আপনি কেমন করে বুঝতে পারলেন আমার আবিষ্কার হয়ে গেছে? এটা তো আমি জাফর ইকবাল ছাড়া আর কাউকে বলি নি।
চিকন মানুষ চোখ লাল করে বলল, আমরা সেটা সন্দেহ করেছিলাম যে আপনি আপনার আবিষ্কারের কথা গোপন রাখতে পারেন।
মোটা বলল, কন্ট্রাক্টের একুশ পাতায় স্পষ্ট লেখা আছে আবিষ্কারের দুই মিনিট একত্রিশ সেকেন্ডের ভেতরে আপনি আমাদের ফোন করে জানাবেন।
চিকন বলল, আপনি জানান নাই। সেইটা কন্ট্রাক্টের বরখেলাপ
মোটা বলল, তের পাতার এগার অনুচ্ছেদ অনুযায়ী আপনার বিরুদ্ধে শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেওয়ার ক]।
অনিক চোখ কপালে তুলে বলল, শাস্তিমূলক ব্যবস্থা। আমার বিরুদ্ধে?
মোটা বলল, আমরা বুদ্ধি করে আপনার টেলিফোনে আড়ি পেতেছিলাম বলে কোনোমতে খশর পেয়েছি।
অনিক রেগে আগুন হয়ে বলল, আপনাদের এত বড় সাহস আমার টেলিফোনে আড়ি পাতেন?
চিকন বলল, কী আশ্চর্য! কন্ট্রাক্টের এগার পাতার নয় অনুচ্ছেদের তৃতীয় প্যারাগ্রাফে স্পষ্ট লেখা আছে আপনি আমাদের আড়ি পাতার অনুমতি দিয়েছেন।
মোটা বলল, আড়ি পাতার জন্যে যত খরচ হয়েছে সেটা আপনার গবেষণার মূল্য থেকে কেটে নেওয়া হবে।
আমার পক্ষে আর সহ্য করা সম্ভব হল না। আমি মেঝে থেকে একটা লোহার রড় তুলে হুংকার দিয়ে বললাম, তবেরে বজ্জাত বদমাইশ বেশরমের দল। আজ তাদের একদিন কি আমার একদিন। যদি আমি পিটিয়ে তোদের তক্তা না বানাই, ঠ্যাং ভেঙে লুলা না করে দেই, মাথা ফাটিয়ে ঘিলু বের করে না ফেলি তা হলে আমার নাম জাফর ইকবাল না।
আমার এই দুংকার শুনে মোটা এবং চিকন এতটুকু ভয় পেল বলে মনে হল না। মোটা পকেট থেকে একটা ছোট ক্যামেরা বের করে ঘ্যাঁচ ঘাঁচি করে আমার ছবি তুলতে লাগল, চিকন একটা ছোট ক্যাসেট প্লেয়ার বের করে আমার হুংকার রেকর্ড করতে শুরু করে দিল।
আমি বললাম, বের হ এখান থেকে, বেজন্মার দল।
মোটা বলল, ঠাণ্ডা মাথায় খুন কার অপচেষ্টা। সব প্রমাণ আছে। ক্যামেরায় ছবি। ক্যাসেটে কথা। চৌদ্দ বছর জেল।
চিকন বলল, তার সাথে মানহানির মামলা জুড়ে দেব। স্থাবর-অস্থাবর সব সম্পত্তি ক্রোক করে নেব।
মোটা বলল, মামলা চলবে দুই বছর। সব খরচপাতি আপনার।
চিকন বলল, অস্ত্রসহ গ্রেপ্তার করতে হবে। তা হলে চুয়ান্ন ধারায় ফেলা যাবে–
আমি আরেকটু হলে লোহার রড দিয়ে মেরেই বসেছিলাম, অনিক কোনোভাবে আমাকে থামাল। ফিসফিস করে বলল, সাবধান জাফর ইকবাল, এরা খুব ডেঞ্জারাস। তোমার বারোটা বাজিয়ে ছেড়ে দেবে। হাত থেকে রড ফেলে শান্ত হয়ে বস। ঠাণ্ডা মাথায় কাজ করতে হবে।
আমি রাজি হচ্ছিলাম না, অনিক কষ্ট করে আমাকে শান্ত করে বসাল। তারপর জিজ্ঞেস করল, আপনারা কী চান?
মোটা তার মুখে মধুর হাসি ফুটিয়ে বলল, এই তো ভালো মানুষের মতো কথা! রাগারাগি করে কোনো কাজ হয় না।
চিকন বলল, আমরা এসেছি কন্ট্রাক্টের লেখা অনুযায়ী আপনার আবিষ্কার, মশার ঘর, মশা, মশার বাচ্চাকাচ্চা সবকিছু কিনে নিতে।
আমি জিজ্ঞেস করলাম, সবকিছু আপনারা কত দিয়ে কিনবেন?
