মোটা হাত তুলে সবাইকে চুপ করার ইঙ্গিত করতেই সবাই কথা বন্ধ করে চুপ হয়ে গেল। মোটা বলল, আমার প্রিয় সাংবাদিক বন্ধুরা এবং সুপ্রিয় দর্শকমণ্ডলী, আপনাদের সবাইকে জানাই সাদর আমন্ত্রণ। আজ আপনারা এখানে এসেছেন এক ঐতিহাসিক ঘটনার সন্ধিক্ষণে। যুগ যুগ ধরে পৃথিবীর মানুষ দুঃখ, ক্ষুধা, তৃষ্ণা, রোগ, শোক এবং দারিদ্র্যের সাথে যে জিনিসটির সাথে যুদ্ধ করে এসেছে সেটা হচ্ছে মশী। হ্যাঁ, মশা হচ্ছে মানবতার শত্রু। সভার শর। দেশের সুখ ও সমৃদ্ধির শক্ত।
মোটা এই সময় থামল এবং চিকন কথা বলতে শুরু করল, গলা কাপিয়ে বলল, সেই ভয়ংকর শত্রুকে আমরা পরাভূত করেছি। আপনাদের ধারণী হতে পারে এই কাচঘরে আইকে রাখা লাখ লাখ মশা বুঝি ভয়ংকর কোনো প্রাণী, সুযোগ পেলেই বুঝি আপনাদের ওপর ঝাঁপিয়ে পড়ে আপনাকে কামড়ে আপনার রক্ত শুষে নেবে! কিন্তু সেটি সত্যি নয়। মহামান্য আক্কাস আকন্দের সুযোগ্য নেতৃত্বে আমাদের হাউজের বিজ্ঞানীরা এই ভয়ংকর মশাকে এক নিরীহ পতঙ্গে পরিণত করে দিয়েছে। তারা আপনাকে কামড়াবে না, তারা আপনার রক্ত শুষে নেবে না।
চিকন দম নেবার জন্য থামল, তখন মোটা আবার যেই ধরল, বলল, আমি জানি আপনারা আমার কথা বিশ্বাস করছেন না। আপনারা ভাবছেন এটা কেমন করে সম্ভব? কিন্তু আপনাদের এটা দেখাব। এই কাচের ঘরে লাখ লাখ মশা। এরা হয়তো ম্যালেরিয়া-ফাইলেরিয়া বা ডের জীবাণু বহন করছে। কেউ যদি এর ভেতরে ঢোকে তা হলে লাখ লাখ মশা এক মুহূর্তে তার সব রক্ত শুষে নিতে পারে কিন্তু আমি আপনাদের বলছি তারা নেবে না।
চিকন এবারে থামল, তখন মোটা বলল, আছেন আপনাদের কেউ যে এর ভেতরে ঢুকবেন? কারো সাহস আছে?
উপস্থিত সাংবাদিক দর্শক কেউ সাহস দেখাল না। মোটা হা হা করে হেসে বলল, আমি জানি আপনাদের কেউ সেই সাহস করবেন না। তার প্রয়োজনও নেই, কারণ এই কাচঘরে লাখ লাখ শশার ভেতরে ঢুকবেন আকন্দ গ্রুপ অব ইন্ডাস্ট্রিজের স্বত্বাধিকারী মহামান্য আক্কাস আকন্দ স্বয়ং।
মোটা নাটকীয়ভাবে কথা শেষ করতেই প্রথমে চিকন, তার সাথে সাথে লাল ব্লেজার পরা আক্কাস আকন্দের লোকজন এবং তাদের দেখাদেখি সাংবাদিক-দর্শকরা হাততালি দিতে শুরু করল।
ঠিক তখন আমরা দেখতে পেলাম হলঘরের অন্য মাথা থেকে আক্কাস আকন্দ হেঁটে হেঁটে আসছে। হাঁটার ভঙ্গিটা একটু অন্যরকম, মনে হয় টলতে টলতে আসছে, পাশেই একজন মাঝে মাঝে তাকে ধরে ফেলছে। একটু কাছে আসতেই দেখলাম তার চোখ ঢুলুঢুলু এবং মুখে বিচিত্র এক ধরনের হাসি, শুধু নেশাগ্রস্ত মানুষেরা এভাবে হাসে। আমি পচা টম্যাটো দুইটা শক্ত করে ধরে রেখে সঁতের ফাঁক দিয়ে বললাম, দেখছ? শালা পুরোপুরি মাতাল!
অনিক কেমন যেন ইলেকট্রিক শক খাওয়ার মতো চমকে উঠল, বলল, কী বললে?
বলেছি বেটা দিনদুপুরে মদ খেয়ে এসেছে?
অনিক হঠাৎ আঁতকে উঠে লাফিয়ে দাঁড়িয়ে চিৎকার করতে প্রু করল, দাঁড়ান, দাঁড়ান, সর্বনাশ!
