সবাই যখন চলে গেল তখন আমি বললাম, অনিক এখন আমার কথা বিশ্বাস হল?
অনিক ভাঙা গলায় বলল, কোন কথা?
পোর আকন্দ তোমার রক্ত-মাংস চুষে খাবে আর চামড়া দিয়ে ড়ুগড়ুগি বাজাবে?
অনিক মাথা নাড়ল। আমি বললাম, আজকে তোমার রক্ত-মাংস চুষে খেল। আর দুই একদিনের মাঝেই দেখবে তোমার চামড়া দিয়ে ড়ুগড়ুগি বাজানো শুরু করেছে।
সত্যি সত্যি অনিকের চামড়া দিয়ে ড়ুগড়ুগি বাজানোর ব্যবস্থা হল–এক সপ্তাহ পরে দেখলাম সব পত্রিকায় বড় বড় করে খবর ছাপা হয়েছে, মশা নিয়ন্ত্রণে যুগান্তকারী আবিষ্কার : আক্কাস আকন্দের নেতৃত্বে নতুন সম্ভাবনা। নিচে ছোট ছোট করে লেখা আক্কাস আকন্দের ল্যাবরেটরিতে তার গবেষকরা কীভাবে দীর্ঘদিন রিসার্চ করে মশা নিয়ন্ত্রণের যুগান্তকারী আবিষ্কার করেছে। এই আবিষ্কার চুরি করার জন্য কীভাবে দুই দিগভ্রান্তু যুবক অপচেষ্টা করেছিল। এবং কীভাবে তার সুযোগ্য আইনবিদরা সেই অপচেষ্টা নস্যাৎ করে দিয়েছে এবং এখন সেই আবিষ্কারের কথা কীভাবে দেশবাসীকে জানানোর জন্যে আক্কাস আকন্দের ল্যাটেরিতে একটা সংব্বাদ সম্মেলন করা হবে সেটা বিস্তারিতভাবে লেখা আছে। সেই সংবাদ সন্মেলনে সাংবাদিকদের সাথে সাথে উৎসাহী ছাত্র-শিক্ষক এবং আমজনতাকে আহ্বান জানানো হয়েছে। খবরটা পড়ে অনিক কেমন যেন মিইয়ে গেল। অনেকক্ষণ গুম মেরে থেকে শেষে যোগ করে একটা লম্বা দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলল, আমি যাব।
আমি বললাম, কী বলছ?
আমি বলেছি যে আমি যাব।
আর্মি রেগেমেগে বললাম, তোমার মাথা খারাপ হয়েছে? তুমি দেখেছ খবরে লিখেছে দুইজন দিগ্ভ্রান্ত যুবক এই আবিষ্কার চুরি করার অপচেষ্টা করেছিল?
দেখেছি।
তার মানে বুঝতে পারছ?
পারছি।
কী বুঝতে পারছ?
বুঝতে পারছি যে আমি গেলে আমাকে ধরিয়ে দেবে। অন্য সাংবাদিকদের বলবে এই সেই দিগভ্রান্ত যুবক।
আমি বললাম, তা হলে?
তবু আমি যাব। অনিক মুখ গোঁজ করে বলল, বদমাইশগুলো কী করে আমি নিজের চোখে দেখতে চাই।
তোমার নিশ্চয়ই মাথা খারাপ হয়েছে। পরের দিন সব পত্রিকায় তোমার ছবি ছাপা হবে, নিচে লেখা হবে, এই সেই দিগভ্রান্ত যুবক যে যুগান্তকারী আবিষ্কার চুরি করার অপচেষ্টা করেছিল।
অনিক ফোঁস করে একটা দীর্ঘনিশ্বাস ফেলে বলল, হোক।
আমি বললাম, তুমি রাস্তা দিয়ে হাঁটলে সবাই বলবে এই সেই গবেষণা চোরা।
অনিক বলল, বলুক। আমি বললাম, বাড়িওয়ালা তোমাকে বাড়ি থেকে বের করে দেবে।
অনিক বলল, দিক।
এই এলাকায় কারো বাড়িতে চুরি হলে পুলিশ তোমাকে ধরে নিয়ে যাবে। ব্রিমান্ডে নিয়ে ইলেকট্রিক শক দেবে।
অনিক বলল, দিক।
আমি বললাম, কয়দিন আগে তুমি আমাকে বুঝিয়েছ সব কথাবার্তা কাজকর্ম হবে যুক্তিপূর্ণ। বৈজ্ঞানিক। এখন তুমি নিজে এরকম অযৌক্তিক কথা বলছ কেন? এরকম অবৈজ্ঞানিক কাজ করতে চাইছ কেন?
