বিল্লাল মাস্তান গম্ভীর মুখে বলল, উচিত হয় নাই। বেয়াদব পোলাটার একটা শাস্তি হওয়ার দরকার ছিল।
আমি আর অনিক কোনো কথা বললাম না। কে সত্যিকারের বেয়াদব আর কার শাস্তি হওয়া দরকার সে ব্যাপারে আমার আর অনিকের ভেতরে কোনো সন্দেহ নাই। আমরা যখন সিড়ি দিয়ে ওপরে উঠে যাচ্ছি তখন বিল্লাল মাস্তান পিছু পিছু উঠে এল। বলল, আমাদের ঘরেও ইন্দুরের উৎপাত। শালার রাত্রে ঘুমানো যায় না। আমাদের ঘরেও একটা যন্ত্র লাগায়ে দিবেন।
এইগুলি দামি যন্ত্র।
কত দাম?
টাকা দিয়ে তো আর দাম বলতে পারব না। অনেক গবেষণা করে বানাতে হবে। আমার কাছে বেশি নাই। একটাই আছে।
অ। বিল্লাল কেমন যেন বিরস মুখে আমাদের দিকে তাকিয়ে রইল।
আমি আর অনিক দোতলায় উঠে দরজায় ধাক্কা দিলাম। শিউলি দরজা খুলে আমাদের দেখে পাঁচত বের করে হেসে বলল, নানু ইন্দুরওয়ালারা আসছে।
আমি আর অনিক একজন আরেকজনের দিকে তাকালাম। এই বাসায় আমাদের যে ইন্দুরওয়ালা হিসেবে একটা পরিচিতি হয়েছে সেটা জানতাম না। শিউলি যখন আমাদের পিছনে বিল্লাল মাস্তানকে দেখল তখন দপ করে তার মুখের হাসি নিবে গেল।
অনিক তার ব্যাগ থেকে গোলাকার একটা যন্ত্র বের করে বলল, এটা একটা উঁচু জায়গায় রাখতে যাবে। এমনভাবে রাখতে হবে যেন সম্পূর্ণ ঘরটা সামনে থাকে। সামনে কিছু থাকলে কিন্তু কাজ করবে না।
বৃদ্ধ ভদ্রমহিলা বললেন, ঐ আলমারির ওপর রেখে দেন।
অনিক আলমারির ওপর রেখে সুইচ টিপে সেটা অন করে দিতেই একটা ছোট লাল বাতি জ্বলতে থাকল। অনিক সঙ্কুষ্টির ভান করে বলল, ড। এখন আর কোনো চিন্তা নেই। আপনার এই খণে কোনো ইঁদুর ঢুকবে না।
বুদ্ধ মহিলা খানিকটা সন্দেহের চোখে যন্ত্রটা দেখে বললেন, দেখি বাবা, তোমার যন্ত্র কাজ করে কিনা।
অনিক একটা কাগজ বের করে সেখানে তার নাম-ঠিকানা লিখে বৃদ্ধ ভদ্রমহিলার হাতে দিয়ে বলল, যদি কোনো সমস্যা হয় শিউলিকে দিয়ে আমার কাছে খবর পাঠিয়ে দেবেন। আমি এই এক রাস্তা পরেই থাকি।
ঠিক আছে বাবা।
আমরা যখন বের হয়ে এলাম তখন বিল্লাল মাস্তান আমাদের সাথে বের হয়ে এল। কিন্তু আমাদের সাথে নিচে নেমে এল না, দরজার সামনে দাঁড়িয়ে ধ্যাস ঘ্যাস করে বগল চুলকাতে লাগল।
রাস্তায় নেমে আমি বললাম, একটা বোকার মতো কাজ করেছ।
কী করেছি বোকার মতো?
এই যে বিল্লাল মাস্তানকে ইঁদুর দূর করার যন্ত্রটা দেখালে। এই মাস্তান তো এই যন্ত্র কেড়ে নিয়ে যাবে।
অনিক আনন্দিত মুখে বলল, তোমার তাই মনে হচ্ছে?
হ্যাঁ। অনিক মাথা নেড়ে বলল, দেখা যাক কী হয়।
অনিক বাসায় এসেই আমাকে ভিতরে নিয়ে গেল। অনেক যন্ত্রপাতির মাঝে একটা বড় টেলিভিশন, সুইচ টিপে সেটা অন করে দিয়ে সামনে দাঁড়াল। আমি অবাক হয়ে বললাম, কী হল? এখন টেলিভিশন দেখবে?