মোটা বলল, হিসাব না করে তো বলতে পারব না।
আমি বললাম, করেন হিসাব।
তখন মোটা আর চিকন মিলে হিসাব করতে লাগল। কাগজের মাঝে অনেক সংখ্যা লিখে সেটা যোণ-বিয়োগ করতে লাগল, পকেট থেকে ক্যালকুলেটর বের করে সেটা দিয়ে হিসাব করে শেষ পর্যন্ত মোটা বলল, আপনার পুরো গবেষণা, মশার ঘর, মশা, তার বাচ্চাকাচ্চা সবকিছু কিনতে আপনাকে দিতে হবে সাত শ চল্লিশ টাকা।
অনিক অবাক হয়ে বলল, সাত শ চল্লিশ টাকা?
হ্যাঁ। চিকন আঙুল দিয়ে অনিককে দেখিয়ে বলল, আপনি দেবেন।
অনিক তখনো তার নিজের কানকে বিশ্বাস করতে পারছে না, আবার বলল, আমি দেব?
মোটা বলল, হ্যাঁ। কন্ট্রাক্টের উনত্রিশ পৃষ্ঠার ছয় অনুচ্ছেদে স্পষ্ট লেখা আছে এই আবিষ্কারের জন্যে আপনাকে আটাশ দিন সময় দেওয়া হয়েছে। আটাশ দিন পার হবার পর প্রত্যেক দিন আপনার জরিমানা সাত হাজার একুশ টাকা করে।
অনিক নিজের কানকে বিশ্বাস করতে পারে না, কোনোমতে বলল, আমার জরিমানা?
চিকন বলল, আপনার কপাল ভালো। এই আবিষ্কার করতে যদি আপনার আরো মাসখানেক লেগে যেত তা হলে আপনার এই বাসা আমাদের ক্রোক করে নিতে হত।
অনিক কিছুক্ষণ ঘোলা চোখে মানুষ দুইজনের দিকে তাকিয়ে রইল, তারপর কেমন জানি ফ্যাসফ্যাসে গলায় বলল, শুধু একটা জিনিস বলবেন?
মোটা বলল, কী জিনিস?
আমি আমার বাসায় বসে, আমার ল্যাবরেটরিতে আমার সময় আমার মতো করে গবেষণা করছি, আপনারা আমাকে জরিমানা করার কে?
চিকন চোখ কপালে তুলে বলল, কী আশ্চর্য! আপনার পুরো গবেষণাটার অর্থায়ন করেছি আমরা। সবরকম ক্যামিকেল সাপ্লাই দিয়েছি আমরা?
ক্যামিকেল সাপ্লাই দিয়েছেন আপনারা?
হ্যাঁ। এই দেখেন সাতাশ পৃষ্ঠায় আপনার সিগনেচার। আপনি প্রথম কনসাইনমেন্ট বুঝে নিয়েছেন। দুই লিটার একুয়া। এক হাজার গ্রাম সুকরোস আর পাঁচ শ গ্রাম সোডিয়াম ক্লোরাইড।
মোটা গরম হয়ে বলল, আপনি কি এটা অস্বীকার করতে পারেন?
অনিক কোনো কথা না বলে একটা লম্বা নিশ্বাস ফেলল, তারপর আমার দিকে তাকিয়ে বলল, একুয়া মানে হচ্ছে পানি, সুকরোস মানে গুড় আর সোডিয়াম ক্লোরাইড মানে লবণ। এখন বুঝেছ, কেন দিয়েছিল?
আমি আবার লোহার রডটা নিয়ে ওদের ওপর ঝাঁপিয়ে পড়ার চেষ্টা করলাম। অনিক অনেক কষ্ট করে আমাকে থামাল।
ঘণ্টাখানেকের মাঝে অনিকের বাসায় আক্কাস আকন্দ্রে লোকজনে গিজগিজ করতে লাগল। তারা অনিকের গবেষণার কাগজপত্র, মশার ঘর, মশা, মশার বাচ্চাকাচ্চা সবকিছু নিয়ে যেতে শুরু করল। বিশ্বাল একটা ট্রাকে করে যখন সবকিছু তুলে নিয়ে চলে গেল তখন বাজে রাত এগারটা চল্লিশ মিনিট। মোটা এবং চিকন হিসাব করে দেখেছে তারা অনিকের কাছে সাত শ চল্লিশ টাকা পায়। অনিকের কাছে ছিল দুই শ টাকা আমি ধার দিলাম চল্লিশ টাকা। বাকি পঁচশ টাকার জন্যে তারা অনিকের বসার ঘরের দেয়াল থেকে তার দেয়ালঘড়িটা খুলে নিয়ে চলে গেল।