অনিক ফোঁস করে একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলল, বিজ্ঞানের খেতা পুড়ি। অনিকের মুখ থেকে এরকম একটা কথা শুনে আমি বুঝতে পারলাম অবস্থা খুব জটিল। এখন তার সাথে ঝগড়া করে লাভ নাই। আমার বুকের ভেঁতর তখন দুঃখ দুঃখ একটা ভাব ভুটভুট করতে থাকে। আমি বললাম, ভাই অনিক।।
অনিক একটু অবাক হয়ে বলল, কী হল?
আমি যাব তোমার সাথে।
তুমিও যাবে?
হ্যাঁ। গিয়ে আমি যদি আক্কাস আকন্দের টুটি চেপে না ধরি, লাথি মেরে যদি তার সব এটর্নিদের হাঁটুর মালাই চাকি ফাটিয়ে না দিই তা হলে আমার নাম জাফর ইকবাল না।
আমার কথা শুনে অনিক কেমন যেন ভুরু কুঁচকে আমার দিকে তাকিয়ে রইল, কিছু বলল না।
পরের রোববার পত্রিকার বিজ্ঞাপন দেখে আমি আর অনিক গুলশানের এক বিশাল দালানের বাইরে এসে দাঁড়ালাম। বাইরে বড় পোস্টার, মশা নিয়ন্ত্রণের যুগান্তকারী আবিষ্কার, সেখানে আক্কাস আকন্দের ছবি, শিকারির বেশে দাঁড়িয়ে আছেন, হাতে বন্দুক, সেই বন্দুক থেকে ধোঁয়া বের হচ্ছে, তার পায়ের কাছে একটা বিদঘুটে রাক্ষসের মতো মশা চিত হয়ে মরে পড়ে আছে। দালানের সামনে মানুষের ভিড়, সাংবাদিকরা ক্যামেরা নিয়ে এসেছে, টেলিভিশন চ্যানেলের লোকেরা টেলিভিশন ক্যামেরা নিয়ে এসেছে। প্রাক্কাস আকন্দের লোকেরা লাল রঙের ব্লেজার পরে ছোটাছুটি করছে। অনেক মানুষের ভিড়ের মাঝে আমি আর অনিকও ঢুকে পড়লাম। কেউ আমাদের লক্ষ করল না।
বড় একটা হলঘরের মাঝখানে অনিকের কাচঘর বসানো হয়েছে। ভেতরে লাখ লাখ মশা। মাঝে মাঝেই মশাগুলো খেপে উঠে গুঞ্জন করছে। তখন মনে হয় ঘরের মাঝে একটা জেট প্লেনের ইঞ্জিন গর্জন করে উঠছে। ফটোসাংবাদিকরা ঘ্যাঁচ ঘ্যাঁচ করে কাচঘরের ছবি তুলছে। টেলিভিশন চ্যানেলের লোকজন ঘাড়ে ক্যামেরা নিয়ে দৌড়াদৌড়ি করছে। সাধারণ দর্শকরাও এসেছে অনেক, তাদের কথাবার্তায় সারা ঘর সরগরম। আমি গোপনে পকেটে দুইটা পচা টম্যাটো নিয়ে এসেছি, ঠিক করেছি আক্কাস আকন্দ আসামাত্র তার দিকে ছুড়ে মারব, তারপর যা থাকে কপালে তাই হবে। আমি মাঝে মাঝে চোখের কোনা দিয়ে অনিককে দেখছি, দেখে মনে হয় মরা মানুষের মুখ, তার মুখের দিকে তাকানো যায় না।
হঠাৎ করে ঘরের কথাবার্তা কমে এল। আমি তাকিয়ে দেখি খুব ব্যস্ততার ভান করে আক্কাস আকন্দের দুই এটর্নি মোটা-ফরসা-টাক-মাথা-গোঁফ আর চিকন-কালো-চুল এবং দাড়ি হনহন করে এগিয়ে আসছে। কাচঘরের সামনে দুইজন দাঁড়াল এবং সাথে সাথে ক্লিক ক্লিক করে সাংবাদিকরা তাদের ছবি তুলতে লাগল।
