্তান আর কাদির মাস্তান বুঝবে কত উঁদুরের সঁতের মাঝে কত ধার।
আমি অনিকের মুখের দিকে অবাক হয়ে তাকালাম। অনিক চোখ মটকে বলল, চলো, আরো কিছুক্ষণ বিল্লাল মাস্তান আর কাদির মাস্তানের নাটক দেখি।
আমরা গিয়ে টেলিভিশন অন করতেই দুইজনকে দেখতে পেলাম খালি গায়ে টেলিভিশনে হিন্দি সিনেমা দেখে হেসে কুটি কুটি হচ্ছে। দুইজনের হাতে ছোট ছোট দুইটা বোতল, সেটা চুমুক দিয়ে খাচ্ছে আর ঢেকুর তুলছে, কী বিচ্ছিরি একটা দৃশ্য!
কয়েকদিন পরের কথা। আমি অনিকের বাসায় গিয়েছি। দুইজনে চিপস খেতে খেতে টেলিভিশনে বিল্লাল মাস্তান এর কাদির মাস্তানের কাজ-কারবার দেখছি। এখানে যেসব জিনিস আমরা দেখতে পেয়েছি পুলিশ সেটা জানলেই একেক জনের চৌদ্দ বছর করে জেল হবার কথা। মদ গাজা ভাং থেকে শুরু করে হেরোইন ফেনসিডিল সবকিছু নিয়ে তাদের কাজ-কারবার। নানা রকম বেআইনি অস্ত্রপাতিও ঘরের মাঝে লুকানো থাকে। সেগুলো ব্যবহার করে কবে কোথায় কোন ছিনতাই করেছে, কোন মাস্তানি করেছে অনিক সেই সংক্রান্ত সব কথাবার্তা রেকর্ড করে ফেলেছে। বেছে বেছে সেসব জায়গা কপি করে একটা সিড়ি তৈরি করে পুলিশকে একটা আর খবরের কাগজের লোকদের একটা দিলেই বাছাধনদের শুধু বারোটা না, একেবারে বারো দুগুণে চব্বিশটা বেজে যাবে। কীভাবে সেটা করা যায় আমি আর অনিক সেটা নিয়ে চিন্তাভাবনা করছি। এরকম সময় অনিক জানালা দিয়ে বাইরে তাকিয়ে বলল, ঐ যে শিউলি যাচ্ছে?
আমি বললাম, ডাক ওকে, একটু খোঁজখবর নেই।
অনিক জানালা দিয়ে মাথা বের করে ডাকল, শিউলি!
শিউলি আমাদের দেখে দাঁত বের করে হাসতে হাসতে ছুটে এল। আমি জিজ্ঞেস করলাম, কী খবর শিউলি?
ভালো।
কোথায় যাও?
বাজার করতে যাই।
অনিক জিজ্ঞেস করল, তোমাদের বাসায় ইঁদুরের উৎপাত কমেছে?
জে কমেছে। বাসায় ইন্দুরের বংশই নাই।
তাই নাকি?
জে। নানু খুব খুশি। প্রত্যেকদিন আপনাদের কথা কয়।
কী বলেন আমাদের কথা?
বলেন যে যদি ইন্দুরের যন্ত্রের মতো আরেকটা যন্ত্র বানাতে পারতেন যেটা মাস্তানদের দূর করতে পারে তা হলে খুব মজা হত।
অনিক কিছু না বলে একটু হাসল। শিউলি বলল, নানু আপনাদের একদিন চা নাস্তা খেতে ডাকবে।
আমি আগ্রহ নিয়ে বললাম, ভেরি গুড। ভেরি গুড।
অনিক শলল, ঠিক আছে শিউলি তুমি তা হলে তোমার কাজে যাও।
শিউলি চলে যেতে শুরু করে। অনিক পেছন থেকে বলল, তোমাদের অন্য কোনো সমসা হলে আমাকে বোলো।
