শুধু কী?
এক বোতল পানি, এক কেজি গুড় আর আধ কেজি লবণের ব্যাপারটা বুঝতে পারলাম না।
তোমাকে দিয়েছে খাবারের স্যালাইন বানিয়ে খাওয়ার জন্যে। মনে নাই এক গ্লাস পানিতে একমুঠি গুড়, আর এক চিমটি লবণ দিয়ে খাবার স্যালাইন বানাতে হয়।
হ্যাঁ। অনিক মাথা নেড়ে বলল, সেটা তো বানায় যখন মানুষের ডায়রিয়া হয় তখন। এখানে কার ডায়রিয়া হয়েছে?
আমি বললাম, এখনো হয় নাই। কিন্তু হবে।
কার হবে?
নিশ্চয়ই তোমার হবে। অনিক ভয় পেয়ে বলল, কেন? আমার কেন হবে?
সেটা এখনো জানি না। কিন্তু মানুষ যখন ভয় পেয়ে যায় তখন তার ডায়রিয়া হয়। তুমিও নিশ্চয়ই ভয় পাবে।
অনিকের মুখটা শুকিয়ে গেল। আমি বললাম, মনে নাই, আমি তোমাকে বলেছিলাম খোক্কস আকন্দ তোমার রক্ত মাংস চুষে খাবে, তোমার চামড়া দিয়ে ড়ুগড়ুগি বাজাবে! তুমি দেখ, আমার কথা যদি সত্য না হয়।
আমার কথা শুনে অনিকের মুখটা আরো শুকিয়ে গেল।
এরপর বেশ কয়েক দিন কেটে গেল, অনিকের বাসায় প্রতিদিন না গেলেও আমি টেলিফোনে প্রত্যেক দিনই খোঁজ নিয়েছি। আমি একেবারে নিশ্চিত ছিলাম যে খোক্কস আকন্দ তার লোকজন পাঠিয়ে অনিকের কিছু একটা করে ফেলবে, কিন্তু সেরকম কিছু হল না। একদিন দুইদিন করে মাসখানেক কেটে যাবার পর আমার মনে হতে লাগল যে আমি হয়তো শুধু শুধু দুশ্চিন্তা করছিলাম। খোক্কস আকন্দ মানুষটাকে যতটা খারাপ ভেবেছিলাম সে হয়তো তত খারাপ না, তাকে খোক্কস না ডেকে আক্কাস ডাকা যায় কিনা সেটাও আমি চিন্তা করে দেখতে শুরু করলাম।
এদিকে অনিক তার গবেষণা চালিয়ে গেল, মাঝে মাঝে মনে হতে লাগল তার গবেষণা খুব ভালো হচ্ছে। আবার দুদিন পরে মনে হতে লাগল পুরো গবেষণা মুখ থুবড়ে পড়ে গেছে। আমি অনিকের ধৈর্য দেখে একেবারে অবাক হয়ে গেলাম। তার জায়গায় হলে আমি মনে হয়। এতদিনে মশার ঘর ভেঙেচুরে আগুন জ্বালিয়ে দিতাম। কিন্তু অনিক সেরকম কিছু করল না, আলকাতরা থেকে শুরু করে রসগোল্লার রস, ডাবের পানি থেকে শুরু করে মাদার গাছের কষ কোনো কিছুই সে বাকি রাখল না, সবকিছু দিয়ে পরীক্ষা করে ফেলল। একসময় যখনক মনে হল পৃথিবীর আর কিছুই পরীক্ষা করার বাকি নেই, এখন ভেউভেউ করে কান্নাকাটি করে চোখের পানি ফেলার সময়, আর সেই চোখের পানিটাই শুধু পরীক্ষা করা বাকি আছে তখন হঠাৎ করে অনিকের গবেষণার ফল পাওয়া গেল। একদিন বিকালবেল অনিক আমাকে ফোন করে চিৎকার করতে লাগল, ইউরেকা ইউরেকা।
আমি ভয়ে ভয়ে বললাম, তুমি কাপড়-জামা পরে আছ তো?
অনিক বলল, কাপড়-জামা পরে থাকব না কেন?
আমি বললাম, মনে নাই, আর্কিমিডিস কাপড়-জামা খুলে ন্যাংটো হয়ে ইউরেকা ইউরেকা বলে রাস্তাঘাটে চিৎকার করছিল?
