ছেলেটি ভয়ে কোনো কথা বলল না। মাস্তান টেবিলে কিল দিয়ে বলল, আর তুই হারামির বাচ্চা শরবত কানায় আনছস? আমার সাথে রংবাজি করস?
টেবিলে তার সামনে বসে থাকা আরেকজন মাস্তান সমান জোরে হুংকার দিয়ে বলল, কথা বাড়ায়া লাভ নাই বিল্লাল ভাই। হারামজাদার মাখায় ঢালেন। শিক্ষা হউক—
প্রথম মাস্তান, যার নাম সম্ভবত বিল্লাল, মনে হল প্রস্তাবটা শুনে খুশি হল। মাথা নেড়ে বলল, কথা তুই মন্দ বলিস নাই। তারপর রেস্টুরেন্টের বয় ছেলেটার শার্টের কলার ধরে টেনে নিজের কাছে নিয়ে এসে কাপটা তার মাথার ওপর ধরল। চায়ের কাপটা থেকে গরম চা মনে হয় সত্যি ঢেলেই দিত কিন্তু একেবারে শেষ মুহূর্তে অনিক লাফিয়ে চায়ের কাপটা ধরে ফেলল। মাস্তানের দিকে তাকিয়ে বলল, আপনার মাথা খারাপ হয়েছে?
বিল্লাল মাস্তান একটু অবাক হয়ে অনিকের দিকে তাকাল। বলল, আপনে কেডা?
অনিক বলল, আমি যেই হই না কেন—তাতে কিছু আসে যায় না। আপনি একটি ছোট বাচ্চার মাথায় গরম চা ঢালতে পারেন না।
দুই নম্বর মাস্তান বলল, আপনি দেখবার জান আমরা সেটা পারি কি না?
অনিক বলল, না সেটা দেখতে চাই না। আপনার চায়ে যদি চিনি বেশি হয়ে থাকে আপনাকে আরেক কাপ চা বানিয়ে দেবে কিন্তু সেজন্যে আপনি একটা ছোট বাচ্চার মাথায় গরম চা টাশযেন?
এরকম সময় রেস্টুরেন্টের ম্যানেজার দুই কাপ চা, শিঙাড়া আর কয়েকটা মোগলাই পরোটা নিজের হাতে করে টেবিলে নিয়ে এসে বলল, বিল্লাল ভাই এই যে আপনার জন্যে এনেছি। রাগ করবেন না বিল্লাল ভাই। খান। খেয়ে বলেন কেমন হইছে।
বিল্লাল নামের শস্তানটা গম্ভীর হয়ে বলল, আমি কি রাগ করতে চাই? কিন্তু আপনার বেয়াপব বোল বয় বেয়ারা—
ম্যানেঞ্জার বলল, ছোট মানুষ বুঝে নাই। আর ভুল হবে না বিল্লাল ভাই। তারপর ছোট ছেলেটাকে ধামড়া দিয়ে সরিয়ে বলল, যা এখান থেকে।
দুইজন মান তখন খুব তৃপ্তি করে খেতে থাকে। খেতে খেতে দুলে দুলে হাসে যেন খুব মজা হয়েছে। দেখে আমার রাগে পিত্তি জ্বলে যায়।
মাস্তান দুইগুন যতক্ষণ ছিল ততক্ষণ রেস্টুরেন্টের কেউ কোনো কথা বলল না। কিন্তু তারা খেয়ে বিল শোধ না করে বের হওয়া মাত্রই সবাই কথা বলতে শুরু করল। ম্যানেজার নিচে পুতু ফেলে বলল, আল্লাহর গজব পড়ুক তাদের ওপর। মাথার ওপর ঠাঠা পড়ুক।
আমি জিজ্ঞেস করলাম, কারা এরা?
আর বলবেন না। বারো নম্বর বাসায় উঠেছে। দুই মাস্তান। একজন বিল্লাল আরেকজন কাদির। মাস্তানির জ্বালায় আমাদের জান শেষ।
অনিক জিজ্ঞেস করল, এরকম মানুষকে বাড়িওয়ালা বাড়ি ভাড়া দিল কেন?
ম্যানেজার বলল, বাড়ি ভাড়া দিয়েছে মনে করেছেন? জোর করে ঢুকে গেছে।
অনিক অবাক হয়ে বলল, জোর করে ঢুকে গেছে?
