কী দেখে ভয় পেয়েছেন?
ইন্দুর।
ব্যাপারটা এখন আমাদের কাছে পরিষ্কার হল। যারা ইঁদুরকে ভয় পায় তারা ইঁদুর দেখে লাফিয়ে চেয়ার-টেবিলে উঠে পড়তেই পারে। ভয় খুব মারাত্মক জিনিস। গোবদা একটা মাকড়সা দেখে আমি একবার চলন্ত বাস থেকে লাফিয়ে নেমে পড়েছিলাম।
অনিক বুড়ি মহিলার কাছে গিয়ে বলল, আপনি নামুন। কোনো ভয় নাই।
বুড়ি মহিলা অনিকের হাতে ধরে সাবধানে নামতে নামতে রাগে গরগর করতে করতে বলল, এত করে শিউলিরে বললাম ইঁদুর মারার বিষ কিনে আন, আমার কথা শুনতেই চায় না–
শিউলি নিশ্চয়ই কাজের মেয়েটি হবে, সে দাঁত বের করে হেসে বলল, আনছি না। কিন্তু বিষে ভেজাল আমি কী করমু? সেটা খেয়ে ইন্দুরের তেজ আরো বাড়ছে। গায়ে জোর আরো বেশি হইছে।
বুড়ি ভদ্রমহিলা চোখ পাকিয়ে শিউলির দিকে তাকিয়ে বলল, ঢং করিস না! ইঁদুরের বিষে আবার ভেজাল হয় কোনো দিন শুনছিস?
শিউলি বলল, হয় নানু হয়। আজকাল সবকিছুতে ভেজাল। সবকিছুতে দুই নম্বুরি।
অনিক হাসিমুখে বলল, ল্লাপনাকে যদি ইঁদুরে উৎপাত করে কোনো চিন্তা করবেন না। আমি আপনার সব ইঁদুর দূর করে দিব।
বুড়ি এবারে ভালো করে একবার অনিকের দিকে আরেকবার আমার দিকে তাকিয়ে বলল, তোমরা কে বাবা?
অনিক বলল, আমি এই পাড়াতেই থাকি। তোমার কাছে ভালো ইঁদুরের বিষ আছে?
জি না, বিষ নেই। তবে আমি আপনার এখানে লো ফ্রিকুয়েন্সির কয়েকটা সোনিক বিপার লাগিয়ে দেব, ইঁদুর বাপ বাপ করে পালিয়ে যাবে।
কী লাগিয়ে দেবে?
সোনিক বিপার। তার মানে হচ্ছে মেকানিক্যাল অসিলেশান। আমাদের কানের রেসপন্স হচ্ছে বিশ হাট থেকে বিশ কিলো হার্টজ। এই বিপার–
আমি অনিকের হাত ধরে বললাম, এত ডিটেলসে বলার কোনো দরকার নেই। তুমি ছাড়া কেউ বুঝবে না। শুধু কী করতে হবে বলে দাও–
কিছু করতে হবে না, ঘকের কোনো এক জায়গায় রেখে দেবেন, দেখবেন পাঁচ-দশ মিটারের ভেতর কোনো ইঁদুর আসবে না। যদি থাকে বাপ বাপ করে পালাবে।
বুড়ি ভদ্রমহিলা কিছুক্ষণ অনিকের দিকে তাকিয়ে একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে বললেন, বাবা, মালপে জন্যে এরকম একটা যন্ত্র তৈরি করতে পারবে না? যেটা লাগালে মাস্তানে শা শম্প করে পালাবে?
শিউলি আশা হি হি করে হেসে উঠে বলল, মানু, মাস্তানরা ইন্দুর থেকে অনেক বেশি খামাপ। তা একবার বাড়িতে ঢুকলে কোনো যন্ত্র দিয়ে বের করা যায় না!
অনিক কোনো কথা বলল না, একটা লম্বা নিশ্বাস ফেলে বলল, প্রথমে ইঁদুর দিয়ে শুরু করি। আঞ্জকে হয়তো পারব না, কাল না হয় পরশু বিকেলে আমি আসব। এসে সোনিক বিপারগুলো লাগিয়ে দেব।
বৃদ্ধা শহিলা বললেন, ঠিক আছে বাবা।
বাসায় ফিরে অনিক কাজ শুরু করে দিল। তার ওয়ার্কবেঞ্চে নানা যন্ত্রপাতি ইলেকট্রনিক সার্কিট একত্র করে কী যেন একটা তৈরি করতে লাগল। আমি ভয়ে ভয়ে বললাম, ইঁদুরের জন্যে এত যন্ত্রপাতি লাগে? আমি দেখেছি আমার মা ভাতের সাথে সেঁকো বিষ মিশিয়ে রান্নাঘরের কোনায় ফেলে রাখতেন—
অনিক কল, শুধু ইঁদুর দূর করতে এত জিনিস লাগে না। আমি এই বাড়ি থেকে ছোট ইঁদুর আর বড় ইঁদুর সব দূর করতে চাই!