ঘরের সবাই ঘুরে অনিকের দিকে তাকাল। সারা ঘরে একটা কথা নাই। আক্কাস আকন্দ একটা হেঁচকি তুলে জড়িত গলায় বলল, এই মক্কেলন্ডারে এখানে কে এনেছে?
মোটা চিৎকার করে বলল, ভলান্টিয়ার। একে বের করে দাও।
চিকন ততক্ষণে আমাকে দেখে ফেলেছে, সে খনখনে গলায় বলল, সাথে তার পার্টনারও আছে, তাকেও বের কর।
অনিক দুই হাত তুলে চিৎকার করে বলল, দাঁড়ান দাঁড়ান, আমার কথা শোনেন—
কিন্তু কেউ অনিকের কথা শুনতে রাজি হল না, ফটোসাংবাদিকরা ঘ্যাঁচ ঘ্যাঁচ করে কিছু ছবি তুলে ফেলল এবং তার মাঝে লাল ব্লেজার পরা লোকজন এসে আমাদের দুইজনকে গোল করে ঘিরে নিয়ে বের করে নিতে লাগল। আমি দুই হাতে দুইটা পচা টম্যাটো শুধু শুধু ধরে রাখলাম, আক্কাস আকন্দের দিকে ছুড়তে পারলাম না।
অনিক তখনো ষাড়ের মতো চেঁচাচ্ছে এবং আক্কাস আকন্দের লোকজন আমাদের দুইজনকে ঠেলে নিয়ে যাচ্ছে। তার মাঝে দেখলাম কাচঘরের বাইরে একটা দরজা খোলা হল। আক্কাস আকন্দ সেখানে ঢুকে দরজা বন্ধ করে দিল। ভেতরে দ্বিতীয় দরজাটা খুলতেই সে লাখ লাখ মশার মাঝে হাজির হবে। অনিক পাগলের মতো চিৎকার করছে, তার মাঝে আক্কাস আকন্দ দ্বিতীয় দরজাটা খুলে ফেলেছে।
তারপর যে ঘটনাটি ঘটল আমি আমার জীবনে কখনো সেরকম ঘটনা ঘটতে দেখি নি। হঠাৎ করে লাখ লাখ মশা একসাথে আক্কাস আকন্দের উপর ঝাঁপিয়ে পড়ল—আমরা তার গগনবিদারী চিৎকার শুনতে পেলাম। দেখলাম মশাগুলো কামড়ে তাকে তুলে ফেলেছে, শূন্যে সে লুটোপুটি খাচ্ছে, মশার আস্তরণে ঢাকা পড়ে আছে। তাকে আর মানুষ মনে হচ্ছে না, মনে হচ্ছে কালো কম্বল গায়ে দেওয়া একটা ভালুক। বিকট চিৎকার করতে করতে সে হাত পা ছুড়তে থাকে, তার মাঝে মশার ভয়ংকর গুঞ্জন সব মিলিয়ে একটা নারকীয় পরিবেশ। কাচঘরের ভেতরে মশাগুলো তাকে নাচিয়ে বেড়ায় এক দেয়াল থেকে অন্য দেয়ালে, ফুটবলের মতো ছুড়ে দেয়। ছাদে ঠেসে ধরে ঝপাং করে পানিতে ফেলে দিয়ে নাকানি-চুবানি খাওয়াতে থাকে। আক্কাস আকন্দের লোকজন কী করবে বুঝতে না পেরে দরজা খোলার চেষ্টা করতে থাকে এবং হঠাৎ করে সব মশা কাচঘর থেকে ভয়ংকর গর্জন করে ছুটে বের হয়ে আসতে থাকে।
সাংবাদিক-দর্শকরা প্রথমে ঠিক বুঝতে পারছিল না কী হচ্ছে। এক দুইজন একটু ছবিও তুলেছিল কিন্তু যেই মুহূর্তে খোলা দরজা দিয়ে বন্যার পানির মতো কালো কুচকুচে মশার সমুত্ত্ব বের হতে শুরু করল তখন সবাই প্রাণের ভয়ে ছুটতে শুরু করল। ঘরের ভেতরে যা একটা হুঁটোপুটি শুরু হল সেটা বলার মতো নয়। আমি দেখলাম মশার দল আক্কাস আকন্দকে কামড়ে ধরে শূন্যে ঝুলিয়ে নিয়ে আসছে, সিড়ি দিয়ে তাকে টেনে নিয়ে গেল তারপর রাস্তায় ছুড়ে ফেলে দিল। মানুষজন প্রাণের ভয়ে ছুটছে। আমিও ছুটছিলাম, অনিক আমার হাত ধরে থামাল, বলল, থাম। দৌড়ানোর দরকার নেই।