জে। ম্যানেজার শুকনো মুখে বলল, বারো নম্বর বাসাটা হচ্ছে মাসুদ সাহেবের। রিটায়ার্ড স্কুল মাস্টার। অনেক কষ্ট করে দোতলা একটা বাসা করেছেন। নিচের তলা ভাড়া দিয়েছেন উপরে নিজে থাকতেন। কয়দিন আগে হার্ট অ্যাটাকে মারা গেলেন। তার স্ত্রী বুড়ি মানুষ কিছু বুঝেন-সুঝেন না। সাদাসিধে মানুষ। তখন এই দুই মাস্তান ভাড়াটেদের ভয় দেখিয়ে তাড়িয়ে ঢুকে গেল।
রেস্টুরেন্টের একজন বলল, পুরো বাড়ি দখলের মতলব।
ম্যানেজার মাথা নাড়ল, জে। বুড়ির কিছু হইলেই তারা বাড়ি দখল করে নিবে।
রেস্টুরেন্টের একজন বলল, কিছু না হইলেও দখল নিবে। এরা লোক খুব খারাপ।
ম্যানেজার একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলল। বলল, জে। বাসায় মদ গাঞ্জা ফেনসিডিল ছাড়া কোনো ব্যাপার নাই। এলাকার পরিবেশটা নষ্ট করে দিল।
রেস্টুরেন্টে যারা চা খাচ্ছে তারাও এই এলাকাটা কীভাবে নষ্ট হয়ে যাচ্ছে তার বর্ণনা দিতে শুরু করল। দেখা গেল সবারই বলার মতো ছোট-বড় কোনো একটা গল্প আছে।
আমরা চা খেয়ে বের হয়ে বাসায় ফেরত আসছি তখন রাস্তার পাশে হঠাৎ করে অনিক দাঁড়িয়ে গিয়ে বলল, বারো নম্বর বাসা।
আমিও ভালো করে তাকালাম, জরাজীর্ণ দোতলা একটা বাসা। দেখেই বোঝা যায় কোনো রিটায়ার্ড স্কুল মাস্টার তার সারা জীবনের সঞ্চয় দিয়ে কোনোভাবে দাঁড় করিয়েছেন। বহুদিনের পুরোনো, দরজা-জানালার রঙ উঠে বিবর্ণ। পলেস্তারা খসে জায়গায় জায়গায় ইট বের হয়ে এসেছে। নিচের তলায় দরজা তালা মারা, এখানে নিশ্চয়ই বিল্লাল এবং কাদির মাস্তান থাকে। খোলা জানালা দিয়ে ভেতরে দেখা যায়, সেখানে মোটামুটি একটা হতচ্ছাড়া পরিবেশ।
আমরা ঠিক যখন হাঁটতে শুরু করেছি তখন দোতলা থেকে একটা চিৎকার শুনতে পেলাম। মহিলার গলার আওয়াজ মনে হল, কেউ বুঝি কাউকে খুন করে ফেলছে। আমি আর অনিক একজন আরেকজনের দিকে তাকালাম তারপর দুদ্দাড় করে সিঁড়ি দিয়ে ওপরে উঠে গেলাম। দরজা বন্ধ। সেখানে জোরে জোরে ধাক্কা দিয়ে বললাম, কী হয়েছে?
আমাদের গলার আওয়াজ শুনে ভিতরের চিৎকার হঠাৎ করে থেমে গেল। আমরা আবার দরজায় ধাক্কা দিলাম। তখন ভিতর থেকে ভয় পাওয়া গলায় একজন বলল, কে?
অনিক কুলল, আমরা। কোনো ভয় নেই দরজা খুলেন।
তখন খুট করে শব্দ করে দরজা খুলে গেল। বারো-তের বছর বয়সের একটা মেয়ে দরজার সামনে পঁড়িয়ে আছে, মনে হয় বাসায় কাজকর্মে সাহায্য করে। পিছনে একটা চেয়ারের ওপরে সাদা চুলের একজন বুড়ি দাঁড়িয়ে আছে, তার চোখে-মুখে ভয়ের চিহ্ন। মনে হয় এই বুড়ি মহিলাষ্টিই চিৎকার করেছিল। অনিক জিজ্ঞেস করল, কী হয়েছে?
বারো-তের বছরের মেয়েটি খুক খুক করে হেসে ফেলল। বলল, নানু ভয় পাইছে।