বড় ইঁদুর? আমি একটু অবাক হয়ে বললাম, কত বড়?
অনিক হাত তুলে বলল, এই এত বড়!
এত বড় ইদুরু হয়?
অনিক বলল, হয়।
আমি তখন হঠাৎ করে বুঝতে পারলাম অনিক বিল্লাল আর কাদিরের কথা বলছে। আমি চোখ বড় বড় করে বললাম, পারবে দূর করতে?
অনিক গম্ভীর মুখে বলল, দেখি।
আমি অনিককে কাজ করতে দিয়ে বাসায় চলে এলাম।
দুদিন পর বিকাল বেলা অনিক আমাকে ফোন করল। আমি জিজ্ঞেস করলাম, তোমার ইঁদুর দূর করার যন্ত্র কতদূর?
রেডি।
ছোট ইঁদুর না বড় ইঁদুর?
দুটোই।
ভেরি গুড। কখন ন্ত্রগুলো লাগাতে যাবে?
এখনই যাব ভাবছিলাম। তোমার কোনো কাজ না থাকলে চলে এস।
খাওয়া এবং ঘুম ছাড়া আমার আর কখনোই কোনো কাজ থাকে না। আমি তাই সাথে সাথে রওনা দিয়ে দিলাম।
অনিকের বাসায় গিয়ে দেখি সে আমার জন্যে অপেক্ষা করছে। আমাকে দেখে একটা ব্যাগ হাতে নিয়ে বলল, চলো যাই।
আমি বললাম, চলো।
আসার সময় বারো নম্বর বাসাটা লক্ষ করেছ?
হ্যাঁ। করেছি। কেন?
বড় ইঁদুর দুটি আছে?
কে? বিল্লাল আর কাদির?
হ্যাঁ।
ঘরে তালা নেই। নিশ্চয়ই আছে।
অনিক সন্তুষ্টির ভাব করে বলল, গুড।
দুইজন মাস্তান বাসায় থাকলে কেন সেটা ভালো হবে আমি সেটা বুঝতে পারলাম না। পৃথিবীর বেশিরভাগ জিনিসই আমি অবিশ্যি বুঝতে পারি না, তাই আমি সেটা নিয়ে মাথা ঘামালাম না।
বারো নাম্বার বাসায় গিয়ে আমি আর অনিক যখন ধুপধাপ শব্দ করে সিঁড়ি দিয়ে ওপরে উঠছি তখন নিচের তলায় দরজা খুলে একজন মাস্তান বের হয়ে এল। আমরা চিনতে পারলাম, এটা বিল্লাল মাস্তান। আমাদের দিকে ভুরু কুঁচকে তাকিয়ে বিল্লাল মাস্তান বলল, কে? আপনারা কোথায় যান?
উপর তলায়।
কেন?
আমাদের ইচ্ছে হলে আমরা উপর তলা-নিচের তলা যেখানে খুশি যেতে পারি, মাস্তানের তাতে নাক গলানোর কী? আমার মেজাজ গরম হয়ে উঠল। কী একটা বলতে যাচ্ছিলাম, অনিক আমাকে থামিয়ে বলল, উপর তলায় খুব ইঁদুরের উৎপাত ভাই একটা যন্ত্র লাগাতে যাচ্ছি।
বিল্লাল মাস্তান তখন হঠাৎ করে আমাদের দুইজনকে চিনতে পারল, চোখ বড় করে বলল, আপনাদের আগে দেখেছি না?
আমি মাথা নাড়লাম, হ্যাঁ। চায়ের দোকানে—
বেয়াদব ছেমড়াটা যখন ডিস্টার্ব করছিল আর আমি যখন টাইট দিতে যাচ্ছিলাম তখন—
অনিক মাথা নাড়ল, হ্যাঁ। তখন আমি আপনাকে থামিয়েছিলাম।