অনিক হা হা করে হেসে বলল, তুমি ঠিকই বলেছ আমারও মনে হচ্ছে সেটা করে। ফেলি। পুরো ন্যাংটো না হলেও অন্তত একটা লুঙ্গি মালকেঁচা করে পরে রাস্তাঘাটে ছোটাছুটি করি। পিচকারি দিয়ে সবার ওপরে রঙ ফেলতে থাকি।
আমি বললাম, খবরদার! ওরকম কিছু করতে যেও না। পাবলিক ধরে যা একটা মার দেবে, তখন একটা কিলও কিন্তু মাটিতে পড়বে না।
তা অবিশ্যি তুমি ভুল বলে নাই।
আমি জিজ্ঞেস করলাম, এখন বলো তুমি আবিষ্কারটা কী করলে? মহিলা মশারা রক্তের বদলে অন্য কিছু খেতে রাজি হয়েছে?
হয় নাই মানে? সাংঘাতিকভাবে হয়েছে।
সেটা কী জিনিস?
অনিক বলল, সেটা একটা জিনিস না। অনেকগুলো ভিন্ন ভিন্ন জিনিস মিশাতে হয়েছে। সবচেয়ে ইম্পরট্যান্ট হচ্ছে ইথাইল অ্যালকোহল। সেটাতেই অর্ধেক কাজ হয়ে গেছে। তার সাথে মনো সোডিয়াম গ্লুকোমেট, সোডিয়াম বাই কার্বনেট আর
আমি বাধা দিয়ে বললাম, এগুলো আমাকে বলে লাভ নাই। এইসব ক্যামিকেল কোনটা কী আমি কিছু জানি না। কোনো দিন দেখি নাই, নাম শুনি নাই।
অনিক হা হা করে হেসে বলল, শুনেছ। শুনেছ। অবশ্যই নাম শুনেছ। সব্বাই ইথাইল অ্যালকোহলের নাম শুনেছে। এইটার গন্ধেই মহিলা মশারা পাগল হয়ে যায়।
তাই নাকি?
হ্যাঁ। ইথাইল অ্যালকোহল হচ্ছে–
আমি বললাম, থাক, থাক। টেলিফোনে বলে লাভ নাই। আমি চলে আসি, তুমি বরং সামনাসামনি দেখাও।
অনিক জিব দিয়ে চটাস করে শব্দ করে বলল, সেটাই ভালো। এত বড় একটা আবিষ্কার করলাম, কাউকে দেখানোর জন্যে হাত পা চোখ মাথা চুল নখ সবকিছু নিশপিশ নিশপিশ করছে।
আমি বললাম, বিজ্ঞানী অনিক লুম্বা, তুমি আর একটু ধৈর্য ধর, আমি এক্ষুনি চলে আসছি।
আমার অনিকের বাসায় যেতে আধা ঘণ্টার মতো সময় লাগল, গিয়ে দেখি সেখানে দুই জন সুট পরা মানুষ বসে আছে। একজন মোটা আরেকজন চিকন। একজন ফরসা আরেকজন রীতিমতো কালো। একজ্জনের মাথায় চকচকে টাক অন্যজনের মাথায় ঘন চুল। একজনের গোফ অন্যজনের দাড়ি। কিন্তু কী একটা বিষয়ে দুইজনের মিল আছে, দেখলেই মনে হয় দুইজন আসলে একইরকম। আমাকে দেখে অনিক শুকনো গলায় বলল, জাফর ইকবাল, এই দেখ, আক্কাস আকন্দ সাহেবের দুই এটর্নি চলে এসেছেন।
দুই এটর্নি? আমি চোখ কপালে তুলে বললাম, কেন?
সেটাই তো বুঝতে পারছি না।
মোটা, ফরসা, মাথায় টাক এবং গোঁফওয়ালা মানুষটা বলল, কেন? না বোঝার কী আছে? মনে নেই আপনি আমাদের সাথে কন্ট্রাক্ট সাইন করলেন যে গবেষণাটা বিক্রি করবেন?
চিকন, কালো, মাথায় চুল এবং ঘন দাড়িওয়ালা মানুষটা বলল, আমরা এখন বিক্রির কাজটা শেষ করতে এসেছি।।
অনিক বলল, কিন্তু কিন্তু— মোটা মানুষ বলল, কিন্তু কী?