হ্যাঁ।
বাংলা সিনেমা আছে নাকি?
দেখি বাংলা নাকি ইংরেজি।
টেলিভিশনটা হঠাৎ করে উজ্জ্বল হয়ে ওঠে এবং সেখানে আমি একটা বিচিত্র দৃশ্য দেখতে পেলাম; স্ক্রিনে স্পষ্ট দেখা যাচ্ছে বারো নম্বর বাসার বৃদ্ধা মহিলা এবং শিউলিকে। দুজনের চোখে-মুখে একটা ভায়ের ছাপ, কারণ কাছেই দাঁড়িয়ে আছে বিল্লাল মাস্তান। অনিক ভলিউমটা বাড়াতেই আমি তাদের কথাও শুনতে পেলাম। শিউলি বলছে, না এটা নিয়েন না। এইটা ইন্দুরওয়ালারা নানুরে দিছে?
বিল্লাল মাস্তান হাত তুলে বলল, চড় মেরে দাঁত ফেলে দিব। আমার মুখের উপরে কথা?
আমি অবাক হয়ে অনিকের দিকে তাকালাম, জিজ্ঞেস করলাম, কী হচ্ছে এখানে?
অনিক দাঁত বের করে হেসে বলল, যে যন্ত্রটা রেখে এসেছি সেটা আসলে একটা ছোট ভিডিও ট্রান্সমিটার। সাথে আলট্রাসোনিক একটা ইন্টারফেসও আছে।
তার মানে?
তার মানে এটা যেখানে থাকবে সেটা আমরা দেখতে পাব। সেখানকার কথা শুনতে পাব!
আমি দেখতে পেলাম বিল্লাল মাস্তান হাত বাড়িয়ে টেলিভিশনে এগিয়ে আসছে এবং হঠাৎ করে ছবি ওলটপালট হতে লাগল! অনিক দাঁত বের করে হেসে বলল, বিল্লাল মাস্তান আমাদের ফাদে পা দিয়েছে।
মানে?
এখন বিল্লাল মাস্তান এই ভিডিও ট্রান্সমিটার তার ঘরে নিয়ে রাখবে। আমরা এখানে বসে দেখব ব্যাটা বদমাইশ কখন কী করে?
আমি অনিকের দিকে তাকিয়ে বললাম, তুমি জানতে যে বিল্লাল মাস্তান এটা নিয়ে যাবে?
আন্দাজ করেছিলাম।
এটা আসলে ইঁদুর দূর করার যন্ত্র না?
ইঁদুর ধরার সিগন্যালও এটা দিতে পারে তবে আসলে এটা একটা ভিডিও ট্রান্সমিটার।
অনিক টেবিলে ছোট ছোট চৌকোনা প্লাস্টিকের কয়েকটা বাক্স দেখিয়ে বলল, এইগুলো হচ্ছে আসল ইদূর দূর করার যন্ত্র। ইনফ্রাসোনিক স্পিকার!
তা হলে? পুরো ব্যাপারটা আমার কাছে জটিল মনে হতে থাকে, এগুলো দিলে না কেন?
দিব। একটু পরে যখন শিউলি আমাদের কাছে নালিশ করতে আসবে তখন তার হাতে দিব। অনিক টেলিভিশনের স্ক্রিনের দিকে তাকিয়ে থেকে উত্তেজিত গলায় বলল, দেখ দেখ মজ্জা দেখ।
স্ক্রিনে দৃশ্যটা ওলটপালট খেতে খেতে হঠাৎ সেটা সোজা হয়ে গেল এবং আমরা বিল্লাল মাস্তানকে দেখতে পেলাম। সে ভিডিও ট্রান্সমিটারের সামনে থেকে সরে যেতেই পুরো ঘরটা স্পষ্ট হয়ে ওঠে। ঘরের এক কোনায় একজন উপুড় হয়ে ঘুমাচ্ছে, নিশ্চয়ই এটা কাদির। আমাদের ধারণা সত্যি কারণ বিল্লাল মাস্তান কাছে গিয়ে তাকে একটা লাথি মারতেই সে ধড়মড় করে উঠে বসে জিজ্ঞেস করে, কী হল বিল্লাল ভাই?
বিল্লাল মাস্তান আঙুল দিয়ে ভিডিও ট্রান্সমিটারটাকে দেখিয়ে বলল, আর ইন্দুর নিয়া চিন্তা নাই। ইন্দুর দূর করার যন্ত্র নিয়া আসছি।
